শনিবার ৩০ মে, ২০২০ ১৩:৫৮ পিএম


হারিয়ে যাওয়া রিসার্চ পেপার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২:৫২, ১৩ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১২:৫৫, ১৩ এপ্রিল ২০২০

জগদীশ গুপ্তের কথাসাহিত্য নিয়ে হায়াৎ মামুদ স্যারের তত্ত্বাবধানে এমফিল-এর কাজটা তখন পুরোদমে চলছে। চার-পাঁচটি চ্যাপ্টার লেখা শেষ। কাপাসিয়া থেকে ঢাকা এসেছি। উচ্চ নম্বরের সিঁড়ি প্রকাশনার মালিক জিএম শাহজাহান ভাইকে লেখা পৌঁছে দেব। বিএ ক্লাসের জন্য গাইড বইয়ের লেখা। রাতে আজিমপুরে বিপ্লবদের বাসায় থাকব এবং পরদিন সকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে হায়াৎ মামুদ স্যারের হাতে চ্যাপ্টারগুলো পৌঁছে দিয়ে ওই পথেই কাপাসিয়া ফিরব।

আজিমপুর থেকে লক্করঝক্কর মার্কা একটি ভাঙা বাসে চড়ে গাবতলী এসে নামলাম। গাবতলী থেকে যে গাড়িতে আরোহণ করলাম উহাকে লক্করঝক্কর মার্কা বললেও কম বলা হবে। মুড়ির টিন বলে পরিচিত একদম ভাঙা গাড়ির চেয়েও খারাপ। তার উপর ভেতরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। একটি পলিথিন ব্যাগে আমার গবেষণাপত্রগুলো। আমি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার বাঁদিকে একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ টেট্টনের সাদা লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি পরে বসা। কৌটা থেকে নিয়ে কিছুক্ষণ পর পর মুখে পান পুরছে। আর তার পাশে বসা মহিলাকেও দিচ্ছে। মহিলার বয়স তার চেয়েও বেশি হবে। দেবর-ভাবী সম্পর্কজাত আড্ডা দিয়ে ও ঠাট্টামস্করা করে যাচ্ছে দুইজন সমানে। ড্রাইভার মাