শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি নির্বাচন স্থগিতের দাবি জানাল বিএনপি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের স্কুল-কলেজে ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি নির্বাচন সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনে (ইসি) লিখিত দাবি জানিয়েছে বিএনপি।

বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) বিএনপির তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে কয়েক দফা প্রস্তাবনা জমা দেয়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ জাকারিয়া। এঁরা সবাই বিএনপির নির্বাচন কমিশন বিষয়ক কমিটির সদস্য।

ইসিতে দেওয়া লিখিত প্রস্তাবে দলটি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর সারাদেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি গঠিত হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার ঠিক আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় হঠাৎ করে আগামী ১ নভেম্বরের মধ্যে তড়িঘড়ি করে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন করে নির্বাচন সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে। বিএনপি এটিকে 'সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বলে মনে করছে।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, এই ধরনের কার্যক্রমের ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতি, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং ভোটকেন্দ্রের নির্বাচনী কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো বিশাল আয়োজনে শিক্ষক, অভিভাবক এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি নির্বাচন সংক্রান্ত নির্দেশনাটি দ্রুত স্থগিত করা আবশ্যক।

মন্তব্য করুন

মাইলস্টোন দুর্ঘটনা: সাড়ে তিন মাস চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেন যমজ দুই শিশু

জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে প্রায় সাড়ে তিন মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়ি ফিরলেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহত দশ বছর বয়সী যমজ শিশু সারিনাহ জাহান সায়রা ও সাইবাহ জাহান সায়মা।

এ পর্যন্ত বিমান দুর্ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ ৩৩ জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন।

আজ বুধবার সকালে ইনস্টিটিউটের পরিচালকের কার্যালয়ে দুই শিশুকে বিদায় জানান হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা।

এসময় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘মাইলস্টোন স্কুলের বিমান দুর্ঘটনায় আহত ৫৭ জন এই ইনস্টিটিউট থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন ২০ জন। একজনকে ট্রমা ম্যানেজমেন্টের জন্য মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনজন এখনো চিকিৎসাধীন আছেন, তবে তারা সবাই আশঙ্কামুক্ত।’

দুই যমজ শিশুর মধ্যে সায়রা ৩০ শতাংশ এবং সায়মা ১৫ শতাংশ দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফরা দগ্ধ প্রত্যেক রোগীকে আন্তরিক সেবা দিয়েছেন। তাঁরা কঠোর পরিশ্রম করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও আমাদের প্রয়োজনীয় সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।

‘আহতদের মধ্যে যারা বাড়ি ফিরেছেন, তাদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং ফলোআপ চিকিৎসা দিচ্ছে,’ যোগ করেন তিনি।

এসময় তিনি সিঙ্গাপুর, ভারত, চীন ও যুক্তরাজ্যসহ যেসব বিদেশি চিকিৎসক আহতদের চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের প্রতিও ধন্যবাদ জানান।

 

দুই যমজ শিশুর বাবা-মা ইয়াসিন মজুমদার ও আকলিমা আক্তার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

গত ২১ জুলাই দুপুরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি দোতলা ভবনে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় মোট ৩৬ জন নিহত এবং ১২৪ জন আহত হন। তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে যুদ্ধবিমানের পাইলটের উড্ডয়ন-ত্রুটি চিহ্নিত করেছে।

মন্তব্য করুন

১১-২০ গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেলের দাবি: সর্বনিম্ন বেতন ৩২,০০০, সর্বোচ্চ ১,২৮,০০০ টাকা

সরকারি ১১-২০ গ্রেডের চাকরিজীবীরা অবিলম্বে ন্যায্য ও বৈষম্যহীন নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা ১৩ গ্রেডের নতুন বেতন কাঠামো প্রস্তাব করেছেন, যেখানে সর্বনিম্ন বেতন ৩২,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১,২৮,০০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।

আজ শুক্রবার (১০ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ১১-২০ গ্রেড সরকারি চাকরিজীবী ফোরামের সদস্যরা এই দাবি পেশ করেন।

 

মূল দাবি ও প্রস্তাবিত ভাতা

সংগঠনটি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে:

  • বাড়িভাড়া ভাতা:

    • ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায়: মূল বেতনের ৮০%

    • অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এলাকায়: ৭০%

    • অন্যান্য এলাকায়: ৬০%

  • চিকিৎসা ভাতা: ৬,০০০ টাকা

  • শিক্ষা ভাতা (সন্তান প্রতি): ৩,০০০ টাকা

  • যাতায়াত ভাতা:

    • ঢাকা: ৩,০০০ টাকা

    • অন্যান্য এলাকা: ২,০০০ টাকা

  • ইউটিলিটি ভাতা: ২,০০০ টাকা

  • টিফিন ভাতা: দৈনিক ১০০ টাকা (মাসিক ২,২০০ টাকা)

  • বৈশাখী ভাতা: ৫০%

  • ঝুঁকি ভাতা: ২,০০০ টাকা

  • পাহাড়ি ও উপকূলীয় অঞ্চলের কর্মচারীদের জন্য অতিরিক্ত ভাতা: ৪০%

পেনশন ও অন্যান্য দাবি

ফোরাম পেনশন সুবিধা বিদ্যমান ৯০% থেকে বাড়িয়ে ১০০% করার এবং আনুতোষিকের হার প্রতি ১ টাকায় ২৩০ টাকার পরিবর্তে ৫০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে।

সাধারণ সম্পাদক মো. মাহমুদুল হাসান তাঁর লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালের পে স্কেলে ব্যাপক বৈষম্য ছিল এবং গত ১০ বছরে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীরা দুটি পে স্কেল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাই বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই নতুন, বৈষম্যমুক্ত ও বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা জরুরি।


আল্টিমেটাম

সংগঠনটির সভাপতি মো. লুৎফর রহমান ঘোষণা দেন, আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই বৈষম্যমুক্ত নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় কর্মচারীরা আবার রাস্তায় নামতে বাধ্য হবেন। তাঁরা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কর্তৃক নবম পে কমিশন গঠনে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে কমিশন একটি ন্যায্য বেতন কাঠামো প্রস্তাব করবে।

মন্তব্য করুন

মাধ্যমিকের বইয়ে যুক্ত ‘রাতের ভোট’; সাহিত্য-কণিকা থেকে বাদ ৭ মার্চ

রাতের ভোট
রাতের ভোট

২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বড় পরিবর্তন আনছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। আলোচিত ‘রাতের ভোট’ প্রসঙ্গটি এবার যুক্ত হচ্ছে নবম–দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে। ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান’ নামে নতুন সংযোজিত অংশে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট পূরণ এবং ২০২৪ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দল ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার নীলনকশা করেছিল; যা জনগণ প্রত্যাখ্যান করে।

অন্যদিকে অষ্টম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য কণিকা বই থেকে বাদ যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ। ২০২১ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে এই ভাষণ পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হয়; অষ্টম শ্রেণির বইয়ে এটি ছিল ছয় পৃষ্ঠা জুড়ে।

পাঠ্যবইয়ের নতুন ভাষ্যে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছে—দমনমূলক শাসন যত শক্তিশালী হোক, ন্যায়ের দাবিতে গড়ে ওঠা জনপ্রতিরোধের কাছে পরাজয় অনিবার্য।

২০২৬ সালের বইয়ে পতিত সরকারের অনিয়ম–দুর্নীতির বিবরণও যুক্ত হচ্ছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে—শেখ হাসিনার ‘ফ্যাসিবাদী শাসন’ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের কমিশনের তথ্যমতে, গত ১৬ বছরে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ বিদেশে পাচার হয়েছে। এতে দেশে একটি ‘চোরতন্ত্র’ গড়ে ওঠে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।

বইয়ের নতুন অংশে ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর ফলে বাকশাল গঠনের কথা, জিয়াউর রহমানের অধীনে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরাবির্ভাব, এরশাদের ক্ষমতা দখল ও পরবর্তী গণআন্দোলনও বর্ণনা করা হয়েছে। নুর হোসেন, জেহাদ, ডা. মিলনসহ আন্দোলনে নিহতদের প্রসঙ্গ এবং ১৯৯০ সালে এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনও এতে রয়েছে।

আরেক অংশে বলা হয়েছে—২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন। বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন, প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ এবং ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল—এসবই নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেয়।

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে বইতে লেখা হয়েছে—সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুনে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করে। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলার পর উত্তেজনা বাড়ে। পরদিন রংপুরে আবু সাঈদ, চট্টগ্রামে ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল শান্তসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে নিহত হলে আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অতিরিক্ত বল প্রয়োগে শত শত মানুষ নিহত হয়। দমননীতি বাড়তে থাকলে জনসম্পৃক্ততাও বাড়ে। এর ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা দেশত্যাগ করেন—এ তথ্যও বইতে স্থান পেয়েছে।

বইয়ে আন্দোলনের দুই বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—
১) নারীদের নজিরবিহীন অংশগ্রহণ,
২) সারাদেশে দেয়ালে–দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি; যেখানে অধিকার, ইনসাফ, ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে মানবিকতা ও জাতীয় ঐক্যের বার্তা উঠে এসেছে।

এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে আসার পর ২০২৫ সালের মতো ২০২৬ সালের বইয়েও ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সব শ্রেণির বইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আলাদা অধ্যায় থাকছে। মাধ্যমিক স্তরের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং পৌরনীতি ও সুশাসন বইয়ে এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সংযোজন করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

শেখ হাসিনা–আসাদুজ্জামান: মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রধান ভিত্তিগুলো

শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামাল
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামাল

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে প্রথমবারের মতো রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অভিযান পরিচালনার নির্দেশ ও নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় বিভিন্ন ঘটনায় সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে নিহত ও আহত আন্দোলনকারীদের ক্ষতিপূরণের নির্দেশসহ রাষ্ট্রের অনুকূলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বছরের ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার সঙ্গে শেখ ফজলে নূর তাপসের এবং পরে হাসানুল হক ইনুর কথোপকথনে উঠে আসে যে, আন্দোলনরত ছাত্র–জনতার অবস্থান শনাক্ত করার জন্য তিনি ড্রোন ব্যবহারের নির্দেশ দেন এবং আন্দোলনকারীদের দমন করতে হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যার আদেশ প্রদান করেন। তাঁর এই নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অধীনস্থরা কোনো প্রকার বাধা দেয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জন আন্দোলনকারীকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। একই দিনে আশুলিয়ায়ও ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যা করে তাঁদের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়।

এই তিনটি ঘটনা—যা জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত—মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, এবং এই অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ সোমবার এ রায় প্রদান করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এটাই প্রথম কোনো মামলার রায়। একই মামলার আরেক আসামি, সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায়ে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বাংলাদেশে অবস্থিত সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আহতদের ক্ষেত্রেও তাঁদের আঘাতের মাত্রা ও ক্ষতির ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সরকারকে বলা হয়েছে।

মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠন করা হয়, যার প্রত্যেকটিতে একাধিক ঘটনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। সার্বিকভাবে এই পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে ছিল—উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান; আন্দোলনকারীদের নির্মূল করতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ; রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা; রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যা; এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে ফেলা।

মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান; একই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মাকসুদ কামালের সঙ্গে কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ আখ্যা দিয়ে তাঁদের ফাঁসি দেওয়ার হুমকি প্রদান; এবং উসকানি ও আদেশ দেওয়ার পর অধীনস্থদের মাধ্যমে এসব অপরাধ সংঘটন রোধে কোনো উদ্যোগ না নেওয়া, যার ফলশ্রুতিতে রংপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

যে অভিযোগে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড

প্রথম অভিযোগের অধীনে থাকা তিনটি ঘটনায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত বলেন—প্রথমটি উসকানি, দ্বিতীয়টি হত্যার নির্দেশ এবং তৃতীয়টি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে নিষ্ক্রিয়তা এবং দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে শান্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিধান অনুযায়ী এগুলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই তিন ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁকে স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

রায়ের ভাষ্যে বলা হয়, একাধিক ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে যে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের হত্যার উদ্দেশ্যে ড্রোন, হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। চারখাঁরপুলের ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যার ঘটনা তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়নের ফল বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়। একইভাবে আশুলিয়ায় ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যা করে তাঁদের লাশ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাও তাঁর একই ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ। এই তিনটি ঘটনায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার সময় আদালতকক্ষে উপস্থিত অনেকেই হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তখন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সবাইকে আদালতের শৃঙ্খলা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, তাঁদের উচ্ছ্বাস আদালতের বাইরে প্রকাশ করলে তা আরও শোভনীয় হবে।

