বৃহস্পতিবার ০২ এপ্রিল, ২০২০ ১১:০২ এএম


হাসপাতালে দুর্নীতি: অধ্যাপকসহ যে দেড়শ জনের নাম দুদকের হাতে

মিজান মালিক

প্রকাশিত: ১০:৫৩, ১২ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১০:৫৭, ১২ জানুয়ারি ২০২০

সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন অফিসের কেনাকাটায় দুর্নীতিতে জড়িত ১৫০ জনের তালিকা ধরে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ওই তালিকার অনেকের নাম যাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ১৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির বিস্তার ঘটায় বলে দুদকের অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটা ও নিয়োগসহ ১১টি খাতের দুর্নীতি থামাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে দুদক।

এদিকে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন অফিসের কর্মকর্তাদের শনাক্ত করতে উচ্চ পর্যায়ের তিনটি কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যেসব কর্মকর্তা ঘুষ কিংবা অর্থের বিনিময়ে অসাধু ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকার ক্ষতিসাধন করেছেন তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে তাদেরও। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাশাপাশি মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত এ কমিটি তিনজন যুগ্মসচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কাজ করছে।

তদন্তে সরকারি কর্মকর্তা ছাড়াও যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অর্থের বিনিময়ে কাজ বাগিয়ে নিয়েছে তাদের তালিকা প্রণয়ন করা হবে। ৩০ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয় থেকে এ কমিটি গঠন করা হয়। এর আগে ১৩ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে দেয়া এক চিঠিতে স্বাস্থ্য খাতের নৈরাজ্য ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে দুদক। স্বাস্থ্য খাত নিয়ে দেশে বড় চক্রান্ত চলছে উল্লেখ করে চিঠিতে দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়।

এছাড়া দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সহায়তায় কাজ নিয়ে যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জনগণের স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে প্রতারণা করেছে সেসব প্রতিষ্ঠান যেন কোনো টেন্ডারে অংশ নিতে না পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ারও অনুরোধ করা হয়েছে। অপরদিকে দুদকের চিঠির সূত্র ধরেই স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রাথমিক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জনগণের স্বাস্থ্যসেবার অর্থ তছরুপ করেছে তাদের ছাড় দেয়া হবে না। তিনি বলেন, আমরা এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছিলাম। মন্ত্রণালয় যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে দুর্নীতিবাজ অনেকের নামই বেরিয়ে আসবে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে দুদক থেকেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দুদকের একজন দায়িত্বশীল পরিচালক জানান, তিনজন যুগ্মসচিবের নেতৃত্বে তিনটি কমিটি কাজ শুরু করে দিয়েছে। তারা দুদকের কাছে চিঠিও দিয়েছে। কিছু তথ্য-উপাত্ত চেয়েছে। কতজনের বিরুদ্ধে মামলা আছে, কতজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধান চলমান রয়েছে তা জানতে চেয়েছে। দুদক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের একটি তালিকা তৈরির কাজ করছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি স্বাস্থ্য অধিদফতরেও চিঠি দিয়ে কতজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তা জানতে চেয়েছে বলে জানা যায়।

সূত্র জানায়, দুদকের স্বাস্থ্য খাতের ১৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যে নাম রয়েছে, এর মধ্যে অন্তত ৩০ জন চিকিৎসক এবং মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৭-৮ জন অধ্যক্ষ রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে দুদক সবার নাম এখনই প্রকাশ করছে না। দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত সেল এবং গোয়েন্দা ইউনিটের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলেছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদফতরে ২৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পৃথক চিঠি দেয় দুদক।

চিঠিতে বলা হয়, স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীন বিভিন্ন কার্যালয়ে কিছু দুর্নীতিবাজ, স্বেচ্ছাচারী ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে চাকরি করার সুবাদে দুর্নীতির শক্তিশালী বলয় তৈরি হয়েছে। এটি স্বাস্থ্য অধিদফতরের সুশাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। দুদকে তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে অনেক অভিযোগ জমা হয়েছে, যা দুদকের গোয়েন্দা ইউনিটের অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। এমন অবস্থায় এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে জরুরি ভিত্তিতে অন্যত্র বদলির ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়।

