বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েও নিয়োগবঞ্চিত ৮ হাজার চিকিৎসক

রাশেদ রাব্বি

এডুকেশন বাংলা

প্রকাশিত : ০৮:৫৩ এএম, ১১ জুলাই ২০১৯ বৃহস্পতিবার

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর দুই বছর অতিবাহিত হলেও এখনও নিয়োগ হয়নি ১০ হাজার চিকিৎসক। দেশের মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে এবং চিকিৎসক সংকট নিরসনে ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে এ নির্দেশনা দেন।

এরপর বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (বিপিএসসি) মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে ৮ হাজার ৩৬০ জন উত্তীর্ণ হন। অথচ সেখান থেকে মাত্র ৪ হাজার ৭৯২ জন চিকিৎসক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়।

ফলে বাকি ৮ হাজারেরও বেশি চিকিৎসক নিয়োগবঞ্চিত হয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তবে আপাতত সরকারি পর্যায়ে এই বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগের সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে দেশে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় পর্যাপ্তসংখ্যক রোগী কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদস্থ এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, নানা কারণে ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। উত্তীর্ণদের বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এমনকি উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বলা যায়, আপাতত উত্তীর্ণদের কোনো গতি হচ্ছে না।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৫ জুন ১০ হাজার চিকিৎসক (সাড়ে ৯ হাজার সহকারী সার্জন ও ৫০০ সহকারী ডেন্টাল সার্জন) নিয়োগের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী বরাবর পেশ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন হাসপাতাল, ১৪টি মেডিকেল কলেজ, ৭টি ডেন্টাল ইউনিট ও অন্যান্য চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হচ্ছে।

১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ সালে নিয়োগকৃত অনেক চিকিৎসক এরই মধ্যে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন এবং ২০১৯ সালের মধ্যে সবাই অবসরে যাবেন। ফলে বিদ্যমান চিকিৎসক সংকট তীব্রতর হবে এবং চিকিৎসাসেবা মারাত্মক ব্যাহত হবে।

তাই স্বল্প সময়ের মধ্যে ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাবে ২০১৭ সালের ২১ জুন স্বাক্ষর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু তারপরও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নিয়োগ হয়নি ১০ হাজার চিকিৎসক।

সম্প্রতি ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের স্বাস্থ্যবিষয়ক গ্রুপের উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হাবিবে মিল্লাত বলেন, বিদ্যমান জনসংখ্যার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে আরও এক লাখ চিকিৎসক নিয়োগ করতে হবে।

পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ৮ লাখ স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ প্রয়োজন। জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে বাজেটও বাড়াতে হবে। অন্যথায় দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে এসডিজি বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিগত ১০ বছরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গতিশীল করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দু’ভাগ করা হয়েছে। ১২ হাজার নারীকে স্কিলড বার্থ অ্যাটেনডেন্ট প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, তৃণমূলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ১৩ হাজার ৮৮২টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০ এমনকি ২৫০ শয্যা পর্যন্ত উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে জনবল নিয়োগের পদ সৃষ্টি হয়নি। এখনও ২০০৮ সালের কাঠামো দিয়েই চলছে। যার নিদারুণ পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে কোটি কোটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে।

অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এখনও দেশের চিকিৎসকদের অর্ধেক পদ অ্যাটাচমেন্টের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। অর্থাৎ একই চিকিৎসককে দুই স্থানে পদায়ন করে দুটি পদই পূর্ণ দেখানো হয়। এভাবে কাগজেকলমে চিকিৎসক থাকলেও আদতে একজন চিকিৎসক দুই জায়গায় পদায়ন আছেন। অথচ পাস করেও নিয়োগ পাচ্ছেন না অনেক চিকিৎসক।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে বিপুলসংখ্যক ক্যাডার চিকিৎসক নিয়োগ এখন সময়ের দাবি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এদেশে আরও ৫৬ হাজার সরকারি চিকিৎসক প্রয়োজন।

জনবলের অভাবে চিকিৎসকদের গড়ে প্রায় ১৬ ঘণ্টা করে ডিউটি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নীতিমালা অনুযায়ী চিকিৎসাশাস্ত্রের মৌলিক বিষয়গুলোয় প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন শিক্ষক থাকতে হবে।

সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ মিলিয়ে ১১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রয়েছেন ৯ হাজার ৪০৩ জন। অথচ শিক্ষক প্রয়োজন ২৫ হাজার ৩০০ জন।

অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক রয়েছেন তিন ভাগের একভাগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ৬ দশমিক ৩৩ জন চিকিৎসক প্রয়োজন। অথচ এ মুহূর্তে বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজারে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ১ দশমিক ২৮ জন।

চিকিৎসকদের এ সংখ্যা সরকারি হাসপাতালের শয্যাসংখ্যার চেয়ে কম। বর্তমানে দেশে সরকারি হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা রয়েছে প্রতি ১০ হাজারে ৩ দশমিক ২৪টি। হেলথ বুলেটিন ২০১৮’র তথ্য অনুসারে, বর্তমানে দেশে ১৭ দশমিক ৫০ শতংশ চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে।

৩৯তম বিসিএসে উত্তীর্ণ চিকিৎসকরা জানান, ৮ হাজার ৩৬০ জন বিসিএস উত্তীর্ণ চিকিৎসক সরকারি সেবাদানের নিশ্চয়তা পেতে বেশ কিছুদিন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ছোটাছুটি করেছেন। মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন করে শান্তিপূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন।

কেউই তাদের কথা শুনতে বা পাশে দাঁড়াতে আগ্রহী নন। তারা জানান, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসা প্রদানে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েই বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও উত্তীর্ণ হয়েও নিয়োগ না পাওয়ায় অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েছেন। স্বপ্নভঙ্গ হওয়ায় কেউ কেউ বিষণ্ণতায় ভুগছেন, কারও ভেতর আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

সামগ্রিক বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব (স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ) মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, উত্তীর্ণদের নিয়োগের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের আন্তরিকতা ছিল। তবে প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি না হওয়ায় আপাতত তাদের নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া বিপিএসসি থেকে তাদের নন-ক্যাডার হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও স্বাস্থ্য বিভাগে নন ক্যাডার পদ নেই। তাই প্রশাসনের মতো করে তাদের নন ক্যাডার পদে নিয়োগ দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সৌজন্যে: যুগান্তর
এডুকেশন বাংলা/এজেড