যে অভিযোগে আসাদুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড

রায়ে বলা হয়, আসাদুজ্জামান খান কামাল মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করেছেন এবং নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে কিংবা প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছেন। চানখাঁরপুলে ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যার ঘটনায় তাঁর দায় প্রমাণিত হয়েছে। একইভাবে আশুলিয়ার ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যার ক্ষেত্রেও তাঁর সহযোগিতা ও ব্যর্থতা উল্লেখ করা হয়। এই দুই ঘটনার মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড

রায়ে বলা হয়, মামলার আরেক আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন তদন্তের সময় সত্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ৩৬ দিনের আন্দোলনের প্রায় সব ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং বস্তুগত প্রমাণ উপস্থাপনে সহায়তা করেন। তাঁর স্বীকারোক্তি ও সহযোগিতা বিবেচনায় তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি না দিয়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম বলেন, তিন আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হলেও এগুলো ছয়টি কাউন্টে ভাগ করা হয়েছিল এবং দুটি অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি প্রযোজ্য হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড এবং আমৃত্যু কারাদণ্ড দুই ধরনের সাজা দেওয়া সম্ভব ছিল। অপরাধের নৃশংসতা, গুরুত্ব ও গভীরতা বিবেচনায় তিনটি কাউন্টে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি তিনটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। অন্যদিকে দুটি অভিযোগে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি রাজসাক্ষী হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড যোগ্য অপরাধ করলেও তাঁর ক্ষমা প্রার্থনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য আদালতকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে—এসব বিবেচনায় তাঁর সাজায় নমনীয়তা দেখানো হয়েছে।

মন্তব্য করুন

১৫ জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ, বিভিন্ন জেলা এবং নতুন ডিসি পদায়ন

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৫টি জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ দিয়েছে। নতুন পদায়ন অনুযায়ী, কিছু জেলার ডিসির দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং নতুন কিছু কর্মকর্তাকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বদলিকৃত ডিসিদের মধ্যে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ কামরুল হাসানকে নোয়াখালী, কুষ্টিয়ার ডিসি আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীনকে হবিগঞ্জ, ভোলার ডিসি মো. আজাদ জাহানকে গাজীপুর, বরগুনার ডিসি মোহাম্মদ শফিউল আলমকে ঢাকা, সিরাজগঞ্জের ডিসি মুহাম্মদ নজরুল ইসলামকে গাইবান্ধা এবং খুলনার ডিসি মো. তৌফিকুর রহমানকে বগুড়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, সিলেট জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার সিংহকে বরগুনা, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের সচিব (উপসচিব) মো. আমিনুল ইসলামকে সিরাজগঞ্জ, বাণিজ্য উপদেষ্টার একান্ত সচিব মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদকে মাগুরা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আবু সাঈদকে পিরোজপুর, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের পাবনার জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা মিজ আফরোজা আখতারকে সাতক্ষীরা, স্থানীয় সরকার ফেনীর উপপরিচালক (উপসচিব) গোলাম মো. বাতেনকে বাগেরহাট, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর (ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়) একান্ত সচিব স. ম. জামশেদ খোন্দকারকে খুলনা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিচালক মো. ইকবাল হোসেনকে কুষ্টিয়া এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব ডা. শামীম রহমানকে ভোলার ডিসি পদে পদায়ন করা হয়েছে।

নতুন এই ডিসি পদায়নগুলো জেলা প্রশাসনের কার্যক্রমের উন্নতি এবং সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ডিসিদের পুরো তালিকা দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন 

মন্তব্য করুন

নাশকতা বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি এড়াতে

ছুটি বাতিল মেট্রোরেলের সব কর্মকর্তা–কর্মচারীর

মেট্রোরেল
মেট্রোরেল

ঢাকা মেট্রোরেলের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ছুটি বাতিল করেছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। রোববার প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (প্রশাসন) এ কে এম খায়রুল আলমের স্বাক্ষরে এ বিষয়ে অফিস আদেশ জারি করা হয়।

আদেশে বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ডিএমটিসিএলের ভবন, ডিপো, স্টেশন এবং প্রকল্প এলাকায় কর্মরত সবার ছুটি বাতিল থাকবে। যদিও এতে কারণ উল্লেখ করা হয়নি, তবে সূত্র জানিয়েছে—রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আগামী ১৩ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারিত আছে। এ নিয়ে অনলাইনে ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচির আহ্বান জানানো হয়েছে।

নাশকতা বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরামর্শে ডিএমটিসিএল সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ছুটি বাতিল ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।

মন্তব্য করুন
×