শুক্রবার ১৯ জুলাই, ২০১৯ ২২:২৯ পিএম


'গুচ্ছভিত্তিক' ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি কেন প্রয়োজন

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান

প্রকাশিত: ০৯:১৯, ৪ জুলাই ২০১৯  

প্রতি বছরের মতো ২০১৯ সালেও বাংলাদেশের সব স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে `গুচ্ছভিত্তিক` সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার একটি সমূহ সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলে আশা করা যায়। কেননা ইতিমধ্যে দেশের সব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। এটি অত্যন্ত খুশির একটি সংবাদ। আরও খুশির সংবাদ সমবৈশিষ্ট্যের মানদণ্ডে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গুচ্ছবদ্ধ করার প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ (যুগান্তর, ৪ মে ২০১৯)। প্রতি বছর কত হাজার ছেলেমেয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারেন না শুধু প্রচলিত `গোলল্গাছুট` পদ্ধতির কারণে, তার হিসাব কেউ করে না।

দুই. সত্যিকার অর্থেই প্রতি বছর আলোচনা হলেও শেষ দিকে এসে এটি আর সফল হয় না। ২০০৮ সালে শিক্ষা উপদেষ্টা ড. হোসেন জিলল্গুর রহমান সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের নিয়ে বৈঠকে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে আলোচনা শুরু করেছিলেন। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী উপাচার্যদের নিয়ে বৈঠক করেন। কিন্তু ওই বৈঠকে কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় অসম্মতি জানায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালেও এ বিষয়ে উপাচার্যদের সঙ্গে বৈঠক করে। ৭ জুলাই ২০১৩ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে উপাচার্যদের এক সভায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে আলোচনা হলে অধিকাংশ উপাচার্যই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছিলেন। কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের অজুহাতে আবারও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাগ্রহ ও আপত্তির কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগটি তখনও ভেস্তে যায়। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেরা সমন্বিতভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও সিলেটে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে তা ভেস্তে যায়। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদের কাছে দেওয়ার সময়ে আচার্য শিক্ষার্থীদের কষ্ট লাঘবে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। ২০১৭ সালের ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার সুপারিশ করা হয়। গত ১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইউজিসির চেয়ারম্যান বার্ষিক প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়ার সময় রাষ্ট্রপতি পুনরায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন।

তিন. সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বৈঠকে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের ভর্তিকালীন দুর্ভোগ কমাতে সমন্বিত সহজ ভর্তি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার গাইড লাইন তৈরি করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দুই কমিটি সমন্বয় করে ভর্তি পরীক্ষার নীতিমালা তৈরি করার কথা বলা হয়েছিল। কমিটিকে ১৫ এপ্রিলের (২০১৮) মধ্যে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নীতিমালা সংক্রান্ত ধারণাপত্র শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার কথা ছিল। রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্যের অভিপ্রায় মানে অলিখিত আইন, যা অখণ্ডনীয় বলে প্রতীয়মান হওয়াটাই কাম্য ছিল।

চার. গত বছর শিক্ষার্থী (প্রায় ১৩ লাখ ১১ হাজার ৫০০ জন) ও অভিভাবক (২৬ লাখ ২৩ হাজারজন) মিলে প্রায় ৩৯ লাখ ৩৪ হাজার ৫০০ জন মানুষের সঙ্গে বঞ্চনা করা হয়েছে। পূর্বের `গোলল্গাছুট` পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার অর্থ হলো, কোমলমতি শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের এক ধরনের অসহনীয় কষ্ট ও বিড়ম্বনার মধ্যে ফেলে দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিশ্চয় এবার নিম্নমধ্যবিত্ত, ভূমিহীন কৃষক, মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করা মা, দিনমজুর, রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, জেলে, কুমার, কামার, শ্রমজীবী মানুষের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে এগিয়ে আসবে। কেননা তাদের অনেকেই একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা নিয়ে যেমন ভাবেন না, তেমনি দিনাজপুর থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে খুলনা, খুলনা থেকে রাজশাহী, রাজশাহী থেকে সিলেট, সিলেট থেকে ঢাকা ঘুরে ঘুরে ভর্তি পরীক্ষার কথা কল্পনাও করতে পারেন না। এমনও হয় যে, সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন না।

পাঁচ. গুচ্ছভিত্তিক সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে কিছু বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন- ১. সাধারণ, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, কৃষি ও ভেটেরিনারি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি- এই চারটি গুচ্ছে ভাগ করে পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। তবে ডুয়েটে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের ভর্তি হওয়ার সুযোগ যেমন আছে, তেমন যেন থাকে, সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে এবং টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কম হওয়ায় যে কোনো একটি গুচ্ছের (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি) মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করলে ভালো হয়; ২. শিক্ষার্থী বাছাই মূল কাজ-সেটি বিবেচনায় রেখে `একগুচ্ছ, এক পরীক্ষা` পদ্ধতি করা; ৩. দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তির জন্য পছন্দের সময় শর্ত আরোপ করে দিতে পারে। শর্ত পূরণ না করলে শিক্ষার্থীরা ওইসব বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দে রাখতে পারবেন না বলে তারা ভর্তিও হতে পারবেন না। আর তাই এমন কথা কোনোভাবেই বলা যাবে না যে, ওমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা আলাদা ঐতিহ্য আছে; ৪. প্রত্যেক গুচ্ছের পরীক্ষার সব কার্যক্রম পরিচালনা করবে ওই গুচ্ছের সব বিশ্ববিদ্যালয়; ৫. প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিজস্ব পরীক্ষা কমিটি এবং প্রত্যেক গুচ্ছের একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি তৈরি করা যেতে পারে; ৬. ভর্তি পরীক্ষা যেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন দরিদ্র শিক্ষার্থীবান্ধব হয়, সেই দিকটি লক্ষ্য রেখে পরীক্ষার ফি, সময় ও স্থান নির্ধারণ করতে হবে; ৭. পরীক্ষার কেন্দ্র যেন পরীক্ষার্থীর পছন্দের নিকটবর্তী কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়; ৮. পছন্দক্রম অনুযায়ী এবং নিজ এলাকায় পড়তে পারে এমন মানদণ্ডের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইগ্রেশনের সুযোগ রাখা যেতে পারে; ৯. ফরমের মূল্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আলোচনাসাপেক্ষে নির্ধারণ করে নিতে পারে, যেন তা উভয়পক্ষের জন্য ভালো হয় এবং খুব বেশি না হয়; ১০. সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি সমধর্মী স্বায়ত্তশাসন বিধান প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অলঙ্কার। তাই ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সম্ভাবনার কোনো ক্ষেত্র যেন তৈরি না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে; ১১. প্রত্যেক গুচ্ছের মধ্যে পঠিত বিষয়ের বিভিন্নতা থাকায় যেন ইউনিট বেশি না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষার্থী বাছাই মূল কাজ- এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইউনিট যত কম করা যায়, তত উভয় পক্ষের জন্য মঙ্গল; ১২. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির আসন সংখ্যা (২৫-৫০ শতাংশ) বৃদ্ধি করা; ১৩. উচ্চতর গবেষণার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের বিষয়টি নতুন করে ভাবতে পারে।

সময়ের চাহিদার কারণে অনেক পুরনো ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। সবার জন্য যা কল্যাণকর তার সবকিছু উদারনৈতিকভাবে গ্রহণ করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষ মানবতার হাত প্রসারিত করলে এবং সংশ্লিষ্ট সবাই যথেষ্ট আন্তরিক হলে এবারই গুচ্ছভিত্তিক সমন্বিত পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব। গুচ্ছভিত্তিক সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে এবং স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রেখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অত্যন্ত আন্তরিকতা, মানবিকতা, মহানুভবতা এবং গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দেবে- সেই প্রত্যাশা ও স্বপ্ন আমরা দেখি। পাশাপাশি সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মান বৃদ্ধিকল্পে অত্যন্ত আন্তরিক হবে বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই।

[email protected]

পিএইচডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি গোপালগঞ্জ

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর