নাহীদ হুসাইন
প্রকাশ : আগস্ট ২৬, ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ

প্রাথমিকের ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির পথ খুলেছে, তিন মাসে প্রক্রিয়া এগোনোর লক্ষ্য

দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার অবসান হওয়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩২ হাজারের বেশি শূন্য প্রধান শিক্ষক পদ পূরণের পথ খুলেছে। এসব পদে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি দিতে মাঠপর্যায়ে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে গ্রেডেশন তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

গ্রেডেশন তালিকা তৈরির পর তা প্রকাশ করে আপত্তি ও অভিযোগ জানানোর সুযোগ দেওয়া হবে। অভিযোগ থাকলে তা যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তি শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হবে। এরপর অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তালিকা সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) পাঠানো হবে। পিএসসির অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি অ্যান্ড অপারেশন বিভাগের পরিচালক মীর আব্দুল আউয়াল আল মেহেদী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে মামলা চলছিল। সেই আইনি জটিলতা এখন নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে পদোন্নতির জন্য গ্রেডেশন তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

তিনি বলেন, গ্রেডেশন তালিকা অনলাইনে উন্মুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন ইউনিটে তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। তালিকা তৈরির পর নোটিশ দিয়ে ৩০ কর্মদিবস সময় দেওয়া হবে। এ সময়ের মধ্যে কোনো আপত্তি বা অভিযোগ না এলে সংশ্লিষ্ট তালিকা অধিদপ্তরে পাঠানো হবে। পরে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা পিএসসিতে পাঠানো হবে।

তিন মাসে প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য

প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় তিন মাস সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তবে এই সময়ের মধ্যে পদোন্নতি কার্যকর হবে—এমন নিশ্চয়তা এখনই দেওয়া সম্ভব নয়।

মীর আব্দুল আউয়াল আল মেহেদী বলেন, সব জেলা থেকে গ্রেডেশন তালিকা আসতে হবে। সব তালিকা হাতে পাওয়ার পরই পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে। প্রায় তিন মাসের মধ্যে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। তবে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

৮০ শতাংশ পদে হবে পদোন্নতি

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ পূরণে পদোন্নতিকে বড় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ২০২৫ সালের সংশোধিত নিয়োগবিধিতে। বিধি অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদের ৮০ শতাংশ পদ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং বাকি ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হবে।

পদোন্নতির জন্য সহকারী শিক্ষক পদে অন্তত ১২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতাসহ নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। ফলে বর্তমানে শূন্য থাকা ৩২ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষক পদের বড় অংশই কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হবে।

সরকারের পক্ষ থেকেও দ্রুত পদক্ষেপ

প্রধান শিক্ষক সংকট নিরসনে সরকার দ্রুত কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিপুলসংখ্যক প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এ-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে এবং শিগগিরই পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া হবে।

এ ছাড়া চট্টগ্রামের প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের এক কর্মশালায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা কাটিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩২ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির পর সহকারী শিক্ষকের যেসব পদ শূন্য হবে, সেসব পদেও নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

যে আইনি জটিলতায় আটকে ছিল পদোন্নতি

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন ধরেই শূন্য রয়েছে। তবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরির জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়ে মামলা।

২০১৩ সালে দেশের বিপুলসংখ্যক বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সরকারি চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর তাদের আগের চাকরিকাল, জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি কীভাবে নির্ধারিত হবে—তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এ-সংক্রান্ত বিধিমালার জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির বিধান চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করা হয়।

এর ফলে কারা জ্যেষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং সেই জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে কারা প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। আটকে যায় বড় পরিসরে পদোন্নতির কার্যক্রম।

দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর গত ২ জুলাই আপিল বিভাগ জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিধানের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করেন। এর ফলে হাইকোর্টের রায়ের কারণে তৈরি হওয়া জটিলতার অবসান হয় এবং প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির পথ খুলে যায়।

এখন জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে গ্রেডেশন তালিকা তৈরির মাধ্যমে সেই পদোন্নতি কার্যক্রমই এগিয়ে নিচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

মন্তব্য করুন
×