বিদ্যালয়ে ২ বছর ধরে অনুপস্থিত প্রধান শিক্ষক

নিজস্ব প্রতিবেদক

এডুকেশন বাংলা

প্রকাশিত : ০২:৫৩ পিএম, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ মঙ্গলবার

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার বালিয়ান ইউনিয়নের নয়নমনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ২ বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। বাকি শিক্ষকদের গড় হাজিরা থাকায় দিনের পর দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে বিদ্যালয়টিতে। তবে বিদ্যালয় সংস্কারের নামে সরকারি টাকা আসলেও প্রধান শিক্ষক টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, উপজেলার বালিয়ান ইউনিয়নের নয়নমনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ২০০৯ সালে স্থাপিত হয়। কিন্তু ২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি সরকারি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করার পর চারজন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান ও তৎকালীন সভাপতি নতুন করে দুজন শিক্ষক নিয়োগ দেন। কিন্তু শিক্ষক বেশি নিয়োগ দেওয়ায় বিদ্যালয়টির আরেক শিক্ষিকা শরিফা খাতুন বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন।

 

ফলে বিদ্যালয়টি সরকারি হলেও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা আটকে যায়। এদিকে নিয়োগের নামে ঘুষ বাণিজ্যের কথা প্রকাশ পাওয়ার পর ২০১৭ সাল থেকে বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দেন প্রধান শিক্ষক। ওই সময় প্রধান শিক্ষক স্লিপ প্রকল্পের ৪০ হাজার টাকার কোনো সংস্কার কাজে ব্যয় না করে আত্মসাৎ করেন বলে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা অভিযোগ করেন।

সরেজমিন দেখা যায়, টিনের বেড়া দিয়ে তৈরি বিদ্যালয়টিতে কোনো দরজা জানালা নেই। এরই মধ্যে ভেঙে গেছে টিনের বেড়া। ঘরের ভেতর থেকে বাইরে দেখা যায়। ফ্লোর কাঁচা হওয়ায় শ্রেণিকক্ষে ধুলাবালি উড়ছে। নেই কোনো চেয়ার টেবিল। কাঁচা ফ্লোরে ধুলাবালিতে চটের ওপর বসে আছে দ্বিতীয় শ্রেণির ছয় থেকে সাতজন শিক্ষার্থী। পাশের ১ম শ্রেণির কক্ষের অবস্থা একই। সেই কক্ষে বসে আছে পাঁচ থেকে ছয়জন শিক্ষার্থী। শিশু শ্রেণির এক কোণায় বসে আছে চার থকে পাঁচজন কোমলমতি শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের পোশাকে লেগে আছে বিদ্যালয় কক্ষের ধুলাবালি।

অফিস কক্ষের অবস্থা আরও বেহাল। চেয়ারগুলো ভেঙ্গে গেছে, দরজা জানালা নেই। ভেতরে বসা দুজন সহকারী শিক্ষক শরিফা খাতুন ও শামীমা ইয়াসমিন। বিদ্যালয়ের নেই কোনো সাইন বোর্ড। একটা অর্ধেক বাঁশের মাথায় ঝুলছে জাতীয় পতাকা। এ সময় উপস্থিত থাকা দুজন শিক্ষক স্বীকার করলেন ২ বছর ধরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতির কথা। এ ছাড়া প্রধান শিক্ষক কর্তৃক স্লিপ প্রকল্পের আত্মসাৎ করা ৪০ হাজার টাকার কথাও বলেন।

জানা যায়, বর্তমানে কাগজে কলমে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৯৭ জন।কিন্তু বাস্তবে এ হিসেব মেলানো খুবই কঠিন।

 

বিদ্যালয়ের বারান্দায় পায়চারী করছিলেন অভিভাবক জোসনারা। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, তার ছেলে গতবার পিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। সে এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। বিদ্যালয় থেকে খুব চাপ দেওয়া হয়েছে জন্ম নিবন্ধন কার্ড জমা দেওয়ার জন্য। কিন্তু তার ছেলেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করার সময় জন্ম নিবন্ধন কার্ডের মূল কপি জমা দিয়ে ভর্তি করে ছিলেন তিনি। প্রধান শিক্ষক সে সময় জন্ম নিবন্ধন কার্ডটি ফেরত দেওয়ার কথা বললেও এক বছর ধরে তিনি বিদ্যালয়ে আসছেন কার্ডটি ফেরত নেওয়ার জন্য। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে প্রধান শিক্ষকের দেখা পাননি।

বালিয়ান ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন জানান, ২ বছর ধরে বিদ্যালয়ে তিনি প্রধান শিক্ষক দেখেন না। বাকি যারা আছেন তারাও অনিয়মিত। বিদ্যালয়ে কোনো লেখা পড়া হয় না। আর এতে করে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে শঙ্কিত আছেন বলেও জানান তিনি।

বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া শিক্ষার্থীর নাম হৃদয়। তার শ্রেণি রোল-৪। নিজের নাম লিখতে বলায় দুজন শিক্ষককের সামনে তিনি লিখলেন রিদয়। ক্লাশের বিষয়ে কথা বললে হৃদয় জানান, একটা করে হয়। চটে বসলে শরীর, জামা কাপড়ে ধুলা লাগে, শীতও করে।

 

কিন্তু ২ বছর ধরে অনুপস্থিত থাকা প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আব্বাস উদ্দিন প্রধান শিক্ষক অনুপস্থিত ও প্রধান শিক্ষকের স্লিপ প্রকল্পের ৪০ হাজার টাকা আত্মসাতের বিষয়টি অবগত আছেন বলে জানান।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ইউএনও) জীবন আরা বলেন, ‘নয়নমনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান ২ বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।’

এ ছাড়া স্লিপ প্রকল্পের ৪০ হাজার টাকা আত্মসাতের বিষয়টি খতিয়ে দেখে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার আশ্বাস দেন উপজেলার এই শিক্ষা কর্মকর্তা।

এডুকেশন বাংলা/একে