চূড়ান্ত সুপারিশের পরও নিয়োগপত্র নেই, অনিশ্চয়তায় শত শত প্রার্থী
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলার শত শত প্রার্থী। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া, যাচাই-বাছাই ও অন্যান্য ধাপ শেষ হওয়ার পরও নিয়োগপত্র হাতে না পাওয়ায় হতাশ তারা। কেন চূড়ান্ত তালিকায় নাম থাকার পরও নিয়োগপত্র দেওয়া হচ্ছে না—এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাতে প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের অন্তত ৬৪ জেলার সহস্রাধিক প্রার্থী এখনো নিয়োগপত্র পাননি। তবে সব জেলার তথ্য পাওয়া না যাওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে দাবি করছেন তারা।
প্রার্থীদের ভাষ্য, তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা অপরাধের অভিযোগ নেই। অনেকেই ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এবং পরিবারের সদস্যদেরও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সনদ যাচাইয়ের পরই তাদের চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল। এরপরও নিয়োগপত্র না পাওয়ার কারণ জানতে পারছেন না তারা।
‘সরকারি চাকরির বয়স শেষ, এখন কী করব’
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার প্রার্থী কামরুন নাহার দুই সন্তান ও সংসার সামলে দীর্ঘদিন সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ১৪ হাজারের বেশি চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীর তালিকায় তার নাম আসে। কিন্তু নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলেও তিনি তা পাননি।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, ‘আমার কাগজপত্রে কোনো সমস্যা ছিল না। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও আমার পরিবারের কারও সম্পৃক্ততা নেই। ফলাফলও খারাপ ছিল না। তাহলে কেন নিয়োগপত্র পেলাম না?’
তিনি বলেন, ‘আমার সরকারি চাকরির বয়স শেষ। যেদিন আমার চাকরি হয়, তখন আমার বয়স ৩১ বছর ৯ মাস। এনটিআরসিএর সপ্তম শিক্ষক নিয়োগের গণবিজ্ঞপ্তিতেও আমার চাকরি হয়েছিল। কিন্তু এখানে চাকরি হবে ভেবে সেখানে যোগ দিইনি। এখন আমাকে নেওয়া হলো না—আমি কী করব?’
কাগজপত্র যাচাইয়ের বিষয়েও তিনি বলেন, ‘ডিইপি অফিসের কর্মকর্তারা আমার আবেদনপত্র ও অন্যান্য ডকুমেন্ট একাধিকবার নিয়েছেন। কোনো কাগজে ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে তা সংশোধন করে আবার জমা দিতে হয়েছে। ভুল কাগজপত্র থাকার কোনো সুযোগ ছিল না।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘আট মাস ধরে সবাই জানে আমার সরকারি চাকরি হয়েছে। এখন নিয়োগপত্র পাইনি—এ কথা কীভাবে মানুষকে বলব? আমার পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে গেছে।’
নিয়োগের বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে অধিদপ্তর থেকে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেভাবেই তারা কাজ করছেন বলে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
‘কেন বাদ পড়েছি, কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না’
পাবনার চাটমোহর উপজেলার প্রার্থী মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার এমন কোনো কারণ নেই যে আমি নিয়োগপত্র পাব না। কেন পাইনি, এর কোনো কারণই খুঁজে বের করতে পারিনি। আমি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। আমার পরিবারেরও কেউ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা খুবই নিরীহ কৃষক পরিবারের সন্তান। আমার ভাইয়েরাও স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। আমাদের কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই। কখনো আমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডিও হয়নি।’
পাবনার আরেক প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ডোপ টেস্টসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ঠিক ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
নিয়োগপত্র না পাওয়ার কারণ জানতে তিনি পুলিশ ভেরিফিকেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিএসবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার দাবি, ডিএসবি কর্মকর্তারা তাকে জানিয়েছেন, তার রিপোর্ট ‘সম্পূর্ণ পজিটিভ’ এবং পাবনা জেলায় কোনো প্রার্থীকে নেতিবাচক রিপোর্ট দেওয়া হয়নি।
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও তুলছেন কেউ কেউ
ফরিদপুরের এক প্রার্থী মনে করছেন, স্থানীয় বিরোধের কারণে তার নিয়োগ আটকে যেতে পারে। তিনি জানান, পারিবারিক জমিজমা নিয়ে স্থানীয় কিছু ব্যক্তির সঙ্গে বিরোধ রয়েছে। ডিএসবি ভেরিফিকেশনে তার কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি এবং তাকে ফোন করে ইতিবাচক রিপোর্টের কথাও জানানো হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘আমি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। হলে থেকেও পড়াশোনা করেছি। সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়াই ছিল মূল চিন্তা। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছিলাম আমার নিয়োগপত্র আসবে। কিন্তু আসেনি।’
অন্যদিকে কক্সবাজারের প্রার্থী রিদোয়ানুল হক জানান, তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত নন। তবে তার বাবা স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বর্তমান কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন। নিজের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
‘আমার বাবা-চাচাদের কেউ রাজনীতিতে নেই’
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার প্রার্থী আইনুল ইসলাম জানান, কেন তাকে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো কারণ জানতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘আমি বা আমার বাবা-চাচাদের কেউ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। আমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডিও নেই।’
তার ভাষ্য, জেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়োগপত্রের তালিকা মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়েছে। ভেরিফিকেশনের কারণে যাদের নাম তালিকায় আসেনি, তাদের নিয়োগপত্র তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
কুমিল্লার প্রার্থী ফারুকও চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর নিয়োগপত্র পাননি। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষার রিপোর্ট ইতিবাচক এসেছে।
‘আমি কোনো রাষ্ট্রবিরোধী বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নই। সব পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ। তারপরও কেন নিয়োগপত্র পেলাম না, বুঝতে পারছি না,’ বলেন তিনি।
পাবনার আরেক প্রার্থী মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, ‘ছাত্রজীবনে আমি বা আমার পরিবারের কেউ রাজনীতিতে ছিল না। কোনো পুলিশি ঝামেলাও নেই।’
নিজের শিক্ষাজীবনের ফলাফল তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই ভালো ছাত্র। প্রাথমিকে বৃত্তি পেয়েছি, এসএসসি ও এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছি। অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস। এরপরও আমার সঙ্গে এমনটা হচ্ছে।’
১ অক্টোবর যোগদানের কথা, অনেকের হাতে নেই নিয়োগপত্র
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ১৪ হাজারের বেশি চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীর অনুকূলে গত বৃহস্পতিবার নিয়োগপত্র জারি করা হয়। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় থেকে সরাসরি অথবা ডাকযোগে প্রার্থীদের কাছে নিয়োগপত্র পৌঁছানোর কথা।
নিয়োগপত্র পাওয়া প্রার্থীদের আগামী ১ অক্টোবর নিজ নিজ জেলা শিক্ষা কার্যালয়ে যোগদান এবং ৪ অক্টোবর থেকে পদায়ন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের একটি অংশ এখনো নিয়োগপত্র না পাওয়ায় তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি—দাবি
এদিকে ‘চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক-২০২৫’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ভেরিফিকেশন শেষে প্রায় ১২০০ প্রার্থীর নিয়োগপত্র ইস্যু হয়নি।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে প্ল্যাটফর্মটি দাবি করে, প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই বা ভেরিফিকেশনের কথা বলে সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই অনেক যোগ্য প্রার্থীকে চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে আন্দোলনকারীদের আরেক প্রতিনিধি মো. লোকমানের দাবি, সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্রার্থীর নিয়োগপত্র ইস্যু হয়নি। সব জেলার তথ্য পাওয়া গেলে এ সংখ্যা আড়াই থেকে তিন হাজারে পৌঁছাতে পারে বলেও তিনি ধারণা করছেন।
তিনি জানান, আগামী সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সুপারিশবঞ্চিত প্রার্থীরা জড়ো হবেন। এরপর সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
সরকারের কাছে পাঁচ দাবি
নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীদের প্ল্যাটফর্ম থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-
ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীর নথি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনরায় যাচাই;
-
তথ্যগত ভুল বা অসঙ্গতির ক্ষেত্রে আত্মপক্ষ সমর্থন ও প্রশাসনিক আপিলের সুযোগ;
-
প্রশাসনিক ভুল বা কর্মকর্তার গাফিলতির কারণে কেউ বাদ পড়ে থাকলে তা সংশোধন করে নিয়োগ নিশ্চিত করা;
-
চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত অথচ নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে দ্রুত ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া;
-
পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কী কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং কী প্রক্রিয়ায় সুপারিশপ্রাপ্তদের বাদ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রকাশ করা।
চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় এখন দ্রুত বিষয়টির স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছেন এসব প্রার্থী।