শনিবার ২৪ আগস্ট, ২০১৯ ১৯:২০ পিএম


'জাতীয়তা' নয়, 'নাগরিকত্ব' লিখুন

ড. সাখাওয়াৎ আনসারী

প্রকাশিত: ০৯:০১, ৩ মে ২০১৯  

মুষ্টিমেয় মানুষ বাদে বাংলাদেশের সবাই মনে করে, তাদের জাতীয়তা বাংলাদেশি। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে জাতীয়তার পরিচয় তারা `বাংলাদেশি`ই লিখে থাকে। বিসিএসসহ সব চাকরি, পাসপোর্ট-ভিসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, সনদ-নম্বরপত্রী উত্তোলনসহ অজস্র আবেদনপত্র ও নথিতে জাতীয়তার উল্লেখ করতে হয়। পূর্বমুদ্রিত ফরম হলে সেখানে `জাতীয়তা`র ঘর সন্নিবেশিত থাকে। আর সাদা কাগজে দরখাস্ত করতে হলে সেখানে `জাতীয়তা`র ঘর তৈরি করে তা পূরণ করতে হয়। সর্বত্রই সবাই লেখে `জাতীয়তা : বাংলাদেশি`। কখনও কখনও লেখা হয় `জাতীয়তা- জন্মসূত্রে বাংলাদেশি`। ফরম ইংরেজিতে হলে লেখা থাকে `ন্যাশনালিটি`, তখন লিখতে হয় `বাংলাদেশি` অথবা `বাংলাদেশি (বাই বার্থ)`। কখন থেকে `জাতীয়তা : বাংলাদেশি` লেখা শুরু হয়েছে, আমাদের জানা নেই। সংবিধান মোতাবেক বাংলাদেশের মানুষের জাতীয়তা বাংলাদেশি নয়। ফলে যে কোনো মানুষের যে কোনো স্থানে জাতীয়তার পরিচয় `বাংলাদেশি` উল্লেখ করা ভুল। শুধু ভুলই-বা বলব কেন? এটি সংবিধান লঙ্ঘনেরও অপরাধ। ব্যাপারটি খোলসা করা যাক।

এ দেশের `আদি সংবিধান` নামে পরিচিত বাহাত্তরের সংবিধানেই `নাগরিকত্ব` (ইংরেজি পাঠে `সিটিজেনশিপ`) এবং `জাতীয়তাবাদ` (ইংরেজি পাঠে `ন্যাশনালিজম`) লভ্য। `নাগরিকত্ব` শীর্ষক ৬ অনুচ্ছেদের (২) দফায় বলা হয়েছিল, `বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন।` পক্ষান্তরে `জাতীয়তাবাদ` শীর্ষক ৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, `ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।` লক্ষণীয়, বাহাত্তরের সংবিধান মোতাবেক এ দেশের মানুষ নাগরিকত্বের পরিচয়ে যেমন `বাঙালি`; জাতীয়তাবাদের পরিচয়েও `বাঙালি`। এই সংবিধানে `জাতীয়তা` (ইংরেজিতে `ন্যাশনালিটি`) শব্দটির ব্যবহার না করে `জাতীয়তাবাদ` (ইংরেজিতে `ন্যাশনালিজম`) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে আমরা শাব্দিক ব্যাখ্যা করব। তবে এ পর্যায়ে শুধু এটুকুই উল্লেখ করছি, `জাতীয়তা` ও `জাতীয়তাবাদ` দুটি শব্দ একই মূলোদ্ভূূত। দুটিই বিশেষ্য, যদিও এ দুটি ভিন্ন প্রকৃতির বিশেষ্য। এটি পরিস্কার যে, বাহাত্তরের সংবিধান মোতাবেক এ দেশের মানুষের জাতীয়তার পরিচয়টি `বাংলাদেশি` নয়।

`৭৫-এর আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সূত্র ধরে এক পর্যায়ে বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত হন। এর পরিণতিতে `৭৫-এর ৮ নভেম্বর থেকে জারি হতে থাকে একের পর এক আদেশ। এগুলোরই অংশ হিসেবে ১৯৭৬ সালের ২৩ জানুয়ারি সায়েম কর্তৃক দ্বিতীয় ফরমান (চতুর্থ সংশোধন) জারিকৃত আদেশের মাধ্যমে নাগরিকত্বের ৬ অনুচ্ছেদের `বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন` বিধানটি অবলুপ্ত হয়। সায়েম কিন্তু ৯ অনুচ্ছেদের জাতীয়তাবাদের বিধানটিতে হাত দেননি। ফলে এ দেশের মানুষের নাগরিকত্বের পরিচয়টি সাংবিধানিকভাবে `বাঙালি` বহমান না থাকলেও `বাংলাদেশি` কিন্তু হয়নি। অধিকন্তু এটিও বলা প্রয়োজন, ৯ অনুচ্ছেদটি অক্ষত থাকায় জাতীয়তার পরিচয়টি কিন্তু `বাঙালি`ই থেকে যায়। ১৯৭৭ সালের ২৩ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান এক ফরমান আদেশ জারি করেন। এই আদেশের মাধ্যমে ৬ অনুচ্ছেদের নাগরিকত্বের বিধানটি `বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন` রূপ লাভ করে এবং ৯ অনুচ্ছেদের জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত বিধানটি অবলুপ্ত হয়। এর ফলে বাংলাদেশের মানুষের নাগরিকত্বের পরিচয়টি `বাঙালি`র স্থলে `বাংলাদেশি` হয়ে যায়। জাতীয়তাবাদের বিধানটি অবলোপ করায় এ দেশের মানুষ সাংবিধানকিভাবে জাতি-পরিচয়হীন জাতিতে পরিণত হয়। তবে এটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, জাতীয়তাবাদের বিধানটি বাদ দেওয়ায় এ দেশের মানুষের জাতীয়তার পরিচয়টি `বাঙালি` না থাকলেও `বাংলাদেশি` কিন্তু হয়ে ওঠেনি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর সংবিধানের প্রথম যে সংশোধনীটি সাধিত হয়, সেটি পঞ্চম সংশোধনী। এর তারিখ ৯ এপ্রিল ১৯৭৯। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন তখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি; রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমান। এই সংশোধনীতে ১৯৭৭ সালের ২৩ এপ্রিলের ফরমানটির বৈধতা দেওয়া হয়।

২০০৫ সালে ঘোষিত হয় হাইকোর্টের এক রায়। যার ফলে পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় বাতিল হয়ে যায়। এই রায়ের ফলে নাগরিকত্ব ও জাতীয়তাবাদের দুটি বিধানই বাহাত্তরের সংবিধানের অবিকল রূপ ফেরত পায়। হাইকোর্টের এই রায়ের ফল এই দাঁড়ায়- এ দেশের মানুষ সাংবিধানিকভাবে নাগরিকত্ব ও জাতীয়তার উভয় পরিচয়েই বাঙালি। কিন্তু জাতীয়তার পরিচয়টি বাঙালি থাকলেও নাগরিকত্বের পরিচয়টি বাঙালির স্থলে আবার বাংলাদেশি হয়ে যায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ কর্তৃক ৬ অনুচ্ছেদটি মার্জনা করায়। আপিল বিভাগের রায়ের পর থেকে বাংলাদেশের জনমানুষের নাগরিকত্ব বাংলাদেশি, জাতীয়তা বাঙালি।

২০১১ সালের ৩০ জুন সাধিত হয় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী। রাষ্ট্রক্ষমতায় তখন অধিষ্ঠিত ছিল বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ; জাতীয়তাবাদের ৯ অনুচ্ছেদে দলটি স্বাভাবিকভাবেই হাত দেয়নি; কিন্তু হাত দিয়েছে নাগরিকত্বের ৬ অনুচ্ছেদে। `বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন` অংশটুকুর সংশোধন করে দলটি লেখে `বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।` এ দেশের মানুষের জাতিগত পরিচয়টি বাঙালি থাকা সত্ত্বেও এই সংশোধনীর ফলে তা আরও জোরালো ও সুস্পষ্ট হয়। নাগরিকত্ব ও জাতীয়তাবাদে আর হাত না দেওয়ায় বর্তমানে এ দেশের মানুষ নাগরিকত্ব পরিচয়ে বাংলাদেশি, জাতীয়তার পরিচয়ে বাঙালি।

আমরা এতক্ষণ বাংলাদেশের সংবিধানের নির্দেশনার আলোকে জাতীয়তা এবং সম্পর্কিত বলে নাগরিকত্বের বিধান দুটিকে বিচার করার চেষ্টা করেছি। বস্তুত `নাগরিকত্ব` ও `জাতীয়তা` ভিন্ন মূলোদ্ভূত দুটি শব্দ। ফলে সম্প্র্রত্যয় (কনসেপ্ট) বিচারেও এ দুইয়ে ভিন্নতা লক্ষণীয়। প্রথমটির শব্দমূল বা প্রকৃতি যেখানে `নগর`, দ্বিতীয়টির শব্দমূল বা প্রকৃতি সেখানে `জাত`। `ইক`

অন্ত্যপ্রত্যয়যোগে `নগর` হয়েছে `নাগরিক`। আবার এর সঙ্গে `ত্ব` অন্ত্যপ্রত্যয়যোগে হয়েছে `নাগরিকত্ব`। `নগর`-এর ইংরেজি `সিটি`র সঙ্গে অন্ত্যপ্রত্যয়যোগে একইভাবে সৃষ্ট হয়েছে প্রথমে `সিটিজেন`, পরে `সিটিজেনশিপ`। বাংলা এবং ইংরেজির মিলটিও লক্ষণীয়: সিটি- নগর, সিটিজেন- নাগরিক, সিটিজেনশিপ- নাগরিকত্ব। পক্ষান্তরে `জাত`-এর সঙ্গে যথাক্রমে `ই` এবং `ঈয়` অন্ত্যপ্রত্যয়যোগে গঠিত হয়েছে যথাক্রমে `জাতি` এবং `জাতীয়`; আবার `জাতীয়`র সঙ্গে `তা` অন্ত্যপ্রত্যয়যোগে হয়েছে `জাতীয়তা`। `বাদ` অন্ত্যপ্রত্যয়যোগের ফল `জাতীয়তাবাদ`; এ থেকেই গঠিত `জাতীয়তাবাদী`। `জাতি`র ইংরেজি `ন্যাশন`-এর সঙ্গে একইভাবে সৃষ্ট হয়েছে প্রথমে `ন্যাশনাল` (জাতীয়), অতঃপর `ন্যাশনালিটি` (জাতীয়তা), `ন্যাশনালাইজম` (জাতীয়তাবাদ), `ন্যাশনালিস্ট` (জাতীয়তাবাদী), `ন্যাশনালিস্টিক` (জাতীয়তাবাদী) ইত্যাদি শব্দ। `নগর` এবং `জাতি` শব্দ দুটি সমার্থক নয়; বিপরীতার্থক তো নয়ই। ফলে এই দুই শব্দজাত বাকি শব্দগুলোও সমার্থক বা বিপরীতার্থক নয়। এ বক্তব্য প্রযোজ্য এই দুইয়ের ইংরেজি এবং তজ্জাত সব শব্দের জন্যও। `নাগরিকত্ব` (সিটিজেনশিপ) এবং `জাতীয়তা` (ন্যাশনালিটি) সমার্থক না হলেও এ দুই পারস্পরিক সম্পর্কাবদ্ধ। সম্পর্কাবদ্ধ বলেই কখনও কখনও একটির স্থলে আর একটির ব্যবহারজনিত ভুলটি অনেকেই করে থাকে। `নাগরিকত্ব` শব্দটি `নগর`-উদ্ভূত বলে শব্দটির সঙ্গে স্থানের সম্পর্ক। অন্যদিকে `জাতীয়তা` শব্দটি `জাতি`-উদ্ভূত বলে শব্দটির সঙ্গে নৃগোষ্ঠী ও সংস্কৃতিগত সম্পর্ক। রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ব্যবহারে প্রথমটি তাই `বিধিসম্মত ও আইনি সম্প্র্রত্যয়` (লিগ্যাল অ্যান্ড জুরিসটিক কনসেপ্ট)। দ্বিতীয়টি `নৃতাত্ত্বিক ও জাতিতাত্ত্বিক সম্প্র্রত্যয়` (এথনিক অ্যান্ড রেসিআল কনসেপ্ট)।

বস্তুত নানা ফরমে জাতীয়তার পরিচয়ে `বাংলাদেশি` উল্লেখ শুধু ভুলই নয়; তা সংবিধান লঙ্ঘনেরও অপরাধ। এসব ফরম পূরণকারী প্রায় শতভাগ মানুষই জানে না, জাতীয়তার পরিচয় `বাংলাদেশি` লেখা ভুল। আর দু`চারজন সত্যটি জেনে যদি `বাঙালি` লেখে; তাহলে তারা আওয়ামী ঘরানার লোক হিসেবে অপচিহ্নিত হবে। এই যে সমস্যা, তা থেকে উত্তরণের পথ কী? সত্যটি জেনেও ইচ্ছাকৃত ভুল করে `বাংলাদেশি` লিখব, নাকি আঁতলামির পরিচয় মুখ বুজে সহ্য করে যথাশব্দ `বাঙালি` লিখব? যারা অবাঙালি অর্থাৎ জাতিগত সংখ্যালঘু, তারা ভুল শব্দ `বাংলাদেশি` লিখে যতই আত্মতৃপ্তি পাক না কেন, যথাশব্দ `বাঙালি` জানলে তারা কি তা লিখতে আত্মশ্নাঘা বোধ করবে না? তাহলে এ সমস্যার সমাধান কী?

সমস্যার সমাধানটি একেবারেই সহজ। সেটি হলো প্রয়োজনীয় সব স্থানে `জাতীয়তা`র স্থলে `নাগরিকত্ব` শব্দটি বসিয়ে তা `বাংলাদেশি` লিখে পূরণ করা। বস্তুত, সুদীর্ঘকাল ধরে রাষ্ট্রের প্রায় সর্বত্র এই অপ্রাসঙ্গিক শব্দ `জাতীয়তা` বসিয়ে কাজটি করা হচ্ছে। প্রত্যাশিত শব্দটি `নাগরিকত্ব`; তা `জাতীয়তা` নয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় এখন আসীন আওয়ামী লীগ। এটি সেই দল, যে দল বাহাত্তরের সংবিধানটি যেমন প্রবর্তন করেছে, তেমনই করেছে পঞ্চদশ সংশোধনীও। এই দলের চোখের সামনেই ঘটে চলেছে `জাতীয়তা বাংলাদেশি` লেখার লাখো-কোটি ভুল। ভুলের মধ্যে বসবাস কখনোই সুস্থতার পরিচয় বহন করে না। শেষ করছি মহাজ্ঞানী আইনস্টাইনের উদ্ধৃতি দিয়ে :`দুটি বিষয় অসীম। একটি মহাবিশ্ব, অন্যটি মানুষের আহাম্মকি। তবে মহাবিশ্ব যে সত্যি সত্যিই অসীম, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই।` আইনস্টাইন নিশ্চিত ছিলেন মানুষের আহাম্মকিতে। `নাগরিকত্ব :বাংলাদেশি` না লিখে `জাতীয়তা :বাংলাদেশি` লেখার আহাম্মকির যদি ইতিই ঘটে, তাহলে তার মন্তব্য সত্য হয় কীভাবে?

অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর