সোমবার ২৭ জানুয়ারি, ২০২০ ২:৪৭ এএম


সরকারি সুবিধা না পাওয়ার আতঙ্কে ১২ হাজার শিক্ষক

নিজামুল হক

প্রকাশিত: ০২:১৪, ১৩ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৫:০৯, ১৩ জানুয়ারি ২০২০

প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের গেজেট প্রকাশের পর সবাই ‘সরকারি কলেজের শিক্ষক’ হিসেবে পরিচিতি পেলেও এখনো জোটেনি সরকারি সুযোগ-সুবিধা। সর্বশেষ সরকারি হওয়া কলেজের শিক্ষক তারা। জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এক শ্রেণির কর্মকর্তার উদাসীনতায় তারা যথাসময়ে আত্তীকরণ হতে পারেননি। ফলে সরকারি কলেজের শিক্ষক হয়েও আত্তীকরণ না হওয়ার বেদনা নিয়েই দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে বেসরকারি থেকেই অবসরে চলে গেছেন। কলেজ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় এদের চেহারায় ছিল ক্ষোভের কান্না।

২০১৬ সালে সাভার কলেজ সরকারি হয়। অন্যান্য শিক্ষকের মতো ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকেরও স্বপ্ন ছিল সরকারি শিক্ষক হিসাবে অবসরে যাবেন; কিন্তু ২০২০ সালের জানুয়ারিতে এসে যখন তিনি অবসরে যান তখনো সরকারি হতে পারেননি। এতে আর্থিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হন তিনি। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে রেজাউল করিম সিদ্দিক বলেন, ‘এই মাসে এই কলেজের আরো তিন জন শিক্ষক অবসরে যাবেন। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর আন্তরিকভাবে কাজ করলে হয়তো অনেক আগেই শিক্ষকরা সরকারি (আত্তীকরণ) হতে পারত।’ ক্ষোভ প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছুই বলার নেই তার।

সম্প্রতি কয়েক ধাপে সরকারি করার আদেশ জারি হয় মোট ৩০২টি কলেজের। জাতীয়করণকৃত এসব কলেজে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার। এর মধ্যে শিক্ষকের সংখ্যা ১২ হাজার ৩৫৬ এবং কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। এদের মধ্যে অনেকেই সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন। -ইত্তেফাক

জানা গেছে, সরকারিকরণের জন্য সর্বশেষ কলেজ তালিকাভুক্ত হয় তিন বছর আগে ২০১৬ সালের আগস্টে। তবে সরকারিকরণের আদেশ জারি হয় গত বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে। এই দীর্ঘ সময়েও কেন এসব শিক্ষকের আত্তীকরণ সম্ভব হলো না—এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ঐ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মাউশির উদাসীনতায় কাজে বিলম্ব হয়েছে। যারা আত্তীকরণ চাননি, নন-ক্যাডার শিক্ষকদের দেখতে পারেন না তাদের হাতেই আত্তীকরণের কাজ। তারাই কাজে বিলম্ব করেছেন। আগামী দেড় বছরেও এ কাজ শেষ হবে কি না—তা নিয়ে তিনি সন্দিহান।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেছেন, মাঠ থেকে মাউশির যে সব কর্মকর্তা যাচাই-বাছাই করছেন তাদের তথ্যে অনেক ভুল রয়েছে। এ কারণে নতুন করে যাচাই-বাছাই করতে হচ্ছে। আর এ কারণে আত্তীকরণে বিলম্ব হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তারা আরো বলেছেন, মাঠ পর্যায়ে তথ্য যাচাই-বাছাইকালে মাউশি ৫২ ধরনের সমস্যা চিহ্নিত করে। সেখান থেকে মন্ত্রণালয় আটটি সমস্যা চিহ্নিত করে। তবে সমস্যা চিহ্নিত করলেও তারা সমাধানের কোনো উদ্যোগ বা সিদ্ধান্ত নেয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) বেলায়েত হোসেন তালুকদার জানান, পদ শূন্য ছিল কি না, সংশ্লিষ্ট পদে প্রার্থীর যোগ্যতা ছিল কি না এবং নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছিল কি না—এই তিনটি বিষয় দেখে জনবল আত্তীকরণ করা হবে। প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে, নাকি আত্তীকরণের গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে শিক্ষকরা সুবিধা পাবেন সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আগামী এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এই কর্মকর্তা আরো জানান, বর্তমানে ২২৫টি ফাইল মন্ত্রণালয়ে আছে। মন্ত্রণালয়ের চারটি গ্রুপে এগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। ২২টি প্রতিষ্ঠানের ফাইল যাচাই-বাছাই শেষে ইতিমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী ২০১৬ সালে কলেজ জাতীয়করণের ঘোষণা দিলেও আত্তীকরণ বিধিমালায় আপত্তি জানান শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যরা। এর নেতৃত্বে ছিলেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির কয়েক জন শীর্ষ নেতা। আত্তীকরণের বিরোধিতা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার কারণে প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করতে পারেননি তারা। তবে আত্তীকৃত শিক্ষকরা যাতে তাদের মতো ক্যাডার মর্যাদা না পান—সে দাবিতে ক্লাস বন্ধসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জিম্মি করে রাখেন তারা। ‘নো বিসিএস নো ক্যাডার’ দাবি সামনে এনে আদালতে রিট মামলা করেন সমিতির মহাসচিব শাহেদুল খবীর চৌধুরী, যিনি বর্তমানে মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন)। এই কর্মকর্তার হাতেই এখন এসব শিক্ষকের আত্তীকরণের মূল যাচাই-বাছাইয়ের কাজ। এ ব্যাপারে জানতে তার ফোনে ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে বারবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এদিকে আন্দোলন ও রিটের কারণে দুই বছর দুই মাস দেরি করে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই নতুন সরকারিকৃত কলেজশিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা-১৮ জারি করা হয়। এতে বলা হয়, নতুন সরকারি হওয়া কলেজশিক্ষকরা নন-ক্যাডার মর্যাদা পাবেন। আগের বিধিতে ক্যাডার মর্যাদা দেওয়া হতো। এরপর ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের জিও জারি করা হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কয়েক জন কর্মকর্তা ও আত্তীকরণের অপেক্ষায় থাকা শিক্ষকদের অভিযোগ, যারা আত্তীকরণ এবং এসব শিক্ষকের ক্যাডারভুক্ত হওয়ার বিরোধিতায় ছিলেন তারাই এখন আত্তীকরণের জন্য যাচাই-বাছাই করছেন। তারা ইচ্ছে করেই যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ভুল করছেন। ধীরগতিতে কাজ করছেন। এ কারণেই আত্তীকরণে বিলম্ব হয়েছে ও হচ্ছে।

সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির (সকশিস) সভাপতি মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, কিছু কর্মকর্তার নানা বাহানা ও দীর্ঘসূত্রতার জন্য সরকারিকরণের সুযোগ-সুবিধা থেকে শিক্ষক-কর্মচারীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, শিক্ষক আত্তীকরণ নিয়ে মাউশির কাজ প্রায় শেষ। হাতে গোনা কিছু কাজ বাকি আছে। এখন বাকি কাজ করবে মন্ত্রণালয়।

 

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর