সোমবার ২১ অক্টোবর, ২০১৯ ৪:৩৫ এএম


৫৩ তম বিশ্ব শিক্ষক দিবস-প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

অধ্যক্ষ মোঃ শাহজাহান আলম সাজু

প্রকাশিত: ২১:০২, ৪ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ২১:০৩, ৪ অক্টোবর ২০১৯

৫ অক্টোবর ৫৩তম বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৬৬ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধিদের এক সভায় প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জাতিসংঘের উদ্যোগে এবং ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত উক্ত সম্মেলনে শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ক একটি সুপারিশমালা গৃহীত হয়।

ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গ্যানাইজেশন(আইএলও) এই সুপারিশমালা অনুসমর্থন করে। এই সুপারিশমালাটিও মূলতঃ বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকদের জন্য রচিত হয়। উচ্চতর পর্যাযের শিক্ষকদের বিষয়টি সুপারিশে অন্তর্ভূক্ত হয়নি। পরবতীতে ইউনেস্কো এবং আইএলওর ১৯৭৭ এবং ১৯৯৮ সালে আরো দুইটি ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। ফলে সকল স্তরের শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা ও কর্তৃত্ব সমন্বয়ে ইউনেস্কো-আইএলও একটি অভিন্ন নীতিমালা তৈরি করে। এসব নীতিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তায় জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের উপর।

সুপারিশমালার মূল কথা হচ্ছে, সকল দেশের শিক্ষকগন উচ্চতর মর্যাদা ও বিশেষ অধিকার পাবেন। বিনিময়ে তারা শিক্ষার্থীদের প্রতি তথা দেশের প্রতি একনিষ্ঠ দায়িত্ব পালন করবেন। দেশ, জাতি ও সমাজের জন্য অপরিহার্য জ্ঞান সৃষ্টি ও বিতরণ করবেন। এ জন্য শিক্ষকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন করার অধিকার, শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় যেমন শিক্ষানীতি, সিলেবাস প্রণয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষকদের অধিকার প্রেক্ষিত বাংলাদেশঃ বাংলাদেশে শিক্ষার প্রচলন হয়েছিল সমাজের অভিজাত পরিবার ও বিত্তবানদের দ্বারা। তাদের প্রতিষ্ঠিত ‘পাঠশালা কেন্দ্রিক’ শিক্ষাই এদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভিত্তি হিসাবে বিবেচিত হয়। তখন সমাজের বিত্তবান পরিবারের সদস্যরাই শিক্ষকতা পেশার সাথে সম্পৃক্ত হন। সময়ের প্রয়োজনে কালের বিবর্তনের সাথে সাথে এদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রেও রূপান্তর, বিস্তার ঘঠেছে।
১৯৪৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত এদেশে স্বল্প সংখ্যক যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্য কোন বেতন ব্যবস্থা ছিল না। ১৯৪৪ সালে গাইবান্ধায় অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে শিক্ষকদের দাবির প্রেক্ষিতে তদানিন্তন শিক্ষামন্ত্রী স্কুল শিক্ষকদের জন্য ৫ টাকা বেতন চালু করেন। ষাটের দশকের প্রথম দিকে শিক্ষকদের মাসিক বেতন ২০ টাকা ধার্য করা হয়।
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারই পাকিস্তানী শাসন -শোষণে সৃষ্ট বৈষম্যে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রথম শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্থ সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থিক সংকটের কথা বিবেচনা করে ধাপে ধাপে শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশে ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে প্রথম রাষ্ট্রীয় বাজেটের আকার ছিল আট’শ কোটি টাকা। সেই বাজেটে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে ৩৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১ লাখ ৬২ হাজার শিক্ষক জাতীয়করণের আওতাভুক্ত হয়। সেই সাথে বঙ্গবন্ধু সরকারই বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের মাসিক বেতন ১০০ টাকা এবং স্কুল শিক্ষকদের বেতন ৭৫ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেওয়া শুরু করেন।

দ্রুত বিকাশমান বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষার গুরুত্বও বাড়তে থাকে। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার হারও বাড়তে থাকে। তবে কোন শিক্ষানীতি না থাকায় শিক্ষাক্ষেত্রে শৃংঙ্খলা ছিল না বিধায় শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধারা, যেমনঃ সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, ইংরেজী শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা(আলিয়া, কওমী) প্রভৃতি সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে মাদ্রাসা শিক্ষা ও ইংরেজী শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন নীতিমালাই ছিল না। ফলে স্ব-অর্থায়নে সারাদেশে ব্যাপক সংখ্যক কিন্ডারগার্ডেন, ইংলিশ মিডিয়াম এবং কওমী মাদ্রাসা গড়ে উঠে। এক্ষেত্রে সরকারেরও খুব বেশী নিয়ন্ত্রণ নেই। শেখ হাসিনায় সরকার ২০১০ সালে বহুকাঙ্খিত শিক্ষানীতি প্রণয়ণ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু করে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে কিছুটা শৃংঙ্খলা ফিরে আসে।
বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রায় ৯৮ শতাংশ বেসরকারি খাতে পরিচালিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রায় ত্রিশ হাজার এমপিওভৃক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর বাইরেও আরো সাত হাজার এমপিও বহিভূর্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যারা সরকার থেকে কোন বেতনই পায় না । বর্তমান সরকার ২০১২ সালে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেছে। এতে ১ লাখ ২ হাজার শিক্ষক সরকারি শিক্ষকের মর্যাদা লাভ করে।

