অনুচ্ছেদ ৪ক বিলুপ্তি: ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪ক বিলুপ্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, যা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি প্রদর্শন সংক্রান্ত। কমিশন এই প্রস্তাবটি তাদের ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’–এ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

এই লক্ষ্যে, কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের নামে গত বৃহস্পতিবার রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে জানানো হয় যে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে 'জুলাই সনদ ২০২৫' প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নবিষয়ক বৈঠক শেষ হয়েছে। এখন কমিশন বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪ক-এ উল্লিখিত বিধান—যা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির কার্যালয়সহ সকল সরকারি, আধা-সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এবং বিদেশে অবস্থিত দূতাবাস ও মিশনসমূহে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনকে সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক করে—সেই অনুচ্ছেদটি বিলুপ্তির প্রস্তাব সনদে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

দলগুলোর করণীয়: চিঠিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে ১১ অক্টোবর শনিবার বিকেল চারটার মধ্যে তাদের লিখিত মতামত কমিশন বরাবর, অথবা কমিশনের নির্দিষ্ট ই-মেইল বা হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। প্রয়োজনে কমিশন থেকে আরও তথ্য জানার জন্যও যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

দলীয় প্রতিক্রিয়া: আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান কমিশন থেকে চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন, তবে তিনি জানান যে এ বিষয়ে এখনো কোনো মতামত পাঠাননি।

প্রেক্ষাপট: উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আনে। এই সংশোধনীর মাধ্যমেই শাসনতন্ত্রের প্রথম ভাগে 'জাতির পিতার প্রতিকৃতি' শিরোনামে অনুচ্ছেদ ৪ক যুক্ত হয়, যা নির্দিষ্ট স্থানে জাতির পিতার প্রতিকৃতি সংরক্ষণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আরোপ করে।

মন্তব্য করুন

মাইলস্টোন দুর্ঘটনা: সাড়ে তিন মাস চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেন যমজ দুই শিশু

জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে প্রায় সাড়ে তিন মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়ি ফিরলেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহত দশ বছর বয়সী যমজ শিশু সারিনাহ জাহান সায়রা ও সাইবাহ জাহান সায়মা।

এ পর্যন্ত বিমান দুর্ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ ৩৩ জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন।

আজ বুধবার সকালে ইনস্টিটিউটের পরিচালকের কার্যালয়ে দুই শিশুকে বিদায় জানান হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা।

এসময় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘মাইলস্টোন স্কুলের বিমান দুর্ঘটনায় আহত ৫৭ জন এই ইনস্টিটিউট থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন ২০ জন। একজনকে ট্রমা ম্যানেজমেন্টের জন্য মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনজন এখনো চিকিৎসাধীন আছেন, তবে তারা সবাই আশঙ্কামুক্ত।’

দুই যমজ শিশুর মধ্যে সায়রা ৩০ শতাংশ এবং সায়মা ১৫ শতাংশ দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফরা দগ্ধ প্রত্যেক রোগীকে আন্তরিক সেবা দিয়েছেন। তাঁরা কঠোর পরিশ্রম করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও আমাদের প্রয়োজনীয় সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।

‘আহতদের মধ্যে যারা বাড়ি ফিরেছেন, তাদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং ফলোআপ চিকিৎসা দিচ্ছে,’ যোগ করেন তিনি।

এসময় তিনি সিঙ্গাপুর, ভারত, চীন ও যুক্তরাজ্যসহ যেসব বিদেশি চিকিৎসক আহতদের চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের প্রতিও ধন্যবাদ জানান।

 

দুই যমজ শিশুর বাবা-মা ইয়াসিন মজুমদার ও আকলিমা আক্তার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

গত ২১ জুলাই দুপুরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি দোতলা ভবনে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় মোট ৩৬ জন নিহত এবং ১২৪ জন আহত হন। তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে যুদ্ধবিমানের পাইলটের উড্ডয়ন-ত্রুটি চিহ্নিত করেছে।

মন্তব্য করুন

তৃতীয় দিনের মতো শহীদ মিনারে অবস্থান প্রাথমিক শিক্ষকদের

দশম গ্রেডসহ তিন দফা দাবি আদায়ে টানা তৃতীয় দিনের মতো শহীদ মিনারে অবস্থান করছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা। রোববার (১০ নভেম্বর) সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা শিক্ষকরা শহীদ মিনার চত্বরে জড়ো হন। কেউ গাছের ছায়ায় বসে আছেন, কেউ আবার মাইকে বক্তব্য দিচ্ছেন। মাঝে মাঝে দেশাত্মবোধক গান ও কবিতাও শোনা যাচ্ছে তাঁদের অবস্থানস্থলে।

 

শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন, সরকার এখনো তাঁদের দাবির বিষয়ে কোনো আশ্বাস দেয়নি। তাই তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের দাবি পূরণ না হলে কর্মসূচি আরও কঠোর করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।

 

এই আন্দোলনের কারণে সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। ফলে শিক্ষা কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। সামনে পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও বার্ষিক পরীক্ষা থাকায় অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

 

অন্যদিকে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। শিক্ষকরা আশা করছেন, দ্রুত সমাধান না এলে তাঁরা ঢাকায় আরও বড় পরিসরে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।

মন্তব্য করুন

শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় ১৭ নভেম্বর

সুপ্রিম কোর্ট
সুপ্রিম কোর্ট

জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামী ১৭ নভেম্বর (সোমবার)

বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ তারিখ নির্ধারণ করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদঅবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী

মামলার আসামিদের মধ্যে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বর্তমানে পলাতক। তবে রায় ঘোষণার দিন ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, যিনি মামলার অন্যতম আসামি থেকে পরে রাজসাক্ষী হয়ে যান।

রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয় গত ২৩ অক্টোবর। ওইদিন রাষ্ট্রপক্ষে পাঁচ দিন এবং আসামিপক্ষে তিন দিন যুক্তি উপস্থাপন শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সমাপনী বক্তব্য দেন।

এরপর ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণের জন্য ১৩ নভেম্বর দিন ঠিক করে আদেশ দেন।

মন্তব্য করুন

১১-২০ গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেলের দাবি: সর্বনিম্ন বেতন ৩২,০০০, সর্বোচ্চ ১,২৮,০০০ টাকা

সরকারি ১১-২০ গ্রেডের চাকরিজীবীরা অবিলম্বে ন্যায্য ও বৈষম্যহীন নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা ১৩ গ্রেডের নতুন বেতন কাঠামো প্রস্তাব করেছেন, যেখানে সর্বনিম্ন বেতন ৩২,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১,২৮,০০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।

আজ শুক্রবার (১০ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ১১-২০ গ্রেড সরকারি চাকরিজীবী ফোরামের সদস্যরা এই দাবি পেশ করেন।

 

মূল দাবি ও প্রস্তাবিত ভাতা

সংগঠনটি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে:

  • বাড়িভাড়া ভাতা:

    • ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায়: মূল বেতনের ৮০%

    • অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এলাকায়: ৭০%

    • অন্যান্য এলাকায়: ৬০%

  • চিকিৎসা ভাতা: ৬,০০০ টাকা

  • শিক্ষা ভাতা (সন্তান প্রতি): ৩,০০০ টাকা

  • যাতায়াত ভাতা:

    • ঢাকা: ৩,০০০ টাকা

    • অন্যান্য এলাকা: ২,০০০ টাকা

  • ইউটিলিটি ভাতা: ২,০০০ টাকা

  • টিফিন ভাতা: দৈনিক ১০০ টাকা (মাসিক ২,২০০ টাকা)

  • বৈশাখী ভাতা: ৫০%

  • ঝুঁকি ভাতা: ২,০০০ টাকা

  • পাহাড়ি ও উপকূলীয় অঞ্চলের কর্মচারীদের জন্য অতিরিক্ত ভাতা: ৪০%

পেনশন ও অন্যান্য দাবি

ফোরাম পেনশন সুবিধা বিদ্যমান ৯০% থেকে বাড়িয়ে ১০০% করার এবং আনুতোষিকের হার প্রতি ১ টাকায় ২৩০ টাকার পরিবর্তে ৫০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে।

সাধারণ সম্পাদক মো. মাহমুদুল হাসান তাঁর লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালের পে স্কেলে ব্যাপক বৈষম্য ছিল এবং গত ১০ বছরে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীরা দুটি পে স্কেল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাই বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই নতুন, বৈষম্যমুক্ত ও বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা জরুরি।


আল্টিমেটাম

সংগঠনটির সভাপতি মো. লুৎফর রহমান ঘোষণা দেন, আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই বৈষম্যমুক্ত নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় কর্মচারীরা আবার রাস্তায় নামতে বাধ্য হবেন। তাঁরা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কর্তৃক নবম পে কমিশন গঠনে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে কমিশন একটি ন্যায্য বেতন কাঠামো প্রস্তাব করবে।

মন্তব্য করুন

বৃহৎ সঞ্চয়ের সন্ধানে: দুর্বল পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে 'ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক', ২০ হাজার কোটি টাকার সরকারি ভরসা!

ইতিহাস গড়ার পথে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত। আর্থিক সংকটে জর্জরিত পাঁচটি বেসরকারি শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূতকরণের এক ঐতিহাসিক প্রস্তাবনা নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে উপদেষ্টা পরিষদ। এই বিশাল সমন্বয়ের ফলে দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে চলেছে, যার প্রাথমিক লক্ষ্য ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত করা।

৯ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ব্রিফিংয়ে নিশ্চিত করেন, দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি মোকাবেলা করতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যে পাঁচ ব্যাংক মিশে যাচ্ছে এক স্রোতে

একীভূত হয়ে যে নতুন ব্যাংকটি গঠিত হবে, তার জন্য প্রাথমিকভাবে 'ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক' অথবা 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক' নামে দুটি প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে। যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান তাদের পৃথক অস্তিত্ব বিলীন করে একটি বৃহত্তর শক্তিতে পরিণত হচ্ছে, তারা হলো—

১. ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ২. গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ৩. ইউনিয়ন ব্যাংক ৪. এক্সিম ব্যাংক ৫. সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক

 

আমানত ও চাকরির নিরাপত্তা: সরকারের পূর্ণ আশ্বাস

এই একীভূতকরণের ফলে আমানতকারীদের মনে যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল, তার নিরসন করেছে সরকারের ঘোষণা। প্রেস সচিব দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন, "একীভূত হওয়ার পর কেউ চাকরি হারাবেন না। আগের আমানত সবাই ফেরত পাবেন।"

তবে আমানত ফেরতের প্রক্রিয়া হবে সুসংগঠিত। জানা গেছে, আমানত সুরক্ষা আইনের সংশোধনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, যেসব গ্রাহকের আমানতের পরিমাণ ২ লক্ষ টাকা বা তার কম, তারা এককালীন পুরো অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। বাকি আমানতকারীদের অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে। আমানত সুরক্ষা আইনকে যুগোপযোগী করে তোলার সংশোধনীও উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদন করেছে।

 

প্রাথমিক মূলধন ও মালিকানা কৌশল

নতুন এই ব্যাংকের মেরুদণ্ড শক্তিশালী করতে সরকার এক বিশাল মূলধনের আশ্বাস দিয়েছে। ব্যাংকটির মূলধন হিসেবে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা দেবে। এই অতিরিক্ত পুঁজির জোগান আসবে বাজেট, বৈদেশিক ঋণ এবং প্রয়োজনে ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ফান্ড থেকে।

মালিকানার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ইউনাইটেড ইসলামী ব্যাংক প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন থাকবে, যার তত্ত্বাবধানে থাকবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। এই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ব্যাংকটিকে সম্পূর্ণ স্থিতিশীল করে তোলার পর, উপযুক্ত সময়ে তা বেসরকারি মালিকানায় হস্তান্তর করা হবে। সরকার আশা করছে, এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পাঁচ বছরের মতো সময় লাগতে পারে। উল্লেখ্য, এই একীভূতকরণের কার্যক্রম বাস্তবায়নে গত ৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরকে আহ্বায়ক করে একটি আট সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

শেখ হাসিনা–আসাদুজ্জামান: মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রধান ভিত্তিগুলো

শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামাল
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামাল

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে প্রথমবারের মতো রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অভিযান পরিচালনার নির্দেশ ও নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় বিভিন্ন ঘটনায় সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে নিহত ও আহত আন্দোলনকারীদের ক্ষতিপূরণের নির্দেশসহ রাষ্ট্রের অনুকূলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বছরের ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার সঙ্গে শেখ ফজলে নূর তাপসের এবং পরে হাসানুল হক ইনুর কথোপকথনে উঠে আসে যে, আন্দোলনরত ছাত্র–জনতার অবস্থান শনাক্ত করার জন্য তিনি ড্রোন ব্যবহারের নির্দেশ দেন এবং আন্দোলনকারীদের দমন করতে হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যার আদেশ প্রদান করেন। তাঁর এই নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অধীনস্থরা কোনো প্রকার বাধা দেয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জন আন্দোলনকারীকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। একই দিনে আশুলিয়ায়ও ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যা করে তাঁদের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়।

এই তিনটি ঘটনা—যা জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত—মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, এবং এই অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ সোমবার এ রায় প্রদান করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এটাই প্রথম কোনো মামলার রায়। একই মামলার আরেক আসামি, সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায়ে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বাংলাদেশে অবস্থিত সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আহতদের ক্ষেত্রেও তাঁদের আঘাতের মাত্রা ও ক্ষতির ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সরকারকে বলা হয়েছে।

মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠন করা হয়, যার প্রত্যেকটিতে একাধিক ঘটনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। সার্বিকভাবে এই পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে ছিল—উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান; আন্দোলনকারীদের নির্মূল করতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ; রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা; রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যা; এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে ফেলা।

মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান; একই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মাকসুদ কামালের সঙ্গে কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ আখ্যা দিয়ে তাঁদের ফাঁসি দেওয়ার হুমকি প্রদান; এবং উসকানি ও আদেশ দেওয়ার পর অধীনস্থদের মাধ্যমে এসব অপরাধ সংঘটন রোধে কোনো উদ্যোগ না নেওয়া, যার ফলশ্রুতিতে রংপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

যে অভিযোগে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড

প্রথম অভিযোগের অধীনে থাকা তিনটি ঘটনায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত বলেন—প্রথমটি উসকানি, দ্বিতীয়টি হত্যার নির্দেশ এবং তৃতীয়টি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে নিষ্ক্রিয়তা এবং দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিধান অনুযায়ী এগুলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই তিন ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁকে স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

রায়ের ভাষ্যে বলা হয়, একাধিক ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে যে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের হত্যার উদ্দেশ্যে ড্রোন, হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। চারখাঁরপুলের ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যার ঘটনা তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়নের ফল বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়। একইভাবে আশুলিয়ায় ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যা করে তাঁদের লাশ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাও তাঁর একই ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ। এই তিনটি ঘটনায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার সময় আদালতকক্ষে উপস্থিত অনেকেই হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তখন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সবাইকে আদালতের শৃঙ্খলা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, তাঁদের উচ্ছ্বাস আদালতের বাইরে প্রকাশ করলে তা আরও শোভনীয় হবে।

যে অভিযোগে আসাদুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড

রায়ে বলা হয়, আসাদুজ্জামান খান কামাল মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করেছেন এবং নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে কিংবা প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছেন। চানখাঁরপুলে ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যার ঘটনায় তাঁর দায় প্রমাণিত হয়েছে। একইভাবে আশুলিয়ার ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যার ক্ষেত্রেও তাঁর সহযোগিতা ও ব্যর্থতা উল্লেখ করা হয়। এই দুই ঘটনার মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড

রায়ে বলা হয়, মামলার আরেক আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন তদন্তের সময় সত্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ৩৬ দিনের আন্দোলনের প্রায় সব ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং বস্তুগত প্রমাণ উপস্থাপনে সহায়তা করেন। তাঁর স্বীকারোক্তি ও সহযোগিতা বিবেচনায় তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি না দিয়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম বলেন, তিন আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হলেও এগুলো ছয়টি কাউন্টে ভাগ করা হয়েছিল এবং দুটি অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি প্রযোজ্য হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড এবং আমৃত্যু কারাদণ্ড দুই ধরনের সাজা দেওয়া সম্ভব ছিল। অপরাধের নৃশংসতা, গুরুত্ব ও গভীরতা বিবেচনায় তিনটি কাউন্টে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি তিনটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। অন্যদিকে দুটি অভিযোগে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি রাজসাক্ষী হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড যোগ্য অপরাধ করলেও তাঁর ক্ষমা প্রার্থনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য আদালতকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে—এসব বিবেচনায় তাঁর সাজায় নমনীয়তা দেখানো হয়েছে।

মন্তব্য করুন
×