জি এম কাদেরের চিঠি আমলে না নিতে এবার রওশনের চিঠি

এডুকেশন বাংলা ডেস্ক:

এডুকেশন বাংলা

প্রকাশিত : ১০:৪৪ এএম, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার

সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা করার জন্য স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান জিএম কাদের যে চিঠি দিয়েছেন- সেটিকে ‘ইগনোর’ করার অনুরোধ জানিয়েছেন দলটির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ। কাদের চিঠি দেওয়ার পরদিনই, গতকাল বুধবার রওশন এরশাদ সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতার প্যাডে স্পিকারকে দেওয়া পাল্টা চিঠিতে এই অনুরোধ করেন। রওশনের স্বাক্ষরিত চিঠিটি গতকাল বিকালে সংসদ ভবনে স্পিকারের হাতে পৌঁছে দেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু এমপি। স্পিকারকে দেওয়া চিঠিতে রওশন তার দেবর জিএম কাদেরকে ‘জাপার চেয়ারম্যান নন’ বলে উল্লেখ করেছেন।

জাপার প্যাডে লেখা জিএম কাদেরের চিঠিটি মঙ্গলবার স্পিকারের দপ্তরে পৌঁছে দেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ এমপির নেতৃত্বে দলের পাঁচজন এমপি। মালদ্বীপে থাকা স্পিকার তখনো দেশে পৌঁছাননি, তিনি ফিরেছেন রাতে। গতকাল রওশনের চিঠি পাওয়ার পরে স্পিকার সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুটো চিঠি আমি পেয়েছি। তবে, সেখানে কী রয়েছে তা আমি এখনও দেখিনি। পরে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবো।’ অবশ্য গত ২১ আগস্ট স্পিকার ইত্তেফাককে বলেছিলেন, ‘আসন্ন অধিবেশনের আগে কিংবা এই অধিবেশন চলাকালেই নতুন বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনে সাংবিধানিক কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে বিরোধী দল (জাপা) যদি তাদের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেজুলেশনসহ আমাকে কোনো চিঠি দেয়, সেক্ষেত্রে স্পিকার হিসেবে আমি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’

স্পিকারকে লেখা চিঠিতে রওশন বলেছেন, ‘আপনি আমাকে বিরোধীদলীয় উপনেতা বানিয়েছেন। আমাদের নেতা মারা যাওয়ার পর, সংসদ সদস্যরা আমাকে নেতার কাজ চালিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেন। শুনতে পারলাম, একজন নিজেকে পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা করার জন্য আপনাকে চিঠি দিয়েছেন। আপনাকে জানাতে চাই, নেতা নির্বাচন করার এখতিয়ার পার্লামেন্টারি পার্টি সংরক্ষণ করে। যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে পার্লামেন্টারি পার্টি সিদ্ধান্ত নেবে। ৩ সেপ্টেম্বর পাঠানো চিঠিকে ইগনোর করার অনুরোধ করছি। একইসঙ্গে জানাতে চাই, উনি পার্টির চেয়ারম্যান নন, উনি হচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।’

স্পিকারকে রওশনের চিঠি হস্তান্তরের পর মুজিবুল হক চুন্নু ইত্তেফাককে বলেন, ‘জি এম কাদের সংসদে দলের প্রধান হতে যে চিঠি দিয়েছেন, তা যথাযথ হয়নি জানিয়ে এই চিঠি দিয়েছেন রওশন ম্যাডাম। দলীয় ফোরামের সিদ্ধান্ত ছাড়া ওই চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে এই চিঠিতে বলা হয়েছে।’

স্পিকারকে চিঠি পাঠানোর আগে নেতাদের নিয়ে রওশনের বৈঠক

স্পিকারকে চিঠি পাঠানোর আগে গতকাল দুপুরে রওশন তার গুলশানের বাড়িতে দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও দলীয় সংসদ সদস্যকে নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, মুজিবুল হক চুন্নু এমপি, ফখরুল ইমাম এমপি ও অধ্যাপিকা রওশন আরা মান্নান এমপি উপস্থিত ছিলেন। জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য আজম খান ও শফিকুল ইসলাম সেন্টু, ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম নূরু এবং দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মহাসচিব লিয়াকত হোসনে খোকা এমপিও এই বৈঠকে যান।

প্রায় আড়াই ঘণ্টার বৈঠক শেষে রওশনের বাসা থেকে বেরিয়ে ব্যারিস্টার আনিস সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমার জানামতে, আমাদের পার্টির এখন কোনো চেয়ারম্যান নেই। উনি (জি এম কাদের) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। কোনো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উনি চেয়ারম্যান হননি। কোনো একজন একটা মিটিংয়ে দাঁড়িয়ে বলবে-আমি চেয়ারম্যান, এটা তো হতে পারে না। হি ইজ নট চেয়ারম্যান।’ আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আরও বলেন, ‘সংসদে বিরোধী দলের নেতা নির্বাচন করতে গেলে পার্লামেন্টারি কমিটির বৈঠক লাগে, পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক ডাকার এখতিয়ার একমাত্র উপনেতা রওশন এরশাদেরই আছে। যেহেতু সংসদে আমাদের নেতা নাই, উপনেতা আছেন। তিনি তো ডাকবেন সভা।’

এসময় মুজিবুল হক চুন্নু সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাপার পার্লামেন্টারি কমিটির বৈঠক ছাড়া স্পিকারকে দেওয়া জিএম কাদেরের চিঠির কোনো দাম নাই। জিএম কাদের পার্লামেন্টারি কমিটির কোনো বৈঠক না করেই লুকিয়ে এই চিঠি দিয়ে থাকলেও আমি ও আমরা সে বিষয়ে কিছু জানি না। আমিও তো একজন নগণ্য এমপি। আমাকে তো কোনো নোটিস বা ফোন দেওয়া হয়নি। যে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে শুনছি, সেটি প্রপার না।’ আপনারা কাকে বিরোধীদলীয় নেতা করতে চাচ্ছেন? প্রশ্ন করা হলে চুন্নু বলেন, ‘জাপার অধিকাংশ এমপির সেন্টিমেন্ট রওশন এরশাদের পক্ষে। এরশাদের পর তারা তাকেই দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চান, দেখতে চান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও।’

দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ীই স্পিকারকে চিঠি দিয়েছি: জিএম কাদের

গতকাল দুপুরে রাজধানীর বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে জিএম কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা মনোনয়ন প্রশ্নে জোর করে কিছু করা হয়নি। জাপার গঠনতন্ত্র অনুযায়ীই স্পিকারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’ স্পিকারকে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে দলের সকল সংসদ সদস্যকে না জানানোর বিষয়ে কাদের বলেন, ‘আমরা ফোনে সংসদ সদস্যদের জিজ্ঞেস করেছি। তারা সম্মতি দিয়েছেন। লিখিত দিতে বলা হলে ১৫ জন সম্মতিপত্র দিয়েছেন। ২৫ জনের মধ্যে ১৫ জন সম্মতি দিলে আর কিছু লাগে না। তাই অন্যদেরকে বলা হয়নি। এখন আরও অনেকে দিতে চাচ্ছেন। প্রয়োজন নেই বলে নেওয়া হচ্ছে না।’ সংসদীয় দলের বৈঠক না করা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেবিষয়ে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, ‘এরশাদ সাহেব যখন বেঁচে ছিলেন, তিনিও কিন্তু এভাবে বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছিলেন, প্রথমে আমাকে বিরোধীদলীয় উপনেতা করেছিলেন। পরে আমাকে সরিয়ে রওশন এরশাদকে উপনেতা করা হয়। তখনও কিন্তু পার্লামেন্টারি পার্টির কোনো মিটিং হয়নি।’ রওশন না আপনি পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক ডাকবেন? প্রশ্ন করা হলে জিএম কাদের বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান হিসেবে সংসদীয় দলের সভা ডাকার এখতিয়ার আমার। অন্য কেউ পার্লামেন্টারি পার্টির সভা ডাকতে পারে না। ডাকতে হলে আমিই ডাকব।’

এরশাদ যেভাবে বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছিলেন ও বিরোধী উপনেতা করেছিলেন

চলতি একাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার জন্য জাপার প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ পার্লামেন্টারি পার্টির কোনো বৈঠক করেননি। গত ৪ জানুয়ারি গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে এরশাদ ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছিলেন- একাদশ সংসদে তিনি (এরশাদ) বিরোধীদলীয় নেতা ও জিএম কাদের বিরোধীদলীয় উপনেতার দায়িত্ব পালন করবেন। এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে পরদিন ৫ জানুয়ারি স্পিকারকে চিঠি দেন এরশাদ। এব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এরশাদ তার চিঠিতে স্পিকারকে অনুরোধ জানান। পরে এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জিএম কাদেরকে বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন স্পিকার। তবে গত ২২ মার্চ জিএম কাদেরকে বিরোধীদলীয় উপনেতার পদ থেকে সরিয়ে দেন এরশাদ, পরদিন ২৩ মার্চ রওশনকে বিরোধীদলীয় উপনেতা করার জন্য এরশাদ ফের স্পিকারকে চিঠি দেন। স্পিকারও রওশনকে বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

জাপার গঠনতন্ত্রে যা বলা আছে

জিএম কাদের দাবি করেছেন, দলের গঠনতন্ত্র মেনেই তিনি স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন। আর রওশন ও তার অনুসারীদের অভিযোগ, পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক ছাড়া এভাবে এমপিদের শুধু স্বাক্ষর নিয়ে স্পিকারকে চিঠি দেওয়া গঠনতন্ত্র পরিপন্থি। তবে জাপার গঠনতন্ত্রের ২২ ধারায় বলা আছে, ‘জাতীয় সংসদে পার্টির সদস্যবৃন্দের সমন্বয়ে পার্টির পার্লামেন্টারি পার্টি গঠিত হইবে। পার্টির চেয়ারম্যান পার্লামেন্টারি পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যবৃন্দের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের মাঝ হইতে এই পার্টির নেতা, উপনেতা, চিফ হুইপ এবং হুইপবৃন্দ নির্বাচিত করিবেন। জাতীয় পার্টির সংসদীয় পার্টিভুক্ত প্রত্যেক সদস্য উক্ত পার্টির সিদ্ধান্ত মানিয়া চলিতে বাধ্য থাকিবেন। উক্ত পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সিদ্ধান্তই পার্টির সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য গণ্য হইবে; তবে শর্ত থাকে যে, পার্লামেন্টারি পার্টি জাতীয় পার্টির সিদ্ধান্ত, দলের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, আদর্শ ও দলের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে পারিবে না।’

জাপার গঠনতন্ত্রে দলীয় চেয়ারম্যানকে এই ক্ষমতা দেওয়া থাকলেও রওশন ও তার অনুসারীদের দাবি, গঠনতন্ত্রে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে চেয়ারম্যানকে। কিন্তু জিএম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান নন, তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন কাউন্সিলে। মৃত্যুর আগে গত ৪ মে এরশাদ লিখিত এক সাংগঠনিক নির্দেশনায় বলেছেন, তার অবর্তমানে জিএম কাদের জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে ব্যারিস্টার আনিস ও মুজিবুল হক চুন্নু ইত্তেফাককে বলেন, ‘এরশাদ সাহেব যেটা লিখে গেছেন সেটি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। এটা একটা উইশ উইল, যেটা ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষেত্রে শুধু প্রয্যোজ্য। কিন্তু একটি দলের চেয়ারম্যান তার অবর্তমানে আরেকজনকে চেয়ারম্যান করতে পারেন না। জাপার গঠনতন্ত্রের ১২ ধারার ১০ উপধারায় বলা আছে, ‘দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হইবেন কাউন্সিলে।’

রওশনের সংবাদ সম্মেলন আজ, তার বাড়ির সামনে বিক্ষোভের প্রস্তুতি কাদেরপন্থিদের

আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জানান, আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় রওশন এরশাদ তার গুলশানের বাড়িতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন। এতে দলের রাজনীতি নিয়ে রওশন এরশাদ নিজেই সাংবাদিকদের ব্রিফ করবেন। সংবাদ সম্মেলনে দলের নেতা ও সংসদ সদস্যদেরও উপস্থিত থাকার জন্য রওশন অনুরোধ জানিয়েছেন।

এদিকে, স্পিকারকে রওশন এরশাদের চিঠি দেওয়া ও আজকের সংবাদ সম্মেলন ক্ষুব্ধ করেছে জিএম কাদেরের অনুসারীদের। আজকের সংবাদ সম্মেলনের সময় রওশনের বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। এনিয়ে রওশন ও কাদের পন্থিদের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা বিরাজ করছে।

সাদকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে রংপুরে বিক্ষোভ চলছেই

রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে জাপা থেকে মনোনয়নফরম সংগ্রহকারী এরশাদ-রওশনের ছেলে রাহগির আল মাহিরকে (সাদ এরশাদ) রংপুরে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। সাদকে যেন দলীয় মনোনয়ন দেওয়া না হয়- সেই দাবিতে সোমবার রাতে রংপুরে বিক্ষোভকারীরা সাদের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়েছে। গত দুইদিনও সাদের বিরুদ্ধে রংপুরে বিক্ষোভ হয়েছে। অন্যদিকে, সাদকে দলীয় প্রার্থী করা হলে তার পক্ষে মাঠে না থাকার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা। সূত্র: ইত্তেফাক

এডুকেশন বাংলা/একে