শনিবার ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ১০:৫৯ এএম


'শিক্ষকদের কর্মসংস্থান পৃথিবীব্যাপী একটি চ্যালেঞ্জ'

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৯:১৪, ৩ জুলাই ২০১৯  

তরুণদের দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে কর্মসংস্থান বাড়াতে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং অ্যাকশন এইডের যৌথ আয়োজনে জাতীয় সংলাপে এসব বিষয় উঠে এসেছে। সংলাপে বলা হয়, বর্তমানে জিডিপির অনুপাতে ২২-২৩ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ রয়েছে। সেটি বাড়িয়ে ৩০ শতাংশে নিতে হবে।

এজন্য যা যা করা প্রয়োজন তাই করতে হবে। কেননা বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে। আর কর্মসংস্থান হলে দারিদ্র্য কমবে। সেই সঙ্গে শ্রমের বাজারে তরুণদের প্রবেশ এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে যে গ্যাপ রয়েছে তা কমে আসবে।

রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ‘রিয়ালাইজিং দ্য ডেমোগ্রাফিকস ডিভিডেন্ট থ্রু ইনভেস্টমেন্ট অন ইয়ং পিপল : রিফ্লেকশন অন ন্যাশনাল বাজেট ২০১৯-২০’ শীর্ষক এ সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীরের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম। মূল প্রবদ্ধ উপস্থাপন করেন সানেমের গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা। সংলাপ সঞ্চালন করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান।

শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেন, গতানুগতিক রাজনীতির দিন শেষ হয়ে গেছে। প্রেস ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিয়ে দেশ গড়া যাবে না। শক্তিনির্ভর রাজনীতির দিন শেষ। এখন এসেছে পলিসিনির্ভর রাজনীতির দিন। রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে তর্ক বাদ দিয়ে উন্নয়নের রাজনীতির দিকে যেতে হবে। তিনি বলেন, বাজেটে শিক্ষা খাতে তরুণদের জন্য বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। টাইম বাউন্ড ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি।

সামাজিক ও সুষম উন্নয়নে গুরুত্ব রয়েছে। তিনি জানান, বিদেশ থেকে শিক্ষক ভাড়া করে আনা হবে না। কেননা এভাবে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা যাবে না। বরং আমাদের দেশের যারা বিদেশে আছে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে।

অথবা এ দেশের শিক্ষকদের বিদেশে থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনতে হবে। শিক্ষকদের কর্মসংস্থান শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীব্যাপী একটি চ্যালেঞ্জ। এ দেশে কর্মসংস্থানে মিস ম্যাচ আছে। যারা কাজ দেবে তারা দক্ষ লোক খুঁজে পায় না।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে ১৫-২৯ বছর বয়সী তরুণ ২০১৭ সালে ছিল ২৮ দশমিক ১ শতাংশ। সেটি কমে ২০১৮ সালে হয়েছে ২৮ শতাংশ। ২০১৯ সালে হবে ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এভাবে কমতে কমতে ২০৩০ সালে দাঁড়াবে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশে। অন্যদিকে তরুণ শ্রমশক্তিও দিন দিন কমে আসছে।

২০১০ সালে দেশে ১৫-২৯ বছর বয়সী তরুণ শ্রমশক্তি ছিল ২ কোটি ৯ লাখ। সেটি কিছুটা বেড়ে ২০১৩ সালে দাঁড়িয়েছিল ২ কোটি ৩৪ লাখে। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসে সেটি কমে হয়েছে ২ কোটি ৮ লাখ।

২০৬-১৭ অর্থবছরে ২ কোটি এক লাখ। এক্ষেত্রে জনসংখ্যার বোনাসকাল কাজে লাগাতে চারটি ঝুঁকি রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- শিক্ষার নিুমান, কারিগরি দক্ষতার অভাব, কমংসংস্থানের সুযোগের অভাব এবং প্রত্যাশিত প্রজনন স্বাস্থ্য ও পুষ্টির অভাব। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে বয়স্ক লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ নজর দিতে হবে।

এতে আরও বলা হয়, দেশের মোট জনশক্তির ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ কর্মে নেই, শিক্ষায় নেই এবং প্রশিক্ষণেও নেই। এই বিশাল জনশক্তির মধ্যে পুরুষ ৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং মহিলা ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ২২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তরুণদের উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলোতে বাজেটে বরাদ্দ মোট বাজেটের ৩৪ শতাংশ।

এর মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বাদ দিলে অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে বরাদ্দের পরিমাণ কম। বিশেষ করে সরাসরি তরুণদের উন্নয়নের যেসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কাজ করে সেগুলোতে বরাদ্দ আরও কম। প্রকল্পভিত্তিক পর্যালোচনা করে বলা হয়েছে- ২২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে মোট বরাদ্দের মধ্যে ৯ শতাংশ সরাসরি তরুণদের কাজে লাগবে। প্রয়োজনের তুলনায় তরুণদের উন্নয়ন প্রকল্প খুবই কম। তাছাড়া এডিপির আওতায় যে বরাদ্দ দেয়া হয় তার মধ্যেই তরুণদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর বাস্তবায়ন হার কম।

বলা হয়, এসডিজি বাস্তবায়ন করতে হলে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির ৫ দশমিক ৩ শতাংশ করতে হবে, যেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রয়োজন জিডিপির ৪ শতাংশ, যেখানে নতুন বাজেটে দেয়া হয়েছে ২ দশমিক ১ শতাংশ এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রয়োজন। কেননা এখন যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সেখানে একটি বড় অংশই হচ্ছে পেনশন বাবদ।

ড. শামসুল আলম বলেন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য থাকবে।

জনসংখ্যার বোনাসকালকে কাজে লাগাতে ইতোমধ্যেই নানা উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব ছিল। আগামীতেও এটি থাকবে সমান গুরুত্বে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পা হবে কর্মকৌশলগত ও কর্মসূচিভিত্তিক পরিকল্পনা।

তিনি বলেন, দেশে মোট বিনিয়োগের ৭৭ শতাংশ বেসরকারি খাতের আর মাত্র ২৩ শতাংশ সরকারি খাতের। তাই কর্মসংস্থান বাড়াতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। তাছাড়া জাতীয় সংসদকে কার্যকর করতে হবে।

সেখানেই সমস্যাগুলো আলোচনা হতে হবে। তাছাড়া সব কিছুতে সরকারনির্ভরতা পরিহার করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিশেষ নজর দিতে হবে।

সেলিম রায়হান বলেন, বাজেট কতটুকু তরুণদের জন্য সঙ্গতিপূর্ণ হয়েছে তা ভেবে দেখতে হবে। অর্থনীতি বহুমুখীকরণ করতে হবে। তরুণদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাস্তবায়ন হারও বাড়াতে হবে। তা ছাড়া গতানুগতিক আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

ফারাহ কবীর বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। নারীদের উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাজেটে স্যানিটারি ন্যাপকিনের দাম বাড়াতে হয়েছে। এটি সরকারের লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাছাড়া যুবকদের উন্নয়নে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর