স্থবির হয়ে পড়ছে শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রকল্প বাস্তবায়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

এডুকেশন বাংলা

প্রকাশিত : ১১:১৬ এএম, ৫ অক্টোবর ২০১৮ শুক্রবার | আপডেট: ১১:১৭ এএম, ৫ অক্টোবর ২০১৮ শুক্রবার

দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় স্থবির হয়ে পড়ছে শিক্ষার মানোন্নয়নের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন। প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি তদারক করতেও উদাসীন মাউশি অধিদফতরের কর্মকর্তারা। ফলে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের কমপক্ষে ১০টিতেই এলোমেলো অবস্থা বিরাজ করছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে বর্তমানে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হারও সর্বনিম্ন। ক্রয় প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের দুর্নীতির কারণে গত অর্থবছরে একটি বড় প্রকল্পের প্রায় ১৬৩ কোটি টাকাই অব্যয়িত থেকে যায়। অন্য একটি প্রকল্পে তদন্ত কমিটি অর্থ ছাড়ে অনিয়মের প্রমাণ পেলেও রাঘব বোয়ালদের ছাড় দিয়ে প্রকল্পের মধ্যম পর্যায়ের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

কেনাকাটায় বিস্তর অনিয়ম ও অর্থ ব্যয়ের হিসাব না থাকায় দাতা সংস্থার অর্থায়নে একটি প্রকল্পের পিসিআর (প্রকল্পের সমাপ্তি প্রতিবেদন) সম্প্রতি ফেরত পাঠিয়েছিল পরিকল্পনা কমিশন। এছাড়াও একটি উপবৃত্তি প্রকল্পে শিক্ষার্থীদের অর্থ আত্মসাৎ এবং অন্য একাধিক প্রকল্পে শিক্ষক প্রশিক্ষণের নামে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বিদেশ প্রশিক্ষণে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বাস্তবায়নাধীন ১৫টির তদারকি করার দায়িত্ব মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি)। কিন্তু ‘যথাযথ সময়’ দিতে না পারায় সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রকল্পগুলোর তদারকির দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন। অনেকক্ষেত্রে তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ও অনুশাসন প্রতিপালন করছেন না। ক্ষেত্র বিশেষ প্রকল্প কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাউশির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্বও রয়েছে। এ কারণে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কার্যক্রম গতি হারাচ্ছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে বিরক্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তারা একের পর এক প্রকল্পের কার্যক্রম তদন্ত করে হাঁপিয়ে যাচ্ছেন। প্রকল্পের অনিয়মের কারণে গত ২৯ আগস্ট সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় শীর্ষ এক কর্মকর্তাকে ভর্ৎসনা করেন ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা। কিন্তু দায়িত্বে অবহেলার কারণে মাউশি এবং অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রকল্প কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে পারছেন না। ব্যবস্থা নিতে গেলেই শুরু হয় নানা মহলের তদবির। ক্ষেত্রবিশেষ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ উঠে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার ছিল গড়ে ৯৫ শতাংশ, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৯৬ শতাংশ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৯৮ দশমিক ৮০ শতাংশ, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৯৭ শতাংশ, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯৯ দশমিক ১৭ শতাংশ, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯৫ শতাংশ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রকল্প বাস্তবায়নের হার ছিল ৯২ দশমিক ২২ শতাংশ। এই অর্থবছরে জাতীয়ভাবে সব প্রকল্পের গড় বাস্তবায়ন হার ছিল ৯৪ দশমিক ০২ শতাংশ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাউশির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক (পরিচালক, কলেজ ও প্রশাসন) প্রফেসর ড. সামছুল হুদা  বলেন, ‘প্রকল্পের দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে সরকার ও আমাদের ভাবমূর্তি জড়িত। তা করে কেউ পার পাবে না। খুব শীঘ্রই আমি প্রকল্প পরিচালক ও আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে বসব।’

সেসিপ প্রকল্পে এসি ক্রয়ে দুর্নীতি : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এডিবির (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) সহায়তায় বাস্তবায়িত ‘সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’র (সেসিপ) বিষয়ে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদফতরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের জন্য বাজার মূল্যের চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি দামে ২৫টি এসি ক্রয় করেই সরকারের ১৬ লাখ পাঁচ হাজার টাকা গচ্ছা দিয়েছে প্রকল্প কর্মকর্তারা।

শিক্ষা সচিব ও মাউশি মহাপরিচালকে দেয়া ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্রতিটি এসির বাজার দর ৫৫ হাজার ৬০০ টাকা। এর সঙ্গে আইটি, ভ্যাট, ঠিকাদারের লাভ ও এসি স্থাপন চার্জ যোগ করলে প্রতিটি এসির সঙ্গে ২২ শতাংশ অর্থ যোগ হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি এসির মূল্য হয় ৬৭ হাজার ৮৩২ টাকা। কিন্তু প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ২৫টি এসি ক্রয় করেছেন ২৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকায়। অর্থাৎ অতিরিক্ত ৯ লাখ ৯৯ হাজার ২০০ টাকা পরিশোধ করেছেন যা দায়ী ব্যক্তিবর্গের নিকট হতে আদায়পূর্বক প্রমাণসহ পুনঃ জবাব প্রেরণের জন্য অনুরোধ করা হলো।’

এই প্রকল্পের বিষয়ে অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গত অর্থবছরে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতির হার ছিল ৯১ দশমিক ১৯ শতাংশ। চলতি ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে গত জুলাই পর্যন্ত অর্থ ছাড় হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৫ শতাংশ এবং ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ৩২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১ দশমিক ৭২ শতাংশ।’

নতুন স্কুল-কলেজ স্থাপনে দুর্নীতি : ‘ঢাকা মহানগরীতে ১১টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৬টি মহাবিদ্যালয় স্থাপন’ প্রকল্পে ১৬ কোটি ৩৯ লাখ ২০ হাজার টাকার অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে সরকারি এক অডিট প্রতিবেদনে।

২০১৬-২০১৭ এই নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনটি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি করা হয়েছে; কিন্তু ব্যয় সংক্রান্ত প্রমাণ না থাকায় দুটি আপত্তি নিষ্পত্তি করা যায়নি। এর মধ্যে প্রকল্পভুক্ত তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ কাজ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এতে করে সরকারের ৯৪ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে।

এছাড়া একনেক অনুমোদিত ডিপিপির (প্রকল্প দলিল) প্রভিশন অনুযায়ী নির্ধারিত থানা এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন না করে প্রকল্প বহির্ভূত এলাকায় ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছে, যার কারণে সরকারের ১৫ কোটি ৪৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

এ ব্যাপারে এই প্রকল্পের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এসব অডিট আপত্তির জবাব দিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। সব অভিযোগেরই ব্যাখ্যা দিয়েছি। এখন কোন ঝামেলা নেই।’

নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি টিকিউআই-২ প্রকল্প : টিচিং কোয়ালিটি ইম্প্রুভমেন্ট (টিকিউআই-২) ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন প্রজেক্ট’র বাস্তবায়ন গত জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্প কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে তা হয়নি। গত ৯ আগস্ট মাউশি’র এক সভায় ওই প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) জহির উদ্দিন বাবর বলেন, ‘প্রকল্পটি গত জুনে সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত ছিল। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির কার্যক্রম চলমান থাকা, বিএড টেক্সট বুক পান্ডুলিপি প্রণয়ন ও অনুমোদনে বিলম্ব হওয়া এবং সিভিল ওয়াকর্স এর একটি প্যাকেজের কাজ প্রকল্প মেয়াদে সম্পন্ন করতে না পারার কারণে ইইডি টেন্ডার আহবান করতে পারেনি- ইত্যাদি কারণে বিগত অর্থবছরে প্রকল্পের কার্যক্রম কাঙ্খিত অগ্রগতি আনয়ন সম্ভব হয়নি। বিগত অর্থ বছরে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতির হার ছিল ৭৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ।’ শিক্ষক প্রশিক্ষণের নামে এই প্রকল্পের অর্থায়নেও ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ করছেন এক শ্রেণীর সুবিধাবাদী কর্মকর্তা।

দুর্নীতির কারণে স্থবির আইসিটি প্রকল্প :

মাউশি জানায়, ডিপিপি (প্রকল্প দলিল) আমলে না নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের প্রভাবশালী মহলের নির্দেশে দরপত্র আহ্বানের কারণে ‘আইসিটি’র মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রচলন (পর্যায়-২)’ এর বাস্তবায়ন স্থবির হয়ে পড়েছে।

গত অর্থবছরে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতির হার ছিল ১ দশমিক ৭০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে ৩২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে গত জুলাই পর্যন্ত ছাড় হয়েছে ৮১ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৫ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত অর্থবছরে আইসিটি প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ হওয়া প্রায় ১৬৩ কোটি টাকা ফেরত গেছে। এই প্রকল্পের কেনাকাটার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কারণে প্রভাবশালী মহলের কোন শাস্তি হয়নি, যারা দরপত্র নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল। অথচ এককভাবে পিডি’কে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।

পরবর্তীতে আইসিটি প্রকল্পে নতুন পিডি নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যার বিরুদ্ধে একটি কলেজে থাকা অবস্থায় কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ ছিল। এছাড়াও দুর্নীতির সিন্ডিকেটের কারণে স্থবির হওয়া এই প্রকল্পের কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণে এখন অন্য একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

১৫শ কলেজ উন্নয়ন প্রকল্পেও স্থবিরতা :

‘তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত বেসরকারি কলেজসমূহের (১৫০০ কলেজ) উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন কলেজে শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের জন্য গত জুনে ৪/৫টি প্রতিষ্ঠানকে আগামী ১২০ কোটি টাকা পরিশোধের অভিযোগ উঠে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে প্রায় ৭৯ কোটি টাকা আগাম পরিশোধের প্রমাণ মিলেছে বলে জানা গেছে। যদিও ইতোমধ্যে ঠিকাদাররা বেশির ভাগ শিক্ষা উপকরণই সরবরাহ সম্পন্ন করেছেন।

এ অভিযোগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকল্পের এক উপ-পরিচালক ও সহকারী পরিচালককে ওএসডি’র পাশাপাশি সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু প্রভাবশালী কর্মকর্তারা ধরাচোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছেন। এছাড়াও প্রকল্পের পরিচালকের সঙ্গে কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও মাউশি’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্বন্ধের কারণে প্রায় তিন মাস ধরে প্রকল্পের বাস্তবায়ন স্থবির রয়েছে।

এদিকে মাউশি’র গাফিলতির কারণে এই সংস্থার অধীনে বাস্তবায়ন হওয়া উচ্চ মাধ্যমিক উপবৃত্তি প্রকল্প, মাধ্যমিক শিক্ষা উপবৃত্তি প্রকল্প (২য় পর্যায়), ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প, সরকারি কলেজসমূহে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ প্রকল্প, জেনারেশন ব্রেক থ্রু প্রকল্প এবং সিলেট, বরিশাল ও খুলনা শহরে ৭টি সরকারি বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের বাস্তবায়নও ধরিগতিতে এগুচ্ছে। তবে ন্যাশনাল একাডেমি ফর অটিজম ও নিউরো-ডেভেলপমেন্ট ডিজএ্যাবিলিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও অদক্ষতায় ক্ষুদ্ধ মাউশি’র কর্মকর্তারা।

 

সৌজন্যে: দৈনিক সংবাদ