মানারাতে সিরাতুন্নবী (সা.) কর্মসূচির সমাপনী, শিক্ষার্থীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী সিরাতুন্নবী (সা.) কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাপনী দিনে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) প্রতিষ্ঠানের ফুয়াদ আল-খতীব অডিটোরিয়ামে বালক ও বালিকাদের জন্য পৃথক আয়োজনে এসব অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, হামদ-নাত, ইসলামী সংগীত, কোরাস, কবিতা আবৃত্তি ও শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে মুখর ছিল পুরো আয়োজন।
সকাল সাড়ে ৮টায় বালিকা শাখার অনুষ্ঠানের সূচনা হয় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লেখক, বক্তা ও শিক্ষাবিদ ড. নাসিমা হাসান। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠানের ভাইস প্রিন্সিপাল (মর্নিং শিফট) প্রফেসর তাহমিনা ইয়াসমিন।
বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হয় বালক শাখার অনুষ্ঠান। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও অর্থবহ ব্যাখ্যার পর শিক্ষার্থীরা হামদ, নাত, ইসলামী সংগীত ও কোরাস পরিবেশন করে।
আলোচনা সভায় মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন অতিথিরা। মানারাত ট্রাস্টের সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ মহানবী (সা.)-এর প্রতিষ্ঠিত ন্যায়ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা ও ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসৃত অর্থব্যবস্থায় সম্পদের সুষম বণ্টন, সামাজিক নিরাপত্তা, উত্তরাধিকার আইন ও সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা রয়েছে। ইসলামী অর্থনীতি মানুষের স্বাভাবিক জীবন, সামাজিক কল্যাণ ও উৎপাদনশীলতার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে বৈষম্য কমাতে এবং সম্পদের সুষ্ঠু প্রবাহ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তারবিয়্যাহ ইডুকেশন নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোখতার আহমদ বলেন, রাসুল (সা.)-এর জীবন মানবতার জন্য এক অনন্য আদর্শ। তার চরিত্র, নৈতিকতা, দয়া, ক্ষমাশীলতা, সত্যবাদিতা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা সবার জন্য অনুসরণীয়। শুধু মুখে রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার কথা না বলে তার সুন্নাহ ও আদর্শ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক সচিব ও মানারাত ট্রাস্টের চেয়ারম্যান মো. মোহাম্মদ ফজলুর রহমান বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক ও সুন্দর আচরণ করতেন। তার জীবনী শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের জন্যও এটি পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা।
তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর কথা, কাজ ও চরিত্র সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করে সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রত্যেকের দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস. এম. মাহবুব-উল-আলম, ওএসজি, এসজিপি, এসডিসি, পিএসসি (অবসরপ্রাপ্ত)। তিনি বলেন, রাসুল (সা.)-এর জীবন শুধু ধর্মীয় ইতিহাসের বিষয় নয়; একজন আদর্শ মানুষ, নেতা ও সমাজসংস্কারক হিসেবেও তার জীবন অনুসরণীয়।
মক্কা বিজয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও প্রতিকূলতার পরও মক্কা বিজয়ের সময় রাসুল (সা.) প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। একই সঙ্গে একজন সামরিক নেতা হিসেবে তার কৌশল ও নেতৃত্বের দৃষ্টান্তও ইতিহাসে বিরল। তিনি বলেন, শিক্ষিত ও নৈতিক প্রজন্মই একটি দেশ ও জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। রাসুল (সা.)-এর আদর্শ নিজেদের জীবনে ধারণ করে তা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও মানারাত ট্রাস্টের একাডেমিক কমিটির কনভেনার প্রফেসর ড. মো. মোজাম্মেল হক এবং মানারাত ট্রাস্টের সদস্য ও কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. এম. উমর আলী।
সিরাতুন্নবী (সা.) কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশে কোরআন তেলাওয়াত, আজান, সিরাতভিত্তিক আবৃত্তি, রচনা ও ইসলামী সংগীতসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানে এসব প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার ও সম্মাননা তুলে দেন অতিথিরা। পুরস্কার গ্রহণের সময় শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাসে অডিটোরিয়ামে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন দিনব্যাপী সিরাতুন্নবী (সা.) কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।