বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ৪:১০ এএম


২২০০ ছাত্রীর ৬টি বাথরুম, কোচিং বাধ্যতামূলক

রাকিব উদ্দীন

প্রকাশিত: ১১:০১, ১৯ জানুয়ারি ২০২০  

বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, অগ্নিকন্যা কল্পনা দত্ত, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ভারতী রায়, সাহিত্যিক মৈত্রেয় দেবী, ভারতীয় বিজ্ঞানী শোভনা ধরের মতো অনেক বিশ্বখ্যাত মানুষ এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। বিদ্যালয়টি চট্টগ্রামের প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। ফলাফলের দিক দিয়ে এখনও চট্টগ্রাম তথা দেশের অন্যতম সেরা এই বিদ্যালয়ে অবকাঠামো সমস্যা প্রকট। বিদ্যালয়ে নেই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা। পানি সরবরাহের ট্যাংক ব্যবহূত হচ্ছে নতুন ভবনে পানি দেওয়ার কাজে। রয়েছে শ্রেণিকক্ষ সংকট, বেঞ্চ সংকটও প্রকট। শ্রেণিকক্ষ ও মিলনায়তনের ২৮টি ফ্যান ও ২১টি বাতি অকেজো। অভিভাবকদের বিশ্রামাগার না থাকায় প্রতিদিন শত শত অভিভাবক বিদ্যালয়ের সামনে সড়কের ফুটপাতে বসে সন্তানের জন্য অপেক্ষা করেন। বিদ্যালয়ের ২ হাজার ২০০ জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে ছয়টি বাথরুম। তার মধ্যে একটি পরিত্যক্ত। খেলার মাঠ নিয়ে রয়েছে বিরোধ। মানহীন টিফিন দেওয়ার অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। অভিভাবকরা জানান, কিছু শিক্ষক তাদের সন্তানদের কোচিং করার জন্য চাপাচাপি বরেন।

স্কুলের বয়স পেরিয়েছে শত বছর : উনিশ শতকের ব্রাহ্ম আন্দোলনের অন্যতম নেতা অন্নদাচরণ খাস্তগীরের নামে বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়। অন্নদাচরণের জামাতা চট্টগ্রামে সামাজিক আন্দোলনের পথিকৃৎ যাত্রামোহন সেন তার শ্বশুরের স্মৃতি রক্ষায় জন্য ১৯০৭ সালে নগরীর জামালখানে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। একই বছর সরকারি বিদ্যালয় হিসেবে ঘোষিত হয় এটি। বর্তমানে চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এটি একটি। পিএসসি, জেএসসি এবং এসএসসি পরীক্ষায় এই বিদ্যালয়ের অবস্থান সবসময় উপরের দিকেই থাকে।

যাদের পদচারণায় মুখরিত ছিল ক্যাম্পাস : ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, অগ্নিকন্যা কল্পনা দত্ত, বিখ্যাত উপন্যাস `ন হন্যতে`-এর লেখিকা মৈত্রেয় দেবী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ভারতী রায়, সাংবাদিক সুচরিতাসহ অসংখ্য দেশবরেণ্য গুণীজন এই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন।

সহশিক্ষা কার্যক্রম :বিদ্যালয়ে রয়েছে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ, প্রাত্যহিক সমাবেশ ও শরীরচর্চা, সাংস্কৃতিক ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান গণিত অলিম্পিয়াড, গার্ল গাইড, রেড ক্রিসেন্ট, শিক্ষা সফর ও বনভোজন, জাতীয় দিবস, ই-লার্নিং ব্যবস্থা, কম্পিউটার শিক্ষা, বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ পালন, বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, কানেক্টিং ক্লাসরুম প্রজেক্ট, গ্রিন ক্লাব কার্যক্রম।

বখাটেদের উৎপাত : একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, প্রায় সময় বখাটেদের দ্বারা ইভটিজিংয়ের শিকার হন তারা। এ সমস্যা দিনদিন প্রকট হচ্ছে। অথচ এই সমস্যা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। প্রশাসন চাইলে কি এসব বন্ধ করতে পারে না?

খেলার মাঠ নিয়ে বিরোধ : বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, `দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের মাঠ নিয়ে ভূমিদস্যুদের সঙ্গে অনেকদিন ধরে বিরোধ চলছে। তারা চাইছে বিদ্যালয়ের মাঠ দখল করে আখের গোছানোর জন্য। তারা আমাদের হুমকি-ধমকি দিয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেয়। আমরা শেষ পর্যন্ত লড়ে যাব। প্রশাসন ও সবার সহযোগিতায় মাঠটি আমরা শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করতে পারব। মাঠটি যেন ডাক্তার খাস্তগীরের নামে চিরদিন থাকে এ ব্যাপারে আমরা প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা কামনা করছি।`

ঘুরে না ফ্যান জ্বলে না বাতি : সরেজমিন দেখা যায়, একাডেমিক ভবন-১ এবং ২-এর সব কয়টি শ্রেণিকক্ষ এবং মিলনায়তনে ২৮টি ফ্যান অকেজো, ২১টি বৈদ্যুতিক বাতি নষ্ট। শিক্ষার্থীরা বলছেন, বেশিরভাগ শ্রেণিকক্ষে মান্ধাতা আমলের ফ্যান চলছে। এই ফ্যানগুলো কয়েকদিন পরপর নষ্ট হয়ে যায়। ঠিকমতো বাতাসও পাওয়া যায় না। শ্রেণিকক্ষে আলো কম। আমরা চাই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের জন্য ফ্যান ও বাতির সংকট দূর করে দেবেন।`

বাথরুম সংকট ও বেসিন সমস্যা : সরেজমিন দেখা যায়, বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন-১ এবং একাডেমিক ভবন-২ মিলিয়ে ২ হাজার ২০০ জন শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ছয়টি বাথরুম। এর মধ্যে একাডেমিক ভবন-২-এর একটি বাথরুম পরিত্যক্ত। সেখানে নেই বেসিনও। শিক্ষার্থীরা বলছেন, মাঝে মধ্যে বাথরুমগুলোয় পানি সরবরাহ করা হয় না। ফলে নোংরা থাকে।

নিরাপদ পানির সংকট প্রকট: বিদ্যালয়ে সুপেয় ও নিরাপদ পানির সংকট তীব্র। সরেজমিন দেখা যায়, বিদ্যালয়ের পানি সরবরাহের ট্যাংক ব্যবহূত হচ্ছে নতুন ভবনে পানি দেওয়ার কাজে। ফলে অনেকদিন ধরে শিক্ষার্থীরা সুপেয় ও নিরাপদ পানি পান থেকে বঞ্চিত। শিক্ষার্থীরা বলছেন, `আমাদের বিদ্যালয়ে পানির সমস্যা গুরুতর। এ সমস্যা সমাধানে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আমাদের দাবি, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেন আমাদের জন্য খুব শিগগিরই ফিল্টারিংয়ের মাধ্যমে সুপেয় ও নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা করে।`

মানহীন টিফিন : শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করে মানহীন টিফিন। মাঝে মধ্যে দেওয়া হয় পচাবাসি টিফিনও। শিক্ষার্থীরা বলেন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইলে কি আমাদের জন্য বাজেট বাড়িয়ে ভালো টিফিন সরবরাহ করতে পারে না?

নেই অভিভাবক বিশ্রামাগার: সরেজমিন দেখা যায়, অনেক অভিভাবক বিদ্যালয়ের বাইরে সন্তানদের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। তাদের জন্য নেই নির্দিষ্ট কোনো বসার স্থান। অনেক অভিভাবক দাঁড়িয়ে কেউবা আবার পেপার মুড়িয়ে মাটিতে বসে সন্তানদের জন্য অপেক্ষা করেন। অভিভাবকরা বলেছেন, অনেক কষ্ট করে দূর-দূরান্ত থেকে আমরা সন্তানদের স্কুলে নিয়ে আসি। ছুটি হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়। বিশ্রামাগার না থাকায় আমাদের ফুটপাতেই বসে থাকতে হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি, কর্তৃপক্ষ যেন আমাদের জন্য বিশ্রামাগারের ব্যবস্থা করে দেয়।

অভিভাবকরা বলেন, সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাই মানুষের মতো মানুষ হওয়ার জন্য। কিন্তু কিছু কিছু শিক্ষক তাদের কোচিং সেন্টারে কোচিং করার জন্য জোর করেন। কোচিং না করলে শ্রেণিকক্ষে নানাভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। মাঝে মধ্যে অস্বাস্থ্যকর টিফিন খেয়ে আমাদের সন্তানরা অসুস্থ হয়ে যায়।

সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষা ও প্রকৌশল দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জালাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, `বিদ্যালয়টির যাবতীয় সমস্যার সমাধান অতিসত্বর করে দেওয়া হবে। আমরা সমস্যা সমাধানে বদ্ধ পরিকর।`

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শাহেদা আক্তার বলেন, `কোচিংয়ের ব্যাপারে আমার কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। আমাদের কিছু অবকাঠামোগত সমস্যা আছে। স্কুলের মাঠ নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে। তা কবে সমাধান হবে সেটা নিয়ে আমরা দ্বিধান্বিত আছি। বখাটেদের উৎপাত বন্ধ করার জন্য প্রশাসনের সহায়তা প্রয়োজন। যত সমস্যা আছে তা সমাধান করার জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো।` -সমকাল

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর