বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ৯:২১ এএম


১১তম গ্রেড: বৈষম্য নিরসন না হয়ে চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করছে

মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ

প্রকাশিত: ১০:৪৪, ১৭ এপ্রিল ২০১৯   আপডেট: ১০:৫৩, ১৭ এপ্রিল ২০১৯

সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য নিরসনে এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মহোদয় যতই বলুন সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড প্রদান করা হবে, বাস্তবতা কিন্তু তা বলে না। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাপ্ত সচিব মহোদয়সহ কর্মকর্তাগণের মতামতের প্রেক্ষিতে যা প্রতীয়মান হয়; তাহলো প্রাথমিক শিক্ষকদের বৈষম্য নিরসন না হয়ে চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে।

ভবিষ্যতে বৈষম্য শুধু প্রধান শিক্ষকদের সাথে নয় বরং প্রধান শিক্ষকদের সাথে সহকারী শিক্ষকদের, সহকারী শিক্ষকদের সাথে সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেলেও বৈষম্য বিরাজ করবে যদি আলোচিত বেতন কাঠামোয় প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয় এবং নতুন পদ সৃষ্টি করে ওই পদের জন্য নতুন স্কেল নির্ধারণ করা হয়।

একটু পেছনে যাওয়া যাক। গত ৪ এপ্রিল, ২০১৯-এর গেজেট অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ হবে উপজেলা/থানা অনুযায়ী। নীতিনির্ধারকগণের ইচ্ছা অনুযায়ী যদি সহকারী শিক্ষকদের ১২ তম গ্রেড এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক নামের নতুন পদ সৃষ্টি করে ১১তম গ্রেড প্রদান করা হয় তাহলে কী কী বৈষম্য সৃষ্টি হবে তা একটু দেখা যাক।

নতুন পদ সৃষ্টি করে নতুন স্কেল দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো ঐ পদে সরাসরি নিয়োগের পথ তৈরি করা। যদি সরাসরি ২০%- ৩৫% সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয় তাহলে বর্তমানে সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দিবাস্বপ্ন হয়ে যাবে। কারণ নতুন পদে নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষকরা বর্তমানে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের উর্ধ্বতন হিসেবে বিবেচিত হবেন। প্রধান শিক্ষক পদে তাদের পদোন্নতি না দিয়ে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির কোন সুযোগ থাকবে না।

আবার যদি সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতি দিয়ে ১১ তম গ্রেড প্রদান করা হয়; তা হলে তাও হবে সহকারী শিক্ষকদের সাথে একধরণের তামাশা। একজন শিক্ষক ১২ তম গ্রেডে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেতে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগবে। ১২ তম গ্রেডের একজন সহকারী শিক্ষক ১০ বছর পর উচ্চতর গ্রেড পেয়ে ১১ তম গ্রেডে বেতন পাবেন এবং ১৬ বছর পর উচ্চতর গ্রেড পেয়ে ১০ম গ্রেডে বেতন পাবেন। তখন ১০ম গ্রেডের একজন সহকারী শিক্ষককে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দিয়ে ১১ তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ কতটুকু যুক্তিযুক্ত? সৃষ্ট পদ হওয়ায় ওই পদে পদোন্নতির পর করেসপন্ডিং এর কোন সুযোগ নেই। তার মানে এটাই দাঁড়ায়, সহকারী শিক্ষকদের ১১ তম অবরুদ্ধ করার জন্যই সহকারী প্রধান শিক্ষক পদের সৃষ্টি!

আবার কোন সহকারী শিক্ষক যদি ১৫ বছর চাকরি করার পর সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পান তাহলে ১০ বছরের উচ্চতর গ্রেড অর্থাৎ ১১ তম গ্রেডে বেতনপ্রাপ্ত অবস্থায় তাঁকে আবার ১১তম গ্রেডের পদে পদোন্নতি প্রদান করা হয়; তাহলে তিনি নতুন পদে যোগদান করায় পরের বছর ১৬ বছর পূর্তিতে যে ১০ম গ্রেডে বেতন পাওয়ার কথা ছিল। তার জন্য তাঁকে আরো ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। তখন তাঁকে জুনিয়রের চেয়ে নিচের স্কেলে চাকরি করতে হবে। পদে বড় কিন্তু স্কেলে সহকারী শিক্ষকের নিচের স্কেল!

একজন সহকারী শিক্ষক যেখানে ১৬ বছর পর ১০ম গ্রেডে বেতন পাবেন সেখানে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত একজন শিক্ষকের ১০ ম গ্রেডে বেতন পেতে সময় লাগবে ২৫ থেকে ২৬ বছর। এই বৈষম্য কীভাবে সমাধান হবে? আবার উপজেলা ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের ফলে কোন উপজেলায় ১০ বছর পর পদোন্নতি হয় আবার কোথাও ২০ বছরেও পদোন্নতির সুযোগ হয় না।

ধরা যাক, একটা উপজেলায় ১০ বা ১১ বছরে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেয়ে ওই শিক্ষক পাশের উপজেলায় বদলি হয়ে আসেন; যেখানে ২০/২৫ বছরে পদোন্নতির সুযোগ হয় না। তখন বর্তমান উপজেলায় এসে উনি তার চেয়ে ১০/১৫ বছর পূর্বে নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকের বস হিসেবে পরিগণিত হবেন; যা ২০/২৫ বছর সহকারী শিক্ষক পদে চাকুরী করে পদোন্নতি না পাওয়া সহকারী শিক্ষকের জন্য লজ্জাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। তাই এই মুহূর্তে সহকারী শিক্ষকদের উচিত সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক হয়ে অধিকার আদায়ে কাজ করা।

প্রধান শিক্ষকগণ ১০ গ্রেডে বেতন পান; তা আমরা সহকারী শিক্ষকরা যেমন চাই তেমনি বেতন বৈষম্য নিরসনে সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণে সবার সহযোগিতা একান্ত কাম্য।


প্রধান শিক্ষক সমিতির নেতা বদরুল আলম স্যারের একটা স্ট্যাটাস নিয়ে আমাদের অনেক সহকারী শিক্ষক ক্ষোভ ঝাড়ছেন। কিন্তু উনি তো সহকারী শিক্ষদের ১১ তম গ্রেড দিচ্ছেন না বা সহকারী শিক্ষদের গ্রেড দেওয়ার ওনার কোন ক্ষমতাও নেই। বরং যিনি দিতে পারবেন সেই পরম শ্রদ্ধেয় সচিব মহোদয়ের সাথে সরাসরি আলাপ করে বদরুল স্যার যা জেনেছেন; তাই তাঁর স্ট্যাটাসে তুলে ধরেছেন। এই বিষয়টা আমরাও জানি। সহকারী শিক্ষকদের আন্দোলন দমিয়ে রাখতে প্রধান শিক্ষকদের ১০ম আর সহকারী শিক্ষকদের ১১ তম গ্রেড এর কাজ শুরু হয়নি মন্ত্রণালয়ের এমন পরিপত্র জারি কালক্ষেপণ ছাড়া কিছুই না।

অনেকেই বলবেন কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা আসছে না কেন? কিন্তু কর্মসূচি ঘোষণা করলে কতজন তা পালন করেন? উপরন্তু যারা কর্মসূচি পালন করেন তাদের অনেককেই কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়তে হয় যার উদাহরণ আমিসহ সহকারী শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ। সর্বশেষ রোষানলে যিনি পড়লেন তিনি হলেন সহকারী শিক্ষক সমিতির বান্দরবান জেলা সভাপতি পারভিন আক্তার। সহকারী শিক্ষদের পক্ষে গত ১৪ই মার্চ, ২০১৯ খ্রি. মানববন্ধনসহ যৌক্তিক কর্মসূচি পালনের কারনে কতিপয় সমিতির নেতাদের ষড়যন্ত্রে তাঁকে পৌরসভার স্কুল থেকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রশাসনিক বদলি করা হয়েছে যেখানে যেতে উনার প্রায় ৩ ঘন্টা সময় লাগবে এবং যাত্রাপথে বন্য হাতির আক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে।

এই অবস্থায় একটাই পথ খোলা রয়েছে তাহলো- সকল জেলায় উপজেলায় বেতন বৈষম্য নিরসন কমিটি তথা ১১তম গ্রেড বাস্তবায়ন কমিটি করে দাবি আদায়ে একে অপরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা।

ঐক্যের প্রশ্নে বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির অতীতেও সম্মতি ছিল; এখনো আছে। শুধু সম্মতিই নয়, উদ্যোগীও আমরাই ছিলাম এ ব্যাপারে। এই উদ্যোগ বরাবরই ছিল সহকারী শিক্ষকদের স্বার্থে। তবে ঐক্য করার পর আবার কোন খোঁড়া অজুহাতে তা ভেঙে দেওয়া কিছু লোকের স্বভাব; যার ফলে আজ পর্যন্ত আমরা দাবি আদায়ে ব্যর্থই রয়ে গেলাম। কিন্তু সেসব ভুলে এখনও আমরা ঐক্যে সহমত।

তাই যারা আন্দোলন করার জন্য ফেইসবুকে অনেক আবেগময় স্ট্যাটাস দেন; তাদের বলব- আগে নিজ নিজ জেলা, উপজেলার নেতাদের মতামত নিন। তারপর করণীয় সম্পর্কে যা যা মতামত আছে সবই লিখুন। দাবি আদায়ে যেকোন কর্মসূচি, যেকোন পরিস্থিতিতে কতজন পাশে থাকবেন; তা আগে নিজ নিজ জেলা, উপজেলায় একমত হন। তারপর কেন্দ্রীয় নেতাদের পরামর্শ দিন। না হলে সহকারী শিক্ষকদের ভাগ্যাকাশে কালোমেঘই প্রতীয়মান থাকবে। যা করার দ্রুত করতে হবে।

লেখক: মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ

সভাপতি, বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর