বেতন ছাড়াই ঈদ পার করতে যাচ্ছেন যে শিক্ষকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

এডুকেশন বাংলা

প্রকাশিত : ০৪:৫৪ পিএম, ২১ মে ২০২০ বৃহস্পতিবার

অমানিশা নেমে এসেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরের বেসরকারি কয়েক লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর জীবনে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বহু স্কুল ও কলেজে নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের গতকাল বুধবার পর্যন্ত বেতন-ভাতা হয়নি। কোথাও কোথাও হলেও তা আংশিক। গতকাল থেকে ছুটি হয়ে গেছে ব্যাংকগুলোও। ফলে এই শিক্ষক-কর্মচারীদের ঈদের আগে আর বেতন পাওয়ার কোনো আশা নেই।

বেতন ছাড়াই ঈদ পার করতে যাচ্ছেন ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরাও। কোনো কিন্ডারগার্টেন স্কুলেই এপ্রিল মাসের বেতন হয়নি। কোথাও কোথাও মার্চ মাসের বেতনও বাকি। উচ্চশিক্ষা স্তরে বহু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও বেতন হয়নি। প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষ বলছে, টিউশন ফি আদায় না হওয়াই বেতন না হওয়ার কারণ। করোনার কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে সারাদেশের সব স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে আছে।

বাসাবাড়িতে টিউশনি করে চলা শিক্ষকরাও পড়ানো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম দুর্বিষহ অবস্থায় পড়েছেন। বাংলাদেশ নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার সমকালকে বলেন, এই প্রথম এমন একটা দিন কোনো বেতন-ভাতা ছাড়াই নন-এমপিও শিক্ষক ও কর্মচারীদের পার করতে হচ্ছে। করোনার এই দুর্যোগকালীন কেউ নেই লাখ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর পাশে দাঁড়ানোর। শিক্ষকরা তো কারও কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করতে পারেন না।

দেশের ১০৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষক, ১৩ হাজার কর্মচারী রয়েছেন। করোনার কারণে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই এপ্রিল মাসের বেতন দিতে পারেনি। শীর্ষ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি বেতন পরিশোধ করেছে। বাকি ৪৬টি বিশ্ববিদ্যালয় আংশিক, কোনো কোনোটি শুধু বেতন (বোনাস নয়) দিয়েছে কর্মরতদের।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করার পর এতবড় সংকটে আর কখনও পড়েনি। এসব বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। টিউশন ফি আদায় না হলে এখানে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন কোথা থেকে দেওয়া হবে?

সংকটে পড়েছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোও। `ইংলিশ মিডিয়াম স্টু্কল অ্যাসোসিয়েশনে`র সাধারণ সম্পাদক জিএম নিজাম উদ্দিন জানিয়েছেন, তারা আর্থিক সংকট কাটাতে সরকারের কাছে আর্থিক প্রণোদনা চেয়েছেন। মানবেতর জীবনযাপন করছেন ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরাও। দেশে চার হাজার ৩১২টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র এক হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকরা ২ হাজার ৫০০ ও সহকারী শিক্ষকরা ২ হাজার ৩০০ টাকা ভাতা পান সরকার থেকে। বাকি তিন হাজার মদ্রাসার শিক্ষক কিছুই পান না।

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদ সভাপতি এস এম জয়নাল আবেদিন জিহাদী বলেন, `শিক্ষকদের মধ্যে আমরাই আছি সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়। আমাদের বাঁচাতে আমাদের এমপিওভুক্ত করা হোক।`

দেশের ৬৫ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্টু্কলে সাড়ে ৬ লাখ শিক্ষক কর্মরত। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই ভাড়াবাড়িতে। টিউশন ফির ওপরে এসব প্রতিষ্ঠান শতভাগ নির্ভরশীল। তাদের কোনো শিক্ষক এপ্রিলের বেতন পাননি।

কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মনোয়ারা ভূঁইয়া বলেন, `করোনায় কেউ টিউশন ফি দিচ্ছে না। আমরাও শিক্ষকদের বেতন, বাড়ি ভাড়া দিতে পারছি না। তাই প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা চেয়েছি।` তিনি বলেন, প্রণোদনা না পেলে দেশের বেশিরভাগ কিন্ডারগার্টেনই বন্ধ হয়ে যাবে।

দুর্দিন নেমে এসেছে বেসরকারি পলিটেকনিট ইনস্টিটিউট এবং বিএম কলেজেগুলোতেও। সারাদেশে ১০ হাজার ৪৫২টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯ হাজার ৭৫৯টিই বেসরকারি। করোনার প্রাদুর্ভাবের মধ্যে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় দুই লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর সিংহভাগই বেতন-ভাতা পাননি।