অকার্যকর হয়ে পড়েছে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি

সাব্বির নেওয়াজ

এডুকেশন বাংলা

প্রকাশিত : ০৯:৪৪ এএম, ৪ জুলাই ২০১৯ বৃহস্পতিবার

অর্থাভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটিগুলো। উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০০৯ সালে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দেখভালকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এ কমিটি গঠনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাগাদা দিয়ে আসছে। ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। আবার বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি গঠন করা হলেও তা অকার্যকর। নামমাত্র কমিটি গঠন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানেন না, সেখানে এ ধরনের কোনো কমিটি আদৌ আছে কি-না।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির কয়েক সদস্যের সঙ্গে কথা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, কমিটিগুলো মূলত কাগুজে। কোনো ঘটনা ঘটলেই সাধারণত কমিটির খোঁজ পড়ে। নইলে নয়। তারা বলেন, কমিটিগুলোর নিয়মিত কোনো সভা হয় না। কমিটির সবার বসার জন্যও কোনো কক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ দেয়নি। কমিটির সদস্যরা কোনো বৈঠকে বসলে সেখানে আপ্যায়ন, তদন্তের প্রয়োজনে যাতায়াত, এসবের জন্য অর্থের প্রয়োজন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আর্থিক কোনো বরাদ্দ এ কমিটিকে দেওয়া হয় না। তদন্তের প্রয়োজনে একটি কক্ষ, প্রতিবেদন লেখার জন্য কম্পিউটার, প্রিন্টার ও একজন কম্পিউটার অপারেটর প্রয়োজন। তারা বলেন, মূলত টাকা-পয়সার অভাবেই কমিটিগুলো অকার্যকর। অনেক ক্ষেত্রে কমিটির প্রধানের পকেট থেকে টাকা-পয়সা দিয়ে কমিটির সভা করা হয়।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে ও এ বিষয়ে ছাত্রীদের সচেতন করতে সম্প্রতি `ইউএন উইমেন`-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে ইউজিসি। ইউজিসির সংশ্নিষ্টরা জানান, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দসহ কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে সব সহায়তা দিতে শিগগির উপাচার্যদের চিঠি দেবে ইউজিসি।

এ বিষয়ে ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম বলেন, টাকা-পয়সা নেই, বসার জায়গা নেই, লজিস্টিক্স নেই, তাহলে কমিটিগুলো কাজ করবে কীভাবে? এ বিষয়ে আমরা উপাচার্যদের বলব। তিনি বলেন, কমিটিগুলো কার্যকর হলেই সমাধান আসবে না। সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে। তিনি বলেন, আজ আমার কাছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি চিঠি এসেছে, একজন উপাচার্যের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়ে। উপাচার্যই যদি এসবে অভিযুক্ত হন, তাহলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীরা পড়বেন কেমন করে? আমাদের দেশে মেয়েদের চলার পথটা এখনও মসৃণ নয়। তবু আমরা (ইউজিসি) চেষ্টা করে যাচ্ছি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৪৯টি। এর মধ্যে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি আছে ৩৫টিতে। আর চালু থাকা ৯৪টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এ কমিটি আছে ৫৩টিতে। চলতি বছর এ সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ গত ছয় মাসে আছে কি-না, সেজন্য নির্দিষ্ট ছকে তথ্য চেয়েছিল ইউজিসি। ইউজিসির তৈরি করা এ-সংক্রান্ত অর্ধবার্ষিকী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ মুহূর্তে এ ধরনের কোনো অভিযোগ নেই। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা, জাহাঙ্গীর নগর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল, বিইউপি, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্নিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ বিষয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়েছে।

ইউজিসি কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধু অভিযোগ কমিটি গঠন নয়, বরং ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য স্থানে অভিযোগ বাক্স রাখা এবং শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে ছাত্রছাত্রীদের জানানোর জন্য সব বিশ্ববিদ্যালয়কে পত্র দিয়েছে। কমিটির সদস্যদের তালিকা সংশ্নিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে দিতেও বলেছে। ইউজিসি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এসব বিষয় মনিটর করার জন্য ইউজিসি সচিবের নেতৃত্বে একটি মনিটরিং কমিটিও গঠন করা হয়।

ইউএন উইমেন-এর সহায়তা নিয়ে ইউজিসি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অভিযোগ দেওয়ার জন্য কমিটি থাকলেও প্রচারের অভাবে শিক্ষার্থীরা সে সম্পর্কে কিছুই জানে না। অভিযোগ কমিটি পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো ফান্ড দেওয়া হয় না। অনেক সময় অভিযোগ কমিটির প্রতিবেদন সংশ্নিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট গ্রহণ করতে চায় না।

এ বিষয়ে ইউজিসির মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব ও প্রতিষ্ঠানটির উপপরিচালক (পাবলিক ইউনিভার্সিটি) মৌলি আজাদ সমকালকে বলেন, ইউজিসি দক্ষতার সঙ্গে সব বিশ্ববিদ্যালয় মনিটর করছে। সব কমিটিকে কার্যকর করা হচ্ছে। নবীনবরণ অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথমদিনই সবাইকে এ বিষয়ে জানিয়ে দিতে বলা হয়েছে। নিজের কাজে অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, মূল সমস্যা হলো অভিযুক্তরা প্রভাবশালী ছাত্র, অথবা শিক্ষক হলে সিন্ডিকেট অনেক সময় এ কমিটির প্রতিবেদন আমলে নিতে চায় না। এটা একটা মহা সমস্যা। দ্বিতীয়ত, কমিটিগুলোর কোনো তহবিল নেই। তৃতীয় সমস্যা হলো, ছাত্রীরা জানে না, কোথায় সে অভিযোগটি জানাবে। মৌলি আজাদ বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হলো, যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে পৃথক আইন দরকার। উচ্চ আদালতের রায়ে এ বিষয়ে বলা আছে। এখন ভিন্ন ভিন্ন আইনের সহায়তা নিয়ে ভিকটিমকে আইনি সহায়তা দিতে হয়।

২০০৯ সালে উচ্চ আদালত প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে পাঁচ সদস্যের যৌন নিপীড়নবিরোধী কমিটি করার নির্দেশনা দেন। যে কমিটির প্রধান হবেন একজন নারী। কিন্তু আদালতের এ নির্দেশনা সেভাবে অনুসৃত হচ্ছে না।

উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই কেবল নয়, আদালতের আদেশ অনুসারে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এ ধরনের কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। দেশের সব সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী কমিটি করার জন্য গত ১৯ এপ্রিল নির্দেশ দেয় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর।

একই বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ গত ২৮ এপ্রিল মাধ্যমিক পর্যায়ের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী ব্যানার ও ফেস্টুন টানানোর নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠায় বোর্ডের অধীন সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের।

যদিও খোদ রাজধানীর বেশিরভাগ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গত দুই মাসেও এ ধরনের কোনো ব্যানার ও ফেস্টুন টানাতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে বোর্ডেরও কোনো উদ্যোগ নেই।

এডুকেশন বাংলা/এজেড