গোবিপ্রবির নতুন ভিসির বিরুদ্ধে ইউজিসির চিঠি জালিয়াতির অভিযোগ
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) নবনিযুক্ত উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসানের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চিঠি জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ দাবির অভিযোগ আড়াল করতে ইউজিসির একটি চিঠির আদলে ভুয়া নথি তৈরি করে তা সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসানকে চার বছরের জন্য গোবিপ্রবির ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর আগে ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর তাকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি হিসেবে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ২০ মাস প্রো-ভিসির দায়িত্ব পালনের পর তিনি ভিসির দায়িত্ব নেন।
ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে সাংবাদিকদের কাছে একটি প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়। এতে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসে প্রকাশিত ‘২০ লাখ টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বানাতে চাওয়া সেই অধ্যাপককে এবার ভিসি নিয়োগ দেওয়া হলো’ শীর্ষক প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিবেদনটি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হয়।
প্রতিবাদলিপির সঙ্গে ইউজিসির একটি চিঠিও পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে দাবি করা হয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তে কোনো অনিয়মের সত্যতা পাওয়া যায়নি এবং নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ম অনুযায়ী চলমান রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে ইউজিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই চিঠির সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।
ইউজিসির চিঠি ‘ফেইক’, বললেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা
প্রতিবাদলিপি ও চিঠিটি সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানোর পাশাপাশি ফোনও করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মাহবুবুল আলম। এ সময় তিনি দাবি করেন, শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়টি মীমাংসিত হয়েছে এবং এ ঘটনায় ভিসি অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসানের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
তবে চিঠিটি পর্যালোচনা করে এবং ইউজিসির সঙ্গে যোগাযোগ করে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান জানান, সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো চিঠিটি ‘ফেইক’।
তিনি একই তারিখ ও স্মারক নম্বরের একটি প্রকৃত চিঠি পাঠান। সেখানে বলা হয়েছে, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ কার্যক্রমে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ দেওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগের পর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে তদন্ত শেষে সাত কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশ দিতে বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য গত ৪ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে চিঠি পাঠায় ইউজিসি।
অভিযোগ উঠেছে, ইউজিসির তদন্ত কমিটি গঠনের ওই চিঠির একই তারিখ ও স্মারক নম্বর ব্যবহার করে একটি ভুয়া চিঠি তৈরি করা হয়েছে। পরে সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো হয়।
২০ লাখ টাকা দাবির অভিযোগ
গোবিপ্রবির শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগটি করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. সিফাত হোসেন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি ইউজিসি চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে তিনি তৎকালীন প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসানের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
অভিযোগপত্রে সিফাত উল্লেখ করেন, তিনি গোবিপ্রবির পরিসংখ্যান বিভাগে প্রভাষক পদে আবেদন করেছিলেন। নিয়োগ পরীক্ষার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রো-ভিসির সঙ্গে তার একাডেমিক পরিচয়ের সূত্রে যোগাযোগ হয়। পরে তাকে একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
সিফাতের অভিযোগ, ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে তোফায়েল আহমেদ নামে এক ব্যক্তি নিজেকে ভিসির পিএস পরিচয় দেন। তিনি চাকরি পেতে হলে ‘খুশি’ করার কথা বলেন এবং প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য ২০ লাখ টাকা দাবি করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই অর্থের অর্ধেক নিয়োগের আগে এবং বাকি অর্ধেক নিয়োগপত্র পাওয়ার পর দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য সতর্ক করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ছাড়া নিয়োগ পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সিফাত। তার দাবি, আগের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে লিখিত পরীক্ষা থাকলেও এবার লিখিত পরীক্ষা বাতিল করে শুধু মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়।
অভিযোগ তুলে নেওয়ার চাপের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে সিফাত আরও দাবি করেন, অভিযোগটি ইউজিসিতে জমা দেওয়ার পর তা কোনোভাবে তৎকালীন প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসানের হাতে চলে যায়। এরপর তাকে এবং তার পরিবার ও কর্মস্থলে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ৬ ফেব্রুয়ারি ইউজিসি চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ প্রত্যাহারের আবেদন করেন সিফাত। তবে পরে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি জানান, অভিযোগ প্রত্যাহারের চিঠিটি তিনি নিজে লেখেননি; শুধু তাতে স্বাক্ষর করেছিলেন। চিঠিতে ব্যবহৃত তারিখও ব্যাকডেটেড ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। গত ১০ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, অভিযোগটি মিথ্যা এবং তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। ওই প্রার্থী ভুল স্বীকার করে লিখিতভাবে ক্ষমা চেয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
চিঠি জালিয়াতির বিষয়ে যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয়
ইউজিসির চিঠি জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মাহবুবুল আলম বলেন, ভিসির নির্দেশে তিনি সেদিন চিঠি ও প্রতিবাদলিপি সাংবাদিকদের পাঠিয়েছিলেন। পরে চিঠিটি জালিয়াতি করা হয়েছে—এমন তথ্য জানানো হলে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তিনি সেটি পাঠিয়েছেন।
অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসানের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে কল ও বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরে জনসংযোগ দপ্তরের উপ-পরিচালক জানান, ভিসি ওই দিন ঢাকায় জাতীয় সংসদের অধিবেশনে থাকায় কথা বলতে পারছেন না।
এদিকে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। কমিশনের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি ঘটনাটি দেখবেন বলে জানান।
সরকারি চাকরি আইনে শাস্তির বিধান
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হলে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিম্ন পদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ, বাধ্যতামূলক অবসর এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত।
তবে অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।