‘রেজিস্ট্রেশন নম্বর না দিলে রুম থেকে বের হতে দেব না’—অধ্যাপক ড. রজব আলী
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শেকৃবি) ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন অনিয়মের তদন্তে গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হয়েছেন ‘রূপালী বাংলাদেশ’ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মোহাম্মদ ফাহিম। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তাকে কক্ষে আটকে রাখা এবং ব্যক্তিগত একাডেমিক তথ্য (রেজিস্ট্রেশন নম্বর) দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ওই কমিটির আহ্বায়ক ও কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. রজব আলীর বিরুদ্ধে।
জানা যায়, সম্প্রতি শেকৃবিতে ২০০৯-২০২৪ সালের নিয়োগ ও পদোন্নতিসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখতে গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির কার্যক্রম ও বর্তমান অবস্থা জানতে অধ্যাপক ড. রজব আলীর কার্যালয়ে যান সাংবাদিক মোহাম্মদ ফাহিম। কার্যালয়ে পৌঁছে কমিটির বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ শেষে তিনি বের হওয়ার সময় তাকে পুনরায় ডেকে পাঠান অধ্যাপক রজব।
এ সময় পেশাগত পরিচয়পত্র দেখানোর পরও ওই অধ্যাপক তার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন নম্বর, কোন বিভাগে এমএস করছেন এবং সুপারভাইজারের নাম জানতে চান। সাংবাদিক তার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র দেখিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের কথা জানালেও অধ্যাপক রজব আলী নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন।
সাংবাদিক রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় অধ্যাপক রজব আলী তাকে উদ্দেশ করে বলেন, “রেজিস্ট্রেশন নম্বর না দিলে রুম থেকে বের হতে দেব না।”
তিনি আরও বলেন, “তুমি কি আমাকে চেনো? আমি এখানে ৩২ বছর শিক্ষকতা করছি। যদি রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিতে না চাও, তাহলে সাংবাদিকতা করতে কেন এসেছ? যদি ডিগ্রির ভয় পাও, তাহলে কেন সাংবাদিকতা করতে এসেছ?”
একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও নিরাপত্তা বিভাগের মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলেন এবং প্রক্টরকে ফোন করে ওই সাংবাদিকের পরিচয় যাচাই করেন। এছাড়া ভবিষ্যতে এই কমিটির তথ্য না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, যারা রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেয় না, তিনি তাদের মোবাইল নম্বর ব্লক করে রাখেন এবং তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করেন না। পরবর্তীতে শেকৃবি সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহেদ মাহমুদ মাহিনকে ফোন করে বিষয়টি জানানোর পর ওই সাংবাদিক কক্ষ ত্যাগ করেন।
শেকৃবিতে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ ও পদোন্নতির নানা অনিয়ম খতিয়ে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে। কৃষি অনুষদের এন্টোমলজি (কীটতত্ত্ব) বিভাগের অধ্যাপক ড. রজব আলীকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়। মূলত সেই তদন্ত কমিটির অগ্রগতির খোঁজ নিতে গিয়েই এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন সংবাদকর্মী।
এ বিষয়ে সাংবাদিক মোহাম্মদ ফাহিম ফয়সাল বলেন, “আমি আমার পেশাগত জায়গা থেকে যতটুকু সৌজন্যতা বজায় রাখা সম্ভব, তা বজায় রেখেছি। স্যারকে আমার রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিতে অস্বীকৃতি জানানোই আমার একমাত্র অসৌজন্যমূলক আচরণ। তিনি আমাকে কোনো ডকুমেন্ট দেখাননি বা কোনো ধরনের সহযোগিতা করেননি। বরং কয়েক বান্ডিল কাগজপত্র আমার সামনে রেখে দেখিয়েছেন যে তাঁরা কাজ করছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি গোপনীয় কাজের কোনো তথ্য এখন শেয়ার করব না। তুমি এখন আসতে পারো।’
তথ্য সংগ্রহ শেষে কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় আমাকে ফের ডেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন নম্বরসহ ব্যক্তিগত একাডেমিক তথ্য জানতে চাওয়া হয়। পরিচয়পত্র দেখানোর পরও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিতে চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে রেজিস্ট্রেশন নম্বর না দিলে কক্ষ থেকে বের হতে দেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়। পরবর্তী তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও নিরাপত্তা বিভাগের মহাপরিচালককে ফোন দিবেন বলে ভয়ভীতি দিয়েছেন এবং পরে তিনি এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে ফোন দেন। আমি বিষয়টি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদককে ফোন করে অবগত করি।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত অধ্যাপক ড. রজব আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, “শুরুতে সে নিজেকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে পরিচয় দেয়। আলোচনা চলাকালে বিভিন্ন বিষয়ে সে আমাকে খোঁচা দিচ্ছিল। পরে তার নাম ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর জানতে চাইলে সে তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সে যদি সত্যিই ছাত্র হয়, তাহলে রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিতে সমস্যা কোথায়?”
সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্রের পরিবর্তে ব্যক্তিগত রেজিস্ট্রেশন নম্বর কেন প্রয়োজন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সে নিজেকে ছাত্র পরিচয় দেওয়ায় আমি তার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছি এবং তাকে অনেক কাগজপত্রও দেখিয়েছি। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে আমার সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করা উচিত ছিল, সে তা বজায় রাখেনি।”