৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল: ৫০২টি পদ ফাঁকা, চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষোভ ও হতাশা
সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) দীর্ঘ তিন বছরের অপেক্ষার পর ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে দুই হাজার ৩০৯টি পদ থাকলেও নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৮০৭ জন প্রার্থী। অর্থাৎ, ৫০২টি পদ ফাঁকা রয়ে গেছে। এ নিয়ে চাকরিপ্রার্থীরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ।
পিএসসি জানায়, বিভিন্ন পেশাগত ও কারিগরি ক্যাডারে যোগ্য প্রার্থী না থাকায় এসব পদ ফাঁকা রাখা হয়েছে। কিছু পদে মনোনয়ন দেওয়ার মতো উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া যায়নি। এ ধরনের পদ ফাঁকা রাখার পরিস্থিতি পরবর্তী বিসিএসে পূরণ করা হবে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে।
চাকরিপ্রার্থীরা অভিযোগ করছেন, প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় প্রতি পদে পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রার্থী উত্তীর্ণ করা না হওয়ায় শেষপর্যায়ে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি। ফলে, দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নেওয়া প্রার্থীরা হতাশ হয়েছেন। তাদের মতে, পিএসসি একদিকে প্রিলি ও লিখিত পরীক্ষার কাট মার্কস নির্ধারণের ক্ষেত্রে খুব কঠোর, অন্যদিকে মৌখিক পরীক্ষায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় পদ ফাঁকা রেখে থাকে।
পরীক্ষা ও ফলাফলের বিবরণ:
-
২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, যেখানে ২,৩০৯টি ক্যাডার পদ থাকলেও তিন লাখ ৪৬ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী আবেদন করেন।
-
প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের ১৯ মে, যেখানে অংশ নেন ২,৬৮,১১৯ জন। প্রাথমিক বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হন ১২,৭৮৯ জন।
-
লিখিত পরীক্ষা শুরু হয় ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি এবং শেষ হয় ৩১ জানুয়ারি। প্রিলি উত্তীর্ণদের মধ্যে মাত্র ৬,৫৫৮ জন লিখিতে পাস করেন।
-
মৌখিক পরীক্ষা শুরু হয় ৮ জুলাই থেকে এবং কয়েক ধাপে নিয়ে অবশেষে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়।
পিএসসি সূত্র জানায়, প্রতিটি বিসিএসে কিছু পদ ফাঁকা থাকে, বিশেষত কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে। তবে এবার ফাঁকা পদ সংখ্যা নজিরবিহীনভাবে ৫০২। উদাহরণস্বরূপ, পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডারে ৪৪০টি পদ ফাঁকা রয়ে গেছে, যেখানে মাত্র এক বা দুইজন যোগ্য প্রার্থী পাওয়া গেছে।
পূর্ববর্তী বিসিএসে ফাঁকা পদ কম ছিল।
-
৪০তম বিসিএসে ২,২১৯ পদের মধ্যে ২৫৬টি ফাঁকা ছিল।
-
৪১তম বিসিএসে ২,৫৩৬ পদের মধ্যে ১৬টি ফাঁকা।
-
৪৩তম বিসিএসে ২,২১৮ পদের মধ্যে ৫৫টি ফাঁকা।
-
৪৪তম বিসিএসে ১,৭১০ পদের মধ্যে ৩৪টি ফাঁকা।
তুলনামূলকভাবে ৪৫তম বিসিএসে ফাঁকা পদ সংখ্যা সবকটি শেষ পাঁচটির মধ্যে সর্বোচ্চ। পিএসসি জানায়, ভবিষ্যতে এ ধরনের ফাঁকা পদ কমানোর চেষ্টা করা হবে এবং যোগ্য প্রার্থী থাকলে নিয়োগ সুপারিশ করা হবে।
চাকরিপ্রার্থীদের অভিমত:
চাকরিপ্রার্থীরা বলছেন, প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় শূন্যপদের তুলনায় কম প্রার্থী উত্তীর্ণ হওয়ার কারণে মৌখিক পরীক্ষায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। তারা দাবি করছেন, প্রতিটি শূন্যপদের জন্য প্রিলিতে অন্তত ১০ জনকে উত্তীর্ণ করা উচিত এবং লিখিত পরীক্ষায় অন্তত ৫-১০ জনকে রাখা উচিত। এতে করে মৌখিক পরীক্ষায় প্রতিটি পদ পূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রার্থী জানিয়েছেন, তারা একাধিক বিসিএসের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, তবু পিএসসির কঠোর বাছাই ও ফাঁকা পদ তাদের দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতিকে কার্যত নষ্ট করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য:
বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, “প্রায় তিন লাখ পরীক্ষার্থী দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছে। অথচ ২,৩০৯টি পদ পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। এটি অন্যায্য এবং অমানবিক। পিএসসিকে অবশ্যই পদ ফাঁকা রাখার পথ পরিহার করতে হবে এবং যথাযথ পদ পূরণের উপায় বের করতে হবে।”
পিএসসি জানায়, ফাঁকা থাকা পদগুলো পরবর্তী বিসিএসে পূরণ করা হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে এবং যোগ্য প্রার্থী নিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।