যে ২৩ কর্মকর্তার বিষয়ে বলা হয়েছে তারা হলেন- স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের সহকারী প্রধান (পরিসংখ্যানবিদ) মীর রায়হান আলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক হাসান, প্রধান সহকারী আশরাফুল ইসলাম, প্রধান সহকারী সাজেদুল করিম, উচ্চমান সহকারী তৈয়বুর রহমান, উচ্চমান সহকারী সাইফুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের কার্যালয়ের প্রধান সহকারী ফয়জুর রহমান, প্রধান সহকারী মাহফুজুল হক, কম্পিউটার অপারেটর আজমল খান, ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান, প্রধান সহকারী-কাম হিসাবরক্ষক আবদুল কুদ্দুস, সিলেটের স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের কার্যালয়ের প্রধান সহকারী নুরুল হক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা গাউস আহমেদ, উচ্চমান সহকারী আমান আহমেদ, অফিস সহকারী-কাম কম্পিউটার অপারেটর নেছার আহমেদ চৌধুরী, খুলনা স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের কার্যালয়ের ব্যক্তিগত সহকারী ফরিদ হোসেন, অফিস সহকারী মো. মাসুম, প্রধান সহকারী আনোয়ার হোসেন, বরিশাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের কার্যালয়ের প্রধান সহকারী মো. রাহাত খান, উচ্চমান সহকারী জুয়েল, রংপুর স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী আজিজুর রহমান, স্টেনোগ্রাফার সাইফুল ইসলাম ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম।

দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক টিমের অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির যে ১১ খাত চিহ্নিত করা হয়েছে সে বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরকে অনুরোধ করেছে দুদক। গত সপ্তাহে এই চিঠি পাঠানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, দুদকের প্রতিবেদন প্রকাশের পর ৮ মাস অতিবাহিত হলেও দুদক জানতে পারছে না কি ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দুদকের প্রতিবেদনে উঠে আসা দুর্নীতির অন্যতম হচ্ছে- স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও ওষুধ কারসাজি। প্রতিবেদনে এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশও করা হয়।

এদিকে দুদক সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণায়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ৩৪ জনের একটি তালিকা করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তারা হলেন- স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (চিকিৎসা-শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. এমএ রশিদ, স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) অধ্যাপক ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন, গোপালগঞ্জের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল, গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্টোর অফিসার নাজিম উদ্দিন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের আবদুল মালেক, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিসাবরক্ষক ইমদাদুল হক, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ল্যাব সহকারী আবদুল হালিম, ঢাকা মেডিকেল কলেজের সচিব আনোয়ার হোসেন, কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের পরিচালক মো. আজাদ, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজের সচিব সাইফুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মো. শাহজাহান, রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিসের ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাব সহকারী আনোয়ার হোসেন, কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের হিসাবরক্ষক আবদুল মজিদ, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ল্যাব সহকারী সুব্রত কুমার দাশ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিসাবরক্ষক আবদুল্লাহেল কাফি, বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিসাবরক্ষক এটিএম দুলাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মহিউদ্দিন মারুফ, স্বাস্থ্য অফিদফতরের স্টোর ম্যানেজার হেলাল তরফদার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা হুমায়ুন চৌধুরী, জালাল উদ্দিন, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আলিমুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী প্রধান পরিসংখ্যানবিদ মীর রায়হান আলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা (পরিচালক স্বাস্থ্য বিভাগ, স্বাস্থ্য অধিদফতর) ফারুক হাসান, প্রধান সহকারী আশরাফুল ইসলাম, সাজেদুল করিম, উচ্চমান সহকারী তৈয়বুর রহমান, উচ্চমান সহকারী সাইফুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য অধিদফতরের উচ্চমান সহকারী মো. ফয়জুর রহমান, জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহমুদুজ্জামান, স্বাস্থ্য অধিদফতরের অফিস সহকারী তোফায়েল আহমেদ, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মুজিবুল হক মুন্সী ও অফিস সহকারী কামরুল ইসলাম।

দুদক বলছে, সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ওষুধ, সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেট স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের চক্রান্তে জড়িয়ে পড়েছে। তারা সিন্ডিকেট করে জনসাধারণের জন্য করা সরকারের বাজেটের ৭০-৮০ ভাগই হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের দুর্নীতির কারণে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ১২ ডিসেম্বর দেয়া চিঠিতেও ১৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের নৈরাজ্য ও দীনতা তুলে ধরেছে সরকারের কাছে।- যুগান্তর

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর