মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে নজিরবিহীন আর্থিক দুর্নীতি (পর্ব-০১)

মাত্র ২ মাসে শ্রমিক মজুরি বাবদ ৩ কোটি ১৮ লক্ষ টাকা ব্যয়, টেন্ডার ছাড়াই 'স্পট কোটেশন'!

ঢাকা: মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে উন্নয়নমূলক কাজের নামে শ্রমিকদের মজুরি বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাত্র দুই মাসের মধ্যে শ্রমিকদের পারিশ্রমিক ও মজুরি খাতে ৩,১৮,৮৯,০৫৪/- (তিন কোটি আঠারো লক্ষ ঊননব্বই হাজার চুয়ান্ন) টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (PPR) সম্পূর্ণরূপে লঙ্ঘন করা হয়েছে।

কোটি কোটি টাকার মজুরি, টেন্ডার নেই

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২0২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত (প্রায় দুই মাস) এডহক কমিটির নির্দেশে ৪ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকার উন্নয়ন কাজ করা হয়। এই কাজের মধ্যে নির্মাণ ও মেরামতের জন্য ব্যবহৃত শ্রমিক মজুরি বাবদ ব্যয়িত অর্থের হিসাব নিম্নরূপ:

কাজের বিবরণ

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নাম

ব্যয়িত টাকার পরিমাণ

রং করা (লেবার)

বান্না এন্টারপ্রাইজ

১,৩০,৯২,৯৭৭/-

রাজমিস্ত্রী, কাঠ, সেনিটারী (লেবার)

মেসার্স শিলা এন্টারপ্রাইজ

৬১,২০,৪৬০/-

টাইলস, মোজাইক ও ইলেকট্রিক (লেবার)

তানভীর এন্টারপ্রাইজ

১৩,৭৭,৪৭৪/-

গ্রীল, অভিভাবক সেড (লেবার)

মেসার্স মোল্লা ওয়েল্ড

১২,৪৮,১৪৩/-

মোট শ্রমিক মজুরি ব্যয়

 

৩,১৮,৮৯,০৫৪/-

(এছাড়া মালামাল ক্রয় বাবদ আরও ১,২৩,৭৪,৪৩৭/- টাকা নগদে ব্যয় করা হয়)।

বিধি লঙ্ঘন করে স্পট কোটেশন

তদন্তে ডিআইএ নিশ্চিত করেছে যে, এই বিশাল অঙ্কের মজুরি প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার দরপত্র বা টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি।

  • পিপিআর-এর লঙ্ঘন: পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (PPR) অনুযায়ী, ৬,০০,০০০/- (ছয় লক্ষ) টাকার অধিক মজুরি প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ প্রদান করতে হয়।
  • ক্ষমতার অপব্যবহার: কিন্তু মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৬ লক্ষ টাকার সীমা অতিক্রম করে প্রায় সোয়া তিন কোটি টাকা ব্যয় করেছে 'স্পট কোটেশনের' মাধ্যমে। এই পদ্ধতিতে কাজ দেওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দর নিশ্চিত হয়নি, যা আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের পথ সুগম করেছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।

বাতিল কমিটি দিয়ে কাজ করানোর অভিযোগ

তদন্ত প্রতিবেদন আরও জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নতুন এডহক কমিটি গঠনের নির্দেশ (১৮/১১/২০২৪) জারির পরও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জনাব মোঃ আখলাক আহম্মেদ পূর্বের (বাতিলকৃত) এডহক কমিটির মাধ্যমেই কার্যক্রম চালিয়ে যান। বাতিল কমিটির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের এই উন্নয়ন কাজ করানো হয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ের আদেশ অমান্য করার শামিল।

রাজস্ব ফাঁকি

উন্নয়ন কাজের জন্য ঠিকাদারদের পরিশোধিত ৩,১২,১৮,০০০/- টাকার ওপর ধার্যকৃত ভ্যাট ও আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। শ্রমিক মজুরি বাবদ ব্যয়িত বিপুল অঙ্কের অর্থের ওপরও এই রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য মোট ৩৮,০২,২৫০/- (আটত্রিশ লক্ষ দুই হাজার দুইশত পঞ্চাশ) টাকা অবিলম্বে জমা দেওয়ার জন্য প্রতিবেদনে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত এই ঘটনা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে একটি বাতিল কমিটি মাত্র দুই মাসে বিপুল অঙ্কের টাকা টেন্ডার ছাড়াই মজুরি খাতে ব্যয় করে সরকারি বিধিমালাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে।

 ( দ্বিতীয় পর্ব আসছে শিগগিরই, কারা কারা এই লুটপাটে জড়িত তাদেরও পরিচয় তুলে ধরা হবে )

 

মন্তব্য করুন

মাধ্যমিক শিক্ষকদের ৪২ দিনের প্রশিক্ষণ শুরু শনিবার

লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন (লেইস) প্রকল্পের আওতায় মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের ৪২ দিনব্যাপী ‘প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং’-এর তৃতীয় ব্যাচের প্রশিক্ষণ শুরু হচ্ছে আগামী শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর)। দেশের ১৪টি সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজে (টিটিসি) বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে এ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে।

এ ব্যাচে চারটি বিষয়ের প্রতিটিতে ৪০ জন করে মোট ১৬০ জন শিক্ষক প্রশিক্ষণে অংশ নেবেন। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) মাউশির এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব নির্দেশনা জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রকল্প দপ্তর থেকে সরবরাহ করা তালিকা অনুযায়ী প্রশিক্ষণার্থীদের আমন্ত্রণপত্র পাঠানোর পাশাপাশি টেলিফোনে যোগাযোগ করে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণ শুরুর আগের দিন শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার মধ্যে প্রশিক্ষণকেন্দ্রে রিপোর্ট করতে হবে প্রশিক্ষণার্থীদের।

রিপোর্টিংয়ের সময় কয়েকটি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে আনতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—বয়স যাচাইয়ের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, চাকরিতে প্রথম যোগদানের কপি, বেসরকারি শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এমপিও প্রাপ্তির আদেশের কপি অথবা সর্বশেষ মাসের আইবাস জেনারেটেড বেতন বিলের কপি এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানের দেওয়া প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের ছাড়পত্র। এসব কাগজপত্র ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সংরক্ষণ করা হবে।

পুরোটা আবাসিক প্রশিক্ষণ

মাউশি জানিয়েছে, ৪২ দিনের এ কর্মসূচি সম্পূর্ণ আবাসিক। ফলে প্রশিক্ষণের পুরো সময় প্রশিক্ষণার্থীদের নির্ধারিত আবাসিক ব্যবস্থায় থেকে অংশ নিতে হবে। বিষয়টি প্রশিক্ষণার্থীদের আগেই জানিয়ে দিতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রশিক্ষণের প্রথম এক সপ্তাহের খাবার ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সঙ্গে রাখার পরামর্শ দিতে বলা হয়েছে।

থাকবে কো-অর্ডিনেশন কমিটি

প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য প্রতিটি প্রশিক্ষণার্থী গ্রুপের বিপরীতে একটি করে কো-অর্ডিনেশন কমিটি গঠন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট গ্রুপের প্রশিক্ষণ বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের মূল দায়িত্ব পালন করবে এই কমিটি।

সংশ্লিষ্ট টিটিসির মাস্টার ট্রেইনারদের মধ্য থেকে পর্যায়ক্রমে কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ আয়োজন ও বাস্তবায়নে টিটিসির অন্যান্য অনুষদ সদস্য ও কর্মচারীদেরও কমিটিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, অনুমোদিত বাজেটের বিস্তারিত বিভাজন ও ব্যয় নীতিমালা অনুসরণ করেই প্রশিক্ষণের সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। বাজেট অনুযায়ী প্রশিক্ষণার্থীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণসামগ্রী সংগ্রহ ও বিতরণ করতে হবে।

প্রশিক্ষণ শুরুর প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই সব প্রশিক্ষণার্থীর হাতে প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালের কপি পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে অনুমোদিত বাজেট অনুযায়ী প্রশিক্ষণার্থীদের আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট টিটিসিগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে মাউশি।

মন্তব্য করুন

জাল সনদের অভিযোগে মতিঝিল আইডিয়ালের ২৩ শিক্ষককে দুদকে তলব

ভুয়া ও জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি করার অভিযোগে রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২৩ শিক্ষককে তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আগামী ১ অক্টোবর তাদের কলেজের অধ্যক্ষের কার্যালয়ে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি কলেজের অধ্যক্ষ বরাবর পাঠানো দুদকের সহকারী পরিচালক ও অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা আখতারুজ্জামানের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভুয়া ও জাল সনদ ব্যবহার করে শিক্ষকতা করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগটি সুষ্ঠুভাবে অনুসন্ধানের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট ২৩ শিক্ষকের বক্তব্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ কারণে তাদের নামের তালিকাসহ নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

তলব করা শিক্ষকদের আগামী ১ অক্টোবর নির্ধারিত সময়ে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য নির্দেশ দিতে অনুরোধ করেছে দুদক। একই সঙ্গে তাদের বিএড সনদের মূল কপি, এক সেট ফটোকপি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সঙ্গে আনতে বলা হয়েছে।

কোনো শিক্ষক জরুরি কারণে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হতে না পারলে তার বিএড সনদের মূল কপি ও এক সেট ফটোকপি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি অধ্যক্ষের জিম্মায় রাখার জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন শিক্ষকের সনদ নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রয়োজনীয় কিছু নথি পাওয়ার পর অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।

দুদকের তলব করা ২৩ শিক্ষক হলেন—রুবিনা সুলতানা, মো. সুলাইমান, তাহমিনা ইয়াছমিন, মোহা. কাবিউল ইসলাম, সেবিকা রানী পাল, মোছা. নাহিদা আখতার, সালেহ আহমেদ, মো. মোজাম্মেল হক, মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম খান, মাহফুজা হাসনা, সালমা খাতুন, সুস্মিতা আক্তার, মো. আজিবর রহমান শেখ, মো. রবিউল ইসলাম, মোহাম্মদ আবু বকর, মহিউদ্দিন, আজমল হোসেন, মো. ফরিদুর রহমান শেখ, নুরজাহান, মো. সিরাজুল ইসলাম, মুহাম্মদ আল আমীন খান, মোহাম্মদ আফছার উদ্দিন এবং এন. এম. মঞ্জুরুল হক।

মন্তব্য করুন

মাধ্যমিক ও কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর

ভেঙে হচ্ছে দুটি পৃথক অধিদপ্তর

মাউশিকে (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর) ভেঙে দুটি পৃথক অধিদপ্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে একটি হবে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং অন্যটি হবে কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর।

প্রধান উপদেষ্টা এই বিষয়ে সম্মতি দেওয়ার পর, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন এই দুটি পৃথক অধিদপ্তর গঠনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। অধিদপ্তর দুটির জন্য পৃথক জনবলকাঠামো (অর্গানোগ্রাম), কার্যতালিকা (অ্যালোকেশন অব বিজনেস) সহ পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আজ রোববার (১২ অক্টোবর, ২০২৫, ধরে নেওয়া হলো) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে এই তথ্য জানানো হয়। এই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একজন যুগ্ম সচিবকে।

কমিটিকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে দুটি পৃথক জনবলকাঠামো প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের দাবি ও বিতর্ক: মাউশিকে বিভক্ত করার এই উদ্যোগ নতুন নয়। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে ভাগ করে 'মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর' এবং 'উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর' করার কথা ছিল, যা তখন বাস্তবায়িত হয়নি। তবে, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ঠিকই গঠিত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সরকারের আমলেও শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাবে মাউশিকে দুই ভাগ করার বিষয়টি উঠে এসেছিল।

তবে, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনে পরস্পরবিরোধী অবস্থান রয়েছে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা চান না মাউশিকে ভাগ করা হোক। অন্যদিকে, মাধ্যমিকের শিক্ষকেরা দ্রুত তাঁদের জন্য আলাদা 'মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর' করার পক্ষে।

মন্তব্য করুন

আইডি-পাসওয়ার্ড না পাওয়া শিক্ষকদের সুখবর দিচ্ছে মাউশি

বেসরকারি স্কুল-কলেজে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি আবেদনের জন্য আইডি-পাসওয়ার্ড না পাওয়া শিক্ষকদের নতুন করে তা দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। এ বিষয়ে টেলিটক ও জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) মাউশির একটি সূত্র জানায়, আইডি-পাসওয়ার্ড না পাওয়া শিক্ষকদের আবারও পাসওয়ার্ড পাঠানোর বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মতি হয়েছে। তবে আইডি-পাসওয়ার্ড জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নাকি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছে পাঠানো হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাউশির এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘সভা এখনো শেষ হয়নি। তবে আইডি-পাসওয়ার্ডের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। শিগগিরই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে।’

মাউশির একটি সূত্র জানায়, বুধবার (২৬ আগস্ট) বেলা ৩টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত বদলির জন্য ১১ হাজার ৯৮৬ জন শিক্ষক আবেদন করেছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদনের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

মন্তব্য করুন

এইচএসসি ফলে ইংরেজি বিপর্যয়

দেশে বিদ্যালয়ের প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ বছর ইংরেজি ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে ইংরেজিভীতি কাটছে না। মুখস্থ-নির্ভর শিক্ষণ পদ্ধতি এবং জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এই ভাষা দ্রুত মস্তিষ্ক থেকে হারিয়ে যায়। যার ভয়াবহ প্রতিফলন দেখা গেছে ২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে।ৃ

ফলাফলে ভয়াবহ চিত্র

এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট অকৃতকার্য ৫ লাখ ৮ হাজার ৭০১ জন শিক্ষার্থীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশের ভরাডুবি হয়েছে ইংরেজি বিষয়ে। ইংরেজিতে পাশের হার ৭৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত পাঁচ বছরে (২০২১-২০২৫) গড় পাশের হার প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে (২০২১ সালে ৯৫.২৬% থেকে ২০২৫ সালে ৫৭.১২%)।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৮.৮৩ শতাংশ পাশ করেছে। বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজি, হিসাব বিজ্ঞান এবং আইসিটি—এই তিনটি বিষয়ে ফল সবচেয়ে খারাপ। ইংরেজিতে ফেল করেছেন ৩৮.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। ঢাকা ও বরিশালে পাশের হার ৭০ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও, যশোর বোর্ডে তা সর্বনিম্ন—মাত্র ৫৪.৮২ শতাংশ। বিশেষ করে, ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে নম্বর পাওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

দুর্বলতার মূল কারণ: অদক্ষ শিক্ষক ও মুখস্থ নির্ভরতা:

শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই অদক্ষ শিক্ষক দ্বারা পাঠদান এবং মুখস্থ-নির্ভর শিক্ষণ পদ্ধতিকে দায়ী করেছেন।

  • শিক্ষকের অভাব ও অদক্ষতা: মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোর ৮৪ শতাংশ ইংরেজি শিক্ষকের নেই ইংরেজিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। অর্থাৎ, ফল বিপর্যয়ের অন্যতম নেপথ্যে রয়েছে দক্ষ শিক্ষকের অভাব।

  • প্রাথমিক স্তরে দুর্বল ভিত্তি: শিক্ষাবিদদের মতে, একটি শিশুর ইংরেজির ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক স্তরে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির প্রায় ১৬ ভাগ শিক্ষার্থী ইংরেজি বইয়ের একটি বর্ণও পড়তে পারে না।

  • ১২ বছর পরেও কথোপকথনে অক্ষমতা: মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষাজীবনে ১২ বছরের বেশি ইংরেজি পড়েও অনেক শিক্ষার্থী ভাষাটিতে সাধারণ কথোপকথন চালাতে এবং সাধারণ বাক্য গঠনে হিমশিম খায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক এই পরিস্থিতির জন্য শিক্ষার্থীদের ইংরেজি-ভীতি, শিখন পদ্ধতির জটিলতা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাবকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ মেধাবী মানুষের প্রয়োজন হলেও, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, অপর্যাপ্ত বেতন এবং উপযুক্ত সম্মানের অভাবের কারণে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট হচ্ছে না, যা ইংরেজির মান খারাপ হওয়ার একটি বড় কারণ।

উত্তরপত্রে হতাশাজনক চিত্র:

দীর্ঘদিন ধরে এইচএসসি পরীক্ষার পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী একজন শিক্ষক জানান, অনেক শিক্ষার্থীর উত্তরপত্রের দিকে তাকালে অর্থহীন ও অসংলগ্ন লেখা চোখে পড়ে। সঠিক বাক্য গঠন ও মৌলিক ব্যাকরণের উপস্থিতি থাকে না। বানান ভুল এতটাই বেশি যে তা পড়তে পরীক্ষকদের কষ্ট হয়। অনেক সময় মনে হয় শিক্ষার্থীরা যেন কখনো কলেজে যায়নি বা বই কেনেনি। তারা ই-মেইল, চিঠি, দরখাস্ত বা অনুচ্ছেদ লেখার মৌলিক নিয়ম সম্পর্কেও ধারণা রাখে না, যা ইঙ্গিত করে যে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি বোঝার পরিবর্তে মুখস্থ বিদ্যা কাজে লাগিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে।

অন্যান্য কারণ:

শিক্ষাবোর্ডগুলোর কর্মকর্তারা এই পরিস্থিতির জন্য আরও কিছু কারণ উল্লেখ করেছেন:

  • মূল্যায়নে কঠোরতা: দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত পরীক্ষায় সহানুভূতির নম্বর বা অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার প্রথা এবার পুরোপুরি বন্ধ করে কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, ফলে ফলাফলে প্রকৃত সক্ষমতার প্রতিফলন ঘটেছে।

  • অন্যান্য দুর্বলতা: মফস্বলের কলেজগুলোতে অনলাইন বা ডিজিটাল কনটেন্টভিত্তিক পড়াশোনার অভাব, শিক্ষকের ঘাটতি, পরীক্ষার্থীদের দুর্বল লেখনশৈলী এবং শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিল থেকে দূরে সরে যাওয়াও ফলাফলের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

পরীক্ষার ভরা মৌসুমে কমিটি নির্বাচনের নির্দেশ: শিক্ষামহলে তীব্র উদ্বেগ

বার্ষিক ও নির্বাচনী পরীক্ষার মাঝে গভর্নিং বডি নির্বাচন সম্পন্ন করার নির্দেশে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের চাপ বৃদ্ধি; বিঘ্নিত হতে পারে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়ায় শিক্ষামহলে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত শিক্ষাবর্ষের শুরুতে, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যখন পাঠদানের চাপ কম থাকে। কিন্তু এবার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সময়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছেন।

 

পরীক্ষার সময়সূচির সঙ্গে সংঘাত

মন্ত্রণালয়ের শিক্ষাপঞ্জি অনুসারে, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসটি পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। ২০ নভেম্বর থেকে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা চলবে। অন্যদিকে, দশম শ্রেণির নির্বাচনী পরীক্ষা (টেস্ট পরীক্ষা) অনুষ্ঠিত হবে ২৯ নভেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

শিক্ষার্থীরা যখন চূড়ান্ত পড়াশোনা ও প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে নির্বাচনের আয়োজন করা হলে তা সরাসরি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।

আরো পড়ুন

  1. পরের বাজেটে বাড়তে পারে শিক্ষকদের বরাদ্দ: শিক্ষা উপদেষ্টা 
  2. মাউশির ডিজি অধ্যাপক ড. মুহম্মদ আজাদ খানের পদত্যাগ কেন ? 

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ

শিক্ষকদের মতে, এই সময়ে তাঁরা প্রশ্নপত্র তৈরি, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং পরীক্ষা পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকেন। এর সঙ্গে ভোটের প্রস্তুতি, বুথ স্থাপন ও নির্বাচন পরিচালনার বাড়তি চাপ শিক্ষকদের ওপর এসে পড়বে। অন্যদিকে, নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা ও পরিবেশগত কারণে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বিঘ্নিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। অভিভাবকরাও সন্তানের পরীক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকার সময় নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব সন্তানের মানসিক চাপের ওপর পড়তে পারে।

 

তাড়াহুড়োর কারণ নিয়ে প্রশ্ন

দীর্ঘদিন ধরে দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটির নির্বাচন বকেয়া থাকলেও, পরীক্ষার ঠিক আগ মুহূর্তে এই নির্দেশ কার্যকরের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা। অনেকে ধারণা করছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই তড়িঘড়ি করে এই নির্বাচন এগিয়ে আনা হয়েছে।

এ বিষয়ে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, "স্কুল পরিচালনায় কমিটি জরুরি, তবে তা যেন শিক্ষার ক্ষতি করে না হয়। পরীক্ষার এই সংবেদনশীল সময়ে নির্বাচন আয়োজনের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য কাজ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।"

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানান, একই সময়ে নির্বাচন ও পরীক্ষা নিশ্চিতভাবেই শিক্ষার্থীদের অসুবিধায় ফেলবে। মন্ত্রণালয়ের উচিত— হয় নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করা, নতুবা পরীক্ষার রুটিনে পুনর্বিবেচনা করা। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁদের কোনো সুস্পষ্ট মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

শিক্ষাবিদ ও সাধারণ অভিভাবকরা এখন জানতে চাইছেন—শিক্ষাব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলে এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে কিনা।

মন্তব্য করুন
×