বাংলাদেশে সরকারি বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক আর্থিক বৈষম্য রয়েছে। এমপিওভৃক্ত বেসরকারি শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলে শতভাগ বেতন পেলেও বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে এখনো বৈষম্য রয়েছে। তবে শেখ হাসিনা সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যেমন জাতীয় স্কেলে বেসরকারি শিক্ষকদের অন্তর্ভূক্তি, বার্ষিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, বৈশাখী ভাতা, কল্যাণ এবং অবসর বোর্ডের জন্য ১৬ শত ৭৪ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ প্রভৃতি গ্রহণ করায় বৈষম্য অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। তবে বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার গত দশ বছর শিক্ষা খাতে যে অবদান রেখেছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ পরিচালিত হয় গভর্নিং কমিটি কিংবা ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে। কমিটি সমূহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। রূঢ় বাস্তবতা হচ্ছে, কমিটির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর শিক্ষকদের চাকরি নির্ভর করে। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানসহ শিক্ষকরা পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, আন্তরিক নিষ্ঠা ও সতাতা সাথে দায়িত্ব পালনের চেয়ে সব সময় চাকরির আতঙ্কে ভূগতে থাকেন। এ ছাড়া বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে বিপুল ফান্ড থাকে। অনেকের দৃষ্টি থাকে সেই ফান্ডের দিকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সমাজের অনেক বিতর্কিত ব্যক্তিরাও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কমিটিতে ঢুকে পড়ে। তাদের অযাচিত, অনৈতিক হস্তক্ষেপে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অরাজকতা সৃষ্টি হয়।

কমিটির সদস্যরা যদি সৎ ও আদর্শবান না হয় তাহলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। ফলে শিক্ষকদের মর্যাদা ও শিক্ষার মান ভুলন্ঠিত হয়। এসব কারণে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির দৌরাত্ব বন্ধ করাসহ শিক্ষকদের চাকরির নিশ্চয়তা বিধান এবং শিক্ষার গুনগতমান নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি । আবার শুধুমাত্র জাতীয়করণ হলেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এমনটা ভাবা ঠিক নয়। সরকারকে অত্যন্ত ভেবেচিন্তে সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করতে হবে। যাতে জাতীয়করণের সুফল জাতি পায়। একই সঙ্গে শিক্ষক সমাজকেও শিক্ষকতার মহান দায়িত্ব পালনে আরো কর্তব্য সচেতন, ন্যায়নিষ্ঠ, সৃজনশীল, উদার মানবিকতা সম্পন্ন এবং নিবেদিত প্রাণ হতে হবে। অবশ্য ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে জাতীয়করণ করা হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ দ্রুত গতিতে অর্থনৈতিক অগ্রগতি লাভ করলেও শিক্ষা ক্ষেত্রে এখনও পর্যাপ্ত বরাদ্দ সুনিশ্চিত হয়নি। জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থা ‘ইউনেস্কো’ ঘোষিত জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপি’র ৮ শতাংশ এবং সর্বশেষ ডাকারে অনুষ্ঠিত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের সভায় আপাতত জিডিপি’র ৬ শতাংশ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ সরকার স্বাক্ষর করলেও এ যাবৎ জিডিপি’র ২.৩-২.৪ শতাংশের বেশি বরাদ্দ সরকার দিতে পারেনি।

১৯৬৬ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত সভায় শিক্ষকদের উচ্চতর মর্যাদা ও বিশেষ অধিকারের পাশাপাশি দেশ জাতির জন্য অপরিহার্য ‘জ্ঞান সৃষ্টি ও বিতরণ’ এর কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। শিক্ষকরা সেই জ্ঞান সৃষ্টি ও বিতরণ কতটুকু করতে পারছেন সেই প্রশ্ন ও এসে যায়। তথাপিও শিক্ষকদের অধিকারের পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সর্ম্পকে সচেতন থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে শিক্ষকতা শুধুই একটি চাকরি নয়। শিক্ষকরা সুনাগরিক গড়ার কারিগর। এটি এমন একটি পেশা যা সমাজে সবচেয়ে সম্মানীত। শিক্ষকরাই সকল বাধা বিঘ্ন দূর করে একটি জাতিকে অন্ধকারে আলোর পথ দেখাতে পারেন।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজ সহ বিশ্বের সকল শিক্ষকদের প্রতি নিরন্তন শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা রইল।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ,
সেক্রেটারী, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব টিচার্স এসোসিয়েশন (WFTU)
সচিব, বেসরকারী শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট, শিক্ষা মন্ত্রণালয়

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর