বুধবার ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ৫:২৯ এএম


'আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের এখনো মাইন্ড সেটের সমস্যা আছে'

প্রকাশিত: ১২:৫৪, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১১:৩৫, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

গত ৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট সম্মেলন কেন্দ্রে এডুকেশন রিপোর্টার্স আ্যাসোসিয়েশন-এর নব নির্বাচিত কার্যকরী পরিষদের অভিষেক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষার মান, সমস্যা ও সমাধান ,শিক্ষার্থীদের মানসিকতা এবং বিশ্বের সাথে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অসঙ্গতিসহ নানাদিক তুলে ধরেন। আলোচনাটি এডুকেশন বাংলার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো ।

জীবন চলার পথে সবকিছুই যে মানুষের ভালো থাকে তা না। ভালোর মধ্যও কিছু মন্দ থাকে।সেগুলো উত্তরণের সৎসাহস থাকতে হয়। কর্মক্ষেত্রে আমারও কমবেশি ভুলত্রুটি হতেই পারে। তবে ভালো কাজ করলে তার একটা স্বীকৃতি তো আশা করতেই পারি।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলাম দীর্ঘদিন। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই ফার্স্ট ইয়ারে। এ হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবন ছাত্র থেকে ধরলে প্রায় ৫০ বছর হয়ে গেছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অতীতের চেয়ে বর্তমানে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমি শিক্ষকতায় জয়েন করার করার পর একবারই ইউজিসিতে গিয়েছিলাম মনিরুজ্জমান মিঞা স্যারের নেতৃত্ব। বর্তমানে আমি ইউজিসির দায়িত্বে আছি।

তবে পূর্বে উপাচার্য যখন বিশ্ববিদ্যালয় সামলাতেই জীবন শেষ হয়ে যেতো তখন তাদের হালকা করার জন্য অবসরের আগে ইউজিসিতে পদায়ন করা হতো।তখনকার চেয়ারম্যানরা তত ঝামেলা জঞ্জাট মোকাবেলা করতে হতো না। আজকে যতটা করতে হয়।এটা আমারও ধারণা ছিলোনা।তবে জানতাম অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে এর মধ্যে ১০০টার বেশি প্রাইভেট। আন্তর্জাতিক, পাবলিকসহ মোটামোটি ১৫৩- ১৫৪টার মতো বিশ্ববিদ্যালয় আছে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি আরও নতুন বিশ্ববিদ্যালয় আসছে।সেটারও প্রস্তুতি আমাদের নিতে হচ্ছে। এ হিসাবে আমাদের ইউজিসির কর্মপরিধি অনেক বেশি। যার ফলে সমস্যা অনেক। সমস্যা থাকবেই। সব সমস্যা চলে যাবে তাতো না।একটা সমাধান করলে কিছু দিন পর আরেকটা সমস্যা আসে । এটাই লাইফ।সমস্যা আসবে সমস্যা ফেইস করতে হবে।সমস্যা ওভারকাম করতে হবে এবং আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতীর সত্যিকার অর্থে কোনো উন্নতি আসলেই হয় না। শিক্ষা হচ্ছে যেকোনো জাতীর মেরুদণ্ড।আমাদের জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু কিন্তু এ জিনিষটা ভালোভাবেই বুঝতেন। তিনি অনুধাবন করতেন শিক্ষা শক্তিশালী না করতে পারলে জাতীর মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্যই বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনায় ছিলো জাতীয় বাজেটের শতকরা ৪ ভাগ শিক্ষার জন্য বরাদ্দ রাখা। এটা কিন্তু আমরা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করতে পারিনি।অর্থাৎ তাঁর চিন্তাধারায় এখনো আমরা পৌঁছাতে পারিনি। আমরা জানি এখন কোয়ান্টিটির কোনো সমস্যা নাই। এখানে যে কথাটা আসছে দেশে শিক্ষা নিয়ে বিদেশে গিয়ে আমাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। আমাদের দেশের লোকদের বিদেশে গিয়ে প্রপার এমপ্লয়মেন্ট হয় না। আসলে আমাদের দেশে ছাত্র এবং অভিভাবকদের কিন্তু এখনো মাইন্ড সেটের সমস্যা আছে। এখনো ছাত্রদের মাইন্ড সেটের কোনো পরিবর্তন হয়নি।ছাত্রদের মাইন্ড সেট বলতে বুঝাতে চাচ্ছি একটা স্টুডেন্ট দেখলাম জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে চান্স পেলো পরে দেখা যায় সে ছেলেটাই কিংবা সেই মেয়েটাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতিতে ভর্তি হলো কিংবা উর্দুতে ভর্তি হলো।আমারতো মনে হয় এটা কোনো বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হলো না (আমি কোনো সাবজেক্টকে খাটো করে দেখছি না)। বিষয় বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ঐ ছেলেটা কিংবা মেয়েটা কর্ম ক্ষেত্রের সাথে যে সংশ্লিষ্ট বিষয় বাছা্ইয়ের চিন্তা করে নাই। তাদের কাছে এখনো মনে হয় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হতে পারছি এটাই মনে হয় সবচেয়ে বড় পাওনা। ভবিষ্যতের কথা তারা চিন্তা করে না।

আমেদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটা দূর্বলতা হচ্ছে বাইরের এম্প্লয়ভিলিটি। আমি ওস্টার্ন ওয়ার্ল্ডে দেখেছি আমাদেরই পাশে ইন্ডিয়ানসরা তবে ইন্ডয়ান্স বেশি বলবোনা সাউথ ইন্ডয়ান্স তারা জানে কোন সাবজেক্টের কি ডিমান্ড। আমি অস্ট্রেলিয়ায় যেয়ে দেখি নার্সিং এর অনেক ডিমান্ড। নার্সিং পড়লেই ইমিগ্রশন দিচ্ছে। আমাদের দেশে নার্সিং বলতে শুধু ফিমেইলকেই বুঝায়।সেখান নার্সিং হচ্ছে সংখ্যার ক্ষেত্রে হাফ মেইল নার্স হাফ ফিমেইল নার্স। আমাদের এখানে একটা ছেলেকে যদি বলি তুমি নার্সিং পড়, সে বলবে মাথা গরম হয়ে গেছে নাকি, আমি মেয়ে নাকি যে নার্সিং পড়বো। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেকোনো একটা সাবজেক্টে পড়বো। তবুও সে নার্স হবে না।সে নার্সিং পেশাকে সেভাবে দেখেনা। 

কিন্তু ওয়ার্ল্ডতো সেভাবে চলে না।যদি বিশ্বব্যাপী এম্প্লয়মেন্টের এডভানটেজ নিতে হয় আমাদের চিন্তাধারা পরিবর্তন করতে হবে।আমাদের সময় কেউ যদি ফার্মেসিতে পড়তো তাদের বলা হতে কম্পাউন্ডার । ফার্মেসি পড়ে কম্পাউন্ডার হয়ে কি লাভ? পড়লে ডাক্তারি পড়। কিন্তু পরে দেখা গেলো ফার্মেসিতে পড়ে সহজে আমেরিকা যাওয়া যায়, যখন আমেরিকাতে নেওয়া শুরু করলো, তারপর শিক্ষার্থীরা ফার্মেসির দিকে ঝুকে পড়লো।

আমাদের যে সমস্ত সাবজেক্ট পড়লে চাকরি হবে সে সমস্ত সাবজেক্ট বেছে নিতে হবে।আজকে কিন্তু আমরা সচেতন হচ্ছি।আজকে আমার ছাত্র যারা বের হচ্ছে তারা কিন্তু সব জায়গায় তাদের পাওয়া যায়। কাজের খোঁজে কিন্তু তারা সব জায়গায় যাচ্ছে।আগে কিন্তু আমাদের দেশেই ঢাকা শহরে আসতে চাইতে না কাজের খোঁজে বা কাজ করতে।

আমি কিছুদিন আগে আইসল্যান্ডে গিয়েছিলাম সেখানে গিয়ে দিখে বাংলাদেশীরা কাজ করছে। তার মানে কি আমাদের ছেলেরাতো বসে নাই। সমস্যা হলো তারা ইংরেজি প্রপারলি বলতে পারে না। যেখানে ভালো ইংরেজি বলতে পারেনা সেখানে সে লয়ার লেভেলে চাকরি করতে হচ্ছে।অপরদিকে সাউথ ইন্ডয়ান বা শ্রীলংকানরা কোয়ালিফিকেশনের দিকে সুপিরিয়র না, কিন্তু ইংরেজিটা সে বলতে পারে বা কমিউনিকেট করতে পারে বলে সে বেটার জব পাচ্ছে।সে হয়তে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের ভেতরের কাজ করছে।কিন্তু আমরা সে দিকে মনোযোগ দিচ্ছি না। আমাদের এডুকেশন সিস্টেমে আরও বেশি সচেতন হতে হচ্ছে।

আমার মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছি । ভবিষ্যতে আমাদের দক্ষ জনগোষ্ঠি প্রয়োজন হবে। ব্রিটিশ আমল থেকে দেখা গেছে দুই তিনটা প্রফেশনের প্রতি সব সময় একটা বিশেষ দূর্বলতা কাজ করে আমাদের সমাজে।তখন থেকেই এ পেশাগুলোকে ভিন্নভাবে দেখা হতো।তাদেরকে আর সবার সাথে মেলানো হতো না।একটা জুডিশিয়ারি আরেকটা একটা ছিলো এডুকেশন।তাদের টাকা পয়সা নাই কিন্তু তাদের সম্মান জ্ঞান তাদের শিক্ষা তাদের লেভেলটা আলাদা করে দিতো। সমাজ তাদের আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতো। আজকে আমাকে খুব দুঃখের সাথে বলতে হয় আজকে কিন্তু সেই অবস্থাটা আর নাই।আজকে আমরা বিভিন্ন পেশার সাথে নিজেকে মিলিয়ে ফেলছি।বর্তমানে আমাদের শিক্ষকতা পেশার মূল সমস্যা হচ্ছে লোভ।লোভ খেয়ে ফেলছে আমাদেরকে। সর্বস্তরে, সব জায়গায় সব ডিপার্টমেন্টে। যারা একটু বাকী ছিলো তারাও এর মধ্যে কাভারআপ করে ফেলছে। যার ফলে এখন আমাদের যে দায়িত্ববোধ সেটা আর নাই । স্কুলে আমরা কখনো টিউশনি করি নাই, টিউশনি নেই নাই।এখন বাংলার টিচার, অংকের টিচার, ইংরেজির টিচার ইতিহাসের টিচার সবাই টাকা কামানোয় ব্যস্ত । এতটুকু বাচ্চা যেন টিচিং কোচিং ছাড়া পড়ালেখায় উন্নতি করতেই পারে না।

আমরা আজকালকার মতো এত সুবিধা না পেয়েইতো উন্নতি করেছি, মানুষ হয়েছি। আমরা তো কম ইংলিশ বলতে পারি, তা তো না।আন্তর্জাতিক ভাবে আমাদেরতো কমিউনিকেট করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছেনা। আমরাতো দুর্বল পরিবেশ থেকেই শিখে আসছি।এখন আমাদের মফস্বল থেকে কি প্রডাক্ট পাচ্ছি? ঢাকা শহরের ছাত্ররাতো আগে বেস্ট ছিলো না।বেস্ট আসতো ঢাকার বাইরে থেকে।

আমাদের শিক্ষার্থীদের বেইজ বা ফাউন্ডেশন যদি দুর্বল থাকে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি শিখাবো নাকি তার সাবজেক্ট পড়াবো। আমাদের এডুকেশন সিস্টেমতো অনেক সমস্যা আছে।আমাদের হাত দিতে হলে দিতে হবে প্রাইমারি লেভেল থেকে। আমাদের প্রাইমারি লেভেল সেকেন্ডারি লেভেল ঠিক হয়ে গেলে হায়ার লেভেল অটোমেটিক ঠিক হয়ে যাবে।

এখন আমরা প্রস্তাব করছি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিছু টেকনিক্যাল সাবজেক্ট ওপেন করবো যে সাবজেক্টগুলোার সারা বিশ্বে চাহিদা আছে, ভবিষ্যতে এর চাহিদা তৈরি হবে। অর্থাৎ আমরা এখন রোবটিক্স, আটিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, আইটি এ সমস্ত সাবজেক্টগুলোর ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডে চাহিদা আছে । আমাদের দুঃখ হচ্ছে আমাদের দেশের শ্রমিকরা কাজ করে বিদেশ থেকে ১৫-১৬ বিলিয়ন ডলার পাঠায় আর আমরা এখানে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে তাদের আবার ৪/৫ বিলিয়ন ডলার দিয়ে দিচ্ছি।

সব শেষে আমি সাংবাদিকদের বলবো আপনারা শুধু নেগেটিভ নিউজ নয় পজিটিভ নিউজও করেন। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক আছে যারা শিক্ষার্থীদের ফ্রিতে পড়ায়, পুরনো দর্শন নিয়ে শিক্ষকতা করে। তাদের হাইলাইট করেন। আবার এমন শিক্ষকও আছে যারা দিনে তিনটা চারটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। সকাল আরম্ভ হওয়ার পরই বের হয়ে যায়। প্রথমে ইস্ট তারপর ওয়েস্ট তারপর নর্থ তারপর সাউথ নর্দান মানে সবই আছে তালিকায় আর কী।শিক্ষকতা একটা গুরুদায়িত্ব। এ পেশাকে সম্মানজনক রাখতে হলে শিক্ষকদের নিজ দায়িত্বটুকু সঠিকভাবে পালন করতে হবে।


এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর