শনিবার ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৭:৩৭ পিএম

Sonargaon University Dhaka Bangladesh
University of Global Village (UGV)

বন্ধ হচ্ছে অগ্রিম বদলি বাণিজ্য

সাব্বির নেওয়াজ

প্রকাশিত: ০৮:৫৫, ১৩ নভেম্বর ২০১৮   আপডেট: ০৯:০৯, ১৩ নভেম্বর ২০১৮

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পদ শূন্য হওয়ার আগেই অগ্রিম বদলির আদেশ জারির প্রক্রিয়া বন্ধ হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষক বদলির নতুন নীতিমালায় এটি কঠোরভাবে বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর এ-সংক্রান্ত নীতিমালা জারি হয়েছে।

বদলির মৌসুম শুরুর দু`মাস আগেই এবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি নির্দেশিকা জারি হয়েছে। কারণ, সারাদেশের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অগ্রিম বদলি নিয়ে ব্যাপক বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

অবসর আসন্ন এমন শিক্ষকের বিদ্যালয়ে সেই পদে বদলি হতে ইচ্ছুক শিক্ষকের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তারা অগ্রিম আদেশ জারি করেন- সারাদেশ থেকে এমন শত শত অভিযোগ পেয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ অভিযোগে এক বছরে পাঁচ শিক্ষা কর্মকর্তাকে গুরুদণ্ডও দেওয়া হয়। তারপরও থামেনি এ প্রবণতা। এবার নীতিমালা করে স্থায়ীভাবে এ ধরনের বদলি বাণিজ্য বন্ধ করার উদ্যোগ নিল মন্ত্রণালয়।

নতুন বদলি নীতিমালায় বলা হয়েছে- নিয়োগ পাওয়ার কমপক্ষে দুই বছর পার না হলে কোনো শিক্ষককে বদলি করা যাবে না। সমন্বয় বদলির ক্ষেত্রে চাকরিতে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের পছন্দকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা বদলি হতে না চাইলে কনিষ্ঠদের বদলি করা যাবে। কোনো শিক্ষক দুর্গম এলাকার (চর, হাওর, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অঞ্চল) একই বিদ্যালয়ে পাঁচ বছর কাজ করলে তাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদ শূন্য থাকা সাপেক্ষে একই উপজেলার সুবিধাজনক বিদ্যালয়ে বদলি করা যাবে। তবে কোনো শিক্ষক চাকরিরত অবস্থায় জীবনঘাতী ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসার সুবিধার্থে অন্যখানে বদলি করা যাবে।

নীতিমালায় বলা হয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩-এর ৩ ধারায় সংজ্ঞায়িত প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে  শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বদলি করা যাবে। শিক্ষকের সন্তান প্রতিবন্ধী হলে তিনিও এ সুবিধা পাবেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগে প্রেষণ বা সংযুক্তি-সংক্রান্ত পদায়ন করত মন্ত্রণালয়। নীতিমালার ইতিবাচক দিক হচ্ছে, মন্ত্রণালয় আর কোনো ধরনের বদলি করবে না। সব কিছু ন্যস্ত হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে। তিনি বলেন, আগে বদলির ক্ষেত্রে অনেক কড়াকড়ি ছিল। এখন যতটা সম্ভব শিথিল করা হয়েছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের বিষয়টি নীতিমালায় আনা হয়নি। তবে বিশেষ বিবেচনায় বদলি নিশ্চয়ই থেমে থাকবে না। তাছাড়া এটি হয়তো ভবিষ্যতে অন্তর্ভুক্ত হতেও পারে।

`সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক বদলি নির্দেশিকা-২০১৮` শীর্ষক এ নীতিমালায় আটটি ধারা এবং ৪২টি উপধারা আছে। জারিকৃত নীতিমালায় বর্ণিত সাধারণ, বৈবাহিক, প্রশাসনিক, সমন্বয়ের প্রয়োজন, সংযুক্ত এবং বিবিধ কারণে বদলি করা যাবে। বদলির সময়সীমা আগের মতোই জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস। তবে প্রশাসনিক ও সমন্বয়ের প্রয়োজনে সারা বছরই বদলি করা যাবে। এ ধরনের বদলির আদেশ দেবেন মহাপরিচালক। অন্যসব ক্ষেত্রে বদলির অধিক্ষেত্র সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এসব অধিক্ষেত্রের অধিকর্তা উপজেলা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং বিভাগীয় পরিচালক। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই), জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে থানা শিক্ষা কর্মকর্তাদের সুপারিশক্রমে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বদলি করা হবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, নদীভাঙন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শিক্ষকের বসতভিটা বিলীন হলে, প্রশাসনিক প্রয়োজনে, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কর্তৃক নিজ অধিক্ষেত্রে একই উপজেলায় কোনো বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুপাত সুষমভাবে বণ্টনের প্রয়োজনে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে বদলি করা যাবে। এসব নির্দেশনা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলার জন্য প্রযোজ্য হবে না। প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষকসহ প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা এ নীতিমালার আওতায় পড়বেন। এর আলোকে সংশ্নিষ্ট জেলার উপযোগী নির্দেশিক্ষা প্রণয়ন করা যাবে।

এতে আরও বলা হয়েছে, চাকরি পাওয়ার পর নারী শিক্ষকদের বিয়ে হলে স্বামীর কর্মস্থলের পাশের স্কুলে বদলি হতে পারবেন। প্রতিবন্ধী শিক্ষকদের স্থায়ী ঠিকানার আশপাশের স্কুলে বদলি করা যাবে। প্রতিবন্ধী সন্তানের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক বদলির সুযোগ থাকবে। স্বামী মারা গেলে বা বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সুবিধামতো স্থানসহ বিশেষ কোনো কারণে বছরের যেকোনো সময় বদলি হওয়া যাবে। দুর্গম এলাকায় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা চাকরির মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর নিজের এলাকায় বদলি হতে পারবেন। এসব বদলির জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও বিভাগীয় উপপরিচালকের সুপারিশ প্রয়োজন হবে। জাতীয়করণের সময় অনেক শিক্ষককে ভিন্ন জেলায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা প্রেষণে নিজের জেলায় পাঁচ বছর পর বদলি হতে পারবেন। তবে সাধারণ বদলির ক্ষেত্রে বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত আবেদন করা যাবে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গত বছর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকার সিটি করপোরেশন এলাকায় শিক্ষক বদলি কার্যক্রম স্থগিত ছিল। নতুন বদলি নীতিমালায় এ সিদ্ধান্ত বাতিল হওয়ায় এখন থেকে যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে শিক্ষকরা ঢাকা মহানগরের যে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য আসনে বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে কেবল বৈবাহিক কারণে বা জীবনসঙ্গীর চাকরিসূত্রে বদলি হওয়া যাবে। বিশেষ কারণে যে কোনো সময়ে বদলি করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ সুপারিশ করলে তাকে বছরের যে কোনো সময়ে বদলি করা যাবে।

শিক্ষকরা নিয়োগের পর বিয়ে করলে স্বামী বা স্ত্রী উভয়ের স্থায়ী ঠিকানায় বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে বিয়ের কাবিননামা, প্রত্যয়নপত্র, সংশ্লিষ্ট পৌর মেয়র/ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান/ ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র, স্বামী/স্ত্রীর স্থায়ী ঠিকানার জমির দলিল, খতিয়ান, বাড়ির হোল্ডিং নাম্বার (সিটি করপোরেশন এলাকার জন্য) ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রসিদ আবেদনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, সাধারণভাবে সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার বাইরে থেকে কেউ এই দুই ধরনের শহরে বদলি হতে পারবেন না। কেবল স্বামী বা স্ত্রীর চাকরির সুবাদে এবং ঠিকানা স্থায়ী হলেই কেউ সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার মধ্যে বদলি হতে পারবেন। চাকরির মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ না হলে কেউ বদলি হতে পারবেন না। এ ধরনের শিক্ষক পাঁচ বছরের মধ্যে দু`বার বদলির সুযোগ পাবেন না। কোনো উপজেলায়ই মোট পদের ১০ শতাংশের বেশি অন্য এলাকার শিক্ষককে পদায়ন করা যাবে না।

সূত্র : সমকাল

এনএইচ/

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর