শিক্ষা ক্যাডারে বৈষম্য

ড. মো. আব্দুল কুদ্দুস সিকদার

এডুকেশন বাংলা

প্রকাশিত : ০৯:০৮ এএম, ১ নভেম্বর ২০১৯ শুক্রবার

শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতিজট, সুযোগ-সুবিধার সংকট, শিক্ষকের মূল্যায়ন সংকট, নিরাপত্তা সংকট, বিরামহীন পরিশ্রম ও মর্যাদার সংকটসহ বাংলাদেশে শিক্ষা ক্যাডারটাই তো নানাবিধ সংকটের মুখে। এভাবে চলতে থাকলে মেধারীরা এ ক্যাডার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে- যার প্রভাব হবে ভয়ংকর রকমের খারাপ। থানা শিক্ষা অফিস, জেলা শিক্ষা অফিস, আঞ্চলিক ডিডি অফিস, শিক্ষা বোর্ড, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ডিজি অফিস, মন্ত্রণালয় ঘুরতে ঘুরতে শিক্ষকরা আজ ক্লান্ত। অনেক ছোট্ট কাজেও মন্ত্রণালয়ে ছুটতে হয় তাদের। একটি গেট পাসের জন্য অসহায়ভাবে অনুরোধ করতে হয় নিজের ছাত্রকেই। ঢাকা কলেজ, ইডেন বা তিতুমীর কলেজসহ দেশের বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী কলেজগুলোর অধ্যক্ষকেও মন্ত্রণালয়ে ঢুকতে হয় কারও কাছ থেকে পাস চেয়ে নিয়ে।

বোর্ড থেকে উত্তরপত্রের বস্তা মাথায় নিয়ে অতিকষ্টে হেঁটে চলা শিক্ষকের ছবিও তো আমাদের অজানা নয়। উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত ইউএনওর যাতায়াতের জন্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা মূল্যমানের গাড়ি থাকলেও (যদিও তাদের গাড়ি প্রয়োজন) ইডেন কলেজ, ঢাকা কলেজ, এমসি কলেজ, এমএম কলেজ, রাজশাহী কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ, বিএম কলেজ, বিএল কলেজসহ বড় বড় কলেজের অধ্যক্ষদের যাতায়াত ও জরুরি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য সরকার থেকে কোনো গাড়ি বরাদ্দ করা হয় না। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি, টাকা জমা নেওয়া, হিসাব বিবরণী তৈরি করা, রেজাল্টশিট তৈরি করা ইত্যাদি কাজও করতে হয় শিক্ষককেই। অর্থাৎ শিক্ষাদানের পাশাপাশি করণিকের দায়িত্বও তাদেরকে পালন করতে হয়। অথচ কলেজগুলো সাপোর্ট সার্ভিস নেই বললেই চলে। মাঠ পর্যায়ে এমনকি ঢাকাতেও নেই শিক্ষকদের আবাসিক তেমন সুবিধা। এ যুগেও মাঠ পর্যায়ে একজন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাকে থাকতে হয় বেসরকারি মেসে বা কলেজের ভাঙা ডরমেটরিতে। নতুন নিয়োগ পাওয়া একজন শিক্ষককে যোগদান করতে গিয়ে অনেক সময় থাকতে হয় হোটেলে। নতুন যোগদান করতে যাওয়া নারী কর্মকর্তার অবস্থা সহজে অনুমেয়। চারদিকেই শিক্ষকদের অসহায়ত্ব। তাদের জন্য প্রয়োজন জেলা ও থানা পর্যায়ে অফিসার্স ডরমেটরি-মেস নির্মাণ করা। এত বৈষম্য দিয়ে কি কোয়ালিটি এডুকেশন আদৌ সম্ভব?

সরকারি কলেজগুলোতে একাডেমিক বিশাল কার্যক্রম পরিচালনা এবং মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে প্রয়োজন নতুন নতুন পদ সৃষ্টি করা এবং যথাসময়ে পদোন্নতি নিশ্চিত করা। পদ সৃষ্টির প্রস্তাব বারবার মন্ত্রণালয়ে আটকে যায় নানা কারণে। পদোন্নতি আটকে যায় নানা অজুহাতে, যদিও গত বছর দ্রুততম সময়ে বেশ কিছু পদোন্নতি হয়েছে শিক্ষা ক্যাডারে। জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অনন্য। তাই এদের কাছে জাতির প্রত্যাশাও অনেক। কিন্তু এই শিক্ষকদের মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা (গবেষণার সুযোগ, সময়মতো পদোন্নতি, ইন্টারনেট সুবিধা, বই ক্রয় ভাতা, নিরাপত্তা ভাতা, টেলিফোন ভাতা, হেলথ ইন্স্যুরেন্স ভাতা, অতিরিক্ত দায়িত্ব ভাতা, দেশে-বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণ ইত্যাদি) নিশ্চিত করার দায়িত্ব কি রাষ্ট্রের নয়? ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাষ্ট্রকে অবশ্যই শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট ও টেলিফোন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকাংশ শিক্ষক দেশ-বিদেশ থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী। তারা যখন উচ্চতর ডিগ্রির জন্য গবেষণারত থাকেন, তখন তারা বৃত্তিসহ পূর্ণ বেতন-ভাতা পান। অথচ সমপর্যায়ের শিক্ষাদানে নিয়োজিত থাকলেও কলেজের শিক্ষকদের উচ্চতর গবেষণার সুযোগ কতটুকু?

পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বৈষম্য ব্যাপক। শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সত্ত্বেও প্রথম ও দ্বিতীয় গ্রেডে পদ সৃষ্টিসহ পদোন্নতির ক্ষেত্রে সমতা সৃষ্টি এখনও সম্ভব হয়নি শিক্ষা ক্যাডারে। শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদোন্নতি পদ চতুর্থ গ্রেড। অথচ চতুর্থ গ্রেড কোনো পদোন্নতি পদ নয়, এটা সিলেকশন গ্রেড পদ, যা নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী অকার্যকর। অন্য ক্যাডারগুলোতে পঞ্চম গ্রেড থেকে পদোন্নতি পেয়ে তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত হয়; কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারে পঞ্চম গ্রেড (সহযোগী অধ্যাপক) থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়ে চতুর্থ গ্রেডে উন্নীত হয়, যা চরম বৈষম্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ (অনেকেই সহযোগী অধ্যাপক থাকাকালীনই চতুর্থ গ্রেডপ্রাপ্ত)। এভাবে সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার বঞ্চিত হয়ে নিজেরাই যেন বিবেকহীন অবস্থায় নিপতিত হচ্ছে জাতির বিবেক শিক্ষক সমাজ।

সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা

এডুকেশন বাংলা/এজেড