‘মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম’ স্থাপন প্রকল্পের শুরুতেই দুর্নীতি

রাকিব উদ্দিন

এডুকেশন বাংলা

প্রকাশিত : ০২:৫৫ এএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ রবিবার

সাড়ে তিন হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ‘মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম’ স্থাপন প্রকল্পের শুরুতেই দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। উন্মুক্ত দরপত্রে কেনাকাটার চিন্তা বাদ দিয়ে ডিপিএম (ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড) পছন্দের প্রতিষ্ঠান থেকে ‘কমিশন’র ভিত্তিতে প্রজেক্টর, ল্যাপটপ, সাউন্ডবক্স ও মডেম- ইত্যাদি শিক্ষা উপকরণ কেনার তৎপরতা চালাচ্ছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা।

এমনকি পছন্দের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১৩শ’ কোটি টাকার কেনাকাটা করতে খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘তদবির’ রয়েছে বলেও ঠিকাদারদের শাসাচ্ছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। আবার ডিপিএম’র বিরোধিতা না করতে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তাকে সতর্ক করেছেন একাধিক ঠিকাদার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি ‘স্মার্ট টেকনোলজি’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে একটি বিশেষ সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা। ‘থেসিস’ নামের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে তদবির রয়েছে একজন প্রতিমন্ত্রীর। ‘ইউনিক’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে তদবির করছেন যুবলীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা। এছাড়াও ‘ওরিয়েন্টাল’, ‘গ্লোবাল’, ‘ডকইয়ার্ড’সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রভাবশালী মহলের তদবির রয়েছে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সারাদেশের তিন হাজার ৩৪০টি হাইস্কুলে একটি করে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করতে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর নাম ‘আইসিটি’র মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন (২য় পর্যায়)’ প্রকল্প।

তিন হাজার ৩৪০টি স্কুলের পাশাপাশি এই প্রকল্পের অধীনে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা প্রায় পাঁচ হাজার বেসরকারি হাইস্কুলেও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে; সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব উদ্যোগে সোলার সিস্টেম (সৌর বিদ্যুৎ) স্থাপন করতে হবে। এছাড়াও কোন প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ যদি নিজস্ব উদ্যোগে একটি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠা করে সে ক্ষেত্রে প্রকল্পের অর্থায়নে ওই প্রতিষ্ঠানে ‘বোনাস’ হিসেবে আরেকটি মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম স্থাপন করে দেবে সরকার।

‘আইসিটি’র মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন’ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের মোট ব্যয় হচ্ছে এক হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা। গড়ে একটি স্কুলে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণীকক্ষ স্থাপনে সরকারের ব্যয় হচ্ছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন নাগাদ।

কেনাকাটায় সিন্ডিকেট

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথমে ডিপিএম (ডিরেক্ট প্রক্রিউরমেন্ট মেথড) অর্থাৎ উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান ছাড়া সরাসরি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা উপকরণ কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল পছন্দের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া। এতে সায় দেয়নি এই ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি অংশ। এখন বাধ্য হয়ে ‘ই-জিপি’ (ইলেক্ট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) অর্থাৎ অনলাইনে দরপত্র আহ্বান করে শিক্ষা উপকরণ কেনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সে ক্ষেত্রেও ১০ শতাংশ অনৈতিক ‘কমিশন’র সুযোগ ছাড়তে নারাজ প্রকল্প কর্মকর্তারা। পছন্দের ঠিকাদারদের কীভাবে কাজ দেয়া যায় সেই তৎপরতা চলছে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, প্রকল্প কর্মকর্তাদের বিশেষ পছন্দের পাঁচটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ওই কাজ ভাগ করে দেয়ার চেষ্টা চলছে। ঠিকাদারদের বলা হয়েছে, একেক প্রতিষ্ঠানকে একটি করে উপকরণ সরবরাহের দরপত্র আহ্বান করতে। আর প্রজেক্টর ও ল্যাপটপ সরবরাহের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হচ্ছে দুটি প্রতিষ্ঠানকে। এই অনৈতিক প্রক্রিয়া তৎপরতায় পছন্দের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানই কাজ পাবে, যাদের সবকটির পক্ষ থেকেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে তদবির করা হচ্ছে।

উন্মুক্ত দরপত্রের চিন্তা বাদ দিয়ে ডিপিএম’র মাধ্যমে কেনাকাটার ব্যাপারে জানতে চাইলে আইসিটি প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন সংবাদকে বলেন, ‘সরাসরি কেনাকাটা করলে সময়ক্ষেপণ হয় না। তাছাড়া ভালো পণ্যও পাওয়া যায়।’

১০ শতাংশ কমিশনের ভিত্তিতে কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার তৎপরতা চলছে কীনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কমিশনের প্রশ্নই আসে না। তবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার জন্য প্রভাবশালী মহলের তদবির রয়েছে। এজন্য আমাদের সিন্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা হচ্ছে। এখন ই-জিপি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সংবাদকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর একটি নির্দেশনা রয়েছে, কোন প্রকল্পে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হলে সে ক্ষেত্রে সরাসরি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কেনাকাটা করা যাবে। এই প্রকল্পে তো জটিলতা নেই; তাহলে সরাসরি কেনাকাটা কেন?’

 

শিক্ষক প্রশিক্ষণ

সারাদেশে মাধ্যমিক স্তরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষক আছেন। আইসিটি শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের লক্ষ্যে এই প্রকল্পের অধীনে মোট ৪৬ হাজার শিক্ষককে ১২ দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। তাদের প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য ৩৬০ জন মাস্টার ট্রেইনার (প্রশিক্ষক) তৈরি করা হচ্ছে।

পিডি মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘প্রথম পর্যায়ে প্রতিস্থলে একজন শিক্ষক মৌলিক প্রশিক্ষণ পাবেন। এরপর তারা নিজস্ব উদ্যোগে অন্য শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেবেন। আরও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হলে তারও ব্যবস্থা করা হবে।’

তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রকল্পের নিজস্ব কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। এখন মাঠ পর্যায়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সূত্র : দৈনিক সংবাদ