বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ১০১ গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেবে সরকার
জাতি গঠনে শিক্ষকদের অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে এবার দেশের ১০১ জন গুণী শিক্ষককে বিশেষ সম্মাননা দিতে যাচ্ছে সরকার। এর আগে এই সম্মাননা দেওয়া হতো মাত্র ১২ জন শিক্ষককে। এবার সেই সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে ৫ অক্টোবর রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নির্বাচিত শিক্ষকদের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন।
সম্মাননাপ্রাপ্ত প্রত্যেক শিক্ষককে ২ লাখ টাকা, একটি ক্রেস্ট এবং সম্মাননাপত্র দেওয়া হবে।
প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা—সব পর্যায়ের শিক্ষক
এবারের সম্মাননায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষা, সাধারণ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা, কৃষি এবং প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা স্থান পেয়েছেন।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন পর্যায় থেকে মোট ১০১ জনকে সম্মাননা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে—
প্রাথমিক শিক্ষা: ১০ জন
মাধ্যমিক শিক্ষা: ২০ জন
কলেজ: ২৫ জন
সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়: ২০ জন
চিকিৎসা শিক্ষা: ১০ জন
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: ৩ জন
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়: ৩ জন
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়: ৪ জন
প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচিত: ৬ জন
তবে জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি ইতোমধ্যে ৯৫ জনের নাম চূড়ান্ত করেছে। যাচাই-বাছাইয়ের শেষ পর্যায়ে কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিরূপ বা নেতিবাচক তথ্য পাওয়া গেলে তার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি পর্যায়ে ১০ শিক্ষক
প্রাথমিক পর্যায়ে নির্বাচিত ১০ শিক্ষকের মধ্যে সাধারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে রয়েছেন ঢাকার সেনপাড়া পর্বতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান, জামালপুরের ডি-বালিয়ামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সজিবুল হাসান, চাঁদপুরের বিঞ্চদী আজিমিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা, বগুড়ার আমলীতলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আয়েশা সিদ্দিকাসহ আটজন।
ইবতেদায়ি পর্যায় থেকে সম্মাননার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী কামিল মাদ্রাসার ইবতেদায়ি জুনিয়র শিক্ষক মোছা. আকলিমা আক্তার এবং পটুয়াখালীর ওয়ায়েজিয়া কামিল মাদ্রাসার ইবতেদায়ি প্রধান মো. নুরে আলম।
মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০ শিক্ষক
মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষা, দাখিল ও কারিগরি শিক্ষা—এই তিন শাখা থেকে মোট ২০ জন শিক্ষককে নির্বাচিত করা হয়েছে।
সাধারণ বিদ্যালয় থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন ফরিদপুরের কাজী সিরাজুল ইসলাম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মনিরুল ইসলাম, পটুয়াখালীর পাচজুনিয়া ধানখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মু. কুতুব উদ্দিন তালুকদার, ঢাকার গভ. বয়েজ হাই স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক এ.কে.এম মিজানুর রহমান, ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হাফেজ মো. রশীদ আলম এবং চাঁদপুরের সাচার বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ জসীমউদ্দিন।
দাখিল পর্যায় থেকে পাঁচজন এবং কারিগরি মাধ্যমিক পর্যায় থেকেও পাঁচজন শিক্ষক এই তালিকায় রয়েছেন।
কলেজ পর্যায়ে সর্বোচ্চ ২৫ জন
এবারের সম্মাননায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন কলেজ পর্যায় থেকে। সাধারণ কলেজ, কারিগরি শিক্ষা ও মাদ্রাসা—তিন বিভাগ মিলিয়ে মোট ২৫ জন শিক্ষককে নির্বাচন করা হয়েছে।
সাধারণ কলেজ থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন ফরিদপুরের সরকারি আইন উদ্দীন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ টিপু সুলতান, নেত্রকোনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবু তাহের খান, চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ হোসেন, রাজশাহী কলেজের অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল ইসলাম, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম এবং গুরুদয়াল সরকারি কলেজের অধ্যাপক ড. তৌহিদা জেসমিন শম্পা।
কারিগরি কলেজ ও মাদ্রাসা পর্যায় থেকেও পাঁচজন করে শিক্ষক সম্মাননার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খ্যাতিমান শিক্ষকেরা
সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নির্বাচিত ২০ জনের মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক খ্যাতিমান শিক্ষক রয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রয়াত অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ, নৃবিজ্ঞান বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সদরুল আমিন এবং আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দীন খান।
এ তালিকায় রসায়ন, জীববিজ্ঞান, বায়োমেডিক্যাল ফিজিক্স, আইনসহ বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকেরাও রয়েছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড. অরুণ কুমার বসাক, ড. মো. ইব্রাহীম হোসেন মন্ডল ও ড. মো. গোলাম ছাদিক; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড. জামাল নজরুল ইসলাম (মরণোত্তর), ড. আ ন ম মুনির আহমেদ চৌধুরী ও ড. আমির মুহাম্মদ নসরুল্লাহ এবং জাহাঙ্গীরনগর ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মাননা পাচ্ছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. নোভা আহমেদ এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. ফুয়াদ হাসান মল্লিক।
চিকিৎসা, কৃষি ও প্রকৌশল শিক্ষায়ও সম্মাননা
চিকিৎসা শিক্ষা থেকে মোট ১০ জন শিক্ষককে নির্বাচিত করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ছাড়াও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক খ্যাতিমান চিকিৎসক-শিক্ষক এই তালিকায় রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হবে।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নির্বাচিত তিনজন হলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মো. বাহানুর রহমান, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মো. আব্দুল বাছেত মিয়া এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মো. ফজলুল করিম।
প্রকৌশল ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শিক্ষাতেও থাকছে বিশেষ স্বীকৃতি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তালিকায় রাখা হয়েছে।
শিক্ষকদের অবদানকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
শিক্ষকরা শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না; তাঁরা একটি প্রজন্মের জ্ঞান, মূল্যবোধ ও চিন্তাভাবনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এই সম্মাননা আয়োজনকে শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এবার ১২ জনের পরিবর্তে ১০১ জন শিক্ষককে সম্মাননার আওতায় আনার ফলে দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকরা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
অক্টোবর ৪, ২০২৬