শহীদ জেহাদ দিবস আজ, তাঁর আত্মত্যাগে গতি পায় এরশাদবিরোধী আন্দোলন
আজ ১০ অক্টোবর, শহীদ জেহাদ দিবস। ১৯৯০ সালের এই দিনে রাজধানীর পল্টনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তৎকালীন ছাত্রদল নেতা নাজির উদ্দিন আহমেদ জেহাদ। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তৎকালীন সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন নতুন গতি পায়। জেহাদের আত্মত্যাগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়। সেই ঐক্য ও ধারাবাহিক গণআন্দোলনের পথ ধরেই ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পতন ঘটে এরশাদ সরকারের।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার সন্তান নাজির উদ্দিন আহমেদ জেহাদ ছিলেন সরকারি আকবর আলী কলেজ শাখা ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি। ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর এরশাদ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোটের কর্মসূচিতে অংশ নিতে সহকর্মীদের নিয়ে ঢাকায় আসেন তিনি।
সেদিন সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি ও বিরোধী দলের সমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পল্টন এলাকায় পুলিশের লাঠিপেটা ও গুলিতে জেহাদ গুরুতর আহত হন। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ছাত্রসমাজসহ আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে।
অপরাজেয় বাংলায় সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য
জেহাদের মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিয়ে আসার পর অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমবেত হন বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা। সেখানে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করতে গড়ে ওঠে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতারাও এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ডাকসুর তৎকালীন সহসভাপতি আমানউল্লাহ আমানের নেতৃত্বে ছাত্রনেতারা স্বৈরাচারী শাসনের অবসান না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার শপথ নেন। এ সময় ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিবসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র মৈত্রী, বাকশাল ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের নেতারাও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে যুক্ত হন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এরশাদের শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে ছাত্রসংগঠনগুলোর এই ঐক্য আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে।
পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। মিছিল, সমাবেশ, ধর্মঘট ও বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ছাত্রসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ছাত্র আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক আইন জারির মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরপর থেকেই তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসংগঠন, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালের ছাত্র আন্দোলন এবং ১৯৮৭ সালে নূর হোসেনের আত্মত্যাগ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে আছে।
১৯৯০ সালে এসে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোট এবং বামপন্থী দলগুলোর পাঁচদলীয় জোট এরশাদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যায়। পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান থাকলেও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাদের দাবির মধ্যে সমন্বয় তৈরি হয়।
১০ অক্টোবর জেহাদের মৃত্যুর পর সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের তৎপরতা এই আন্দোলনকে আরও সংগঠিত করে। ছাত্রসমাজের পাশাপাশি শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। ক্রমেই তা দেশব্যাপী গণপ্রতিরোধে রূপ নেয়।
ডা. মিলনের মৃত্যু ও এরশাদের পতন
১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গুলিতে নিহত হন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের নেতা ডা. শামসুল আলম খান মিলন। তাঁর মৃত্যুর পর এরশাদবিরোধী আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন অব্যাহত থাকে।
এর আগে ১৯ নভেম্বর তিনটি রাজনৈতিক জোট গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি যৌথ রূপরেখা ঘোষণা করে। এতে এরশাদের পদত্যাগ, নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
অবশেষে গণআন্দোলনের মুখে ৪ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়ার ঘোষণা দেন। ৬ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন। পরে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রায় নয় বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
গণতন্ত্রের ইতিহাসে জেহাদের আত্মত্যাগ
শহীদ জেহাদ দিবস বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। তাঁর মৃত্যু ছাত্রসংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় তা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
জেহাদের আত্মত্যাগ, সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ভূমিকা, রাজনৈতিক জোটগুলোর আন্দোলন এবং ডা. মিলনের মৃত্যুর পর গণপ্রতিরোধের বিস্তার—সব মিলিয়ে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়।
প্রতিবছর ১০ অক্টোবর শহীদ জেহাদ দিবসে তাঁর আত্মত্যাগ স্মরণ করা হয়। দিনটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা, রাজনৈতিক ঐক্য এবং জনগণের অংশগ্রহণের ইতিহাসও স্মরণ করিয়ে দেয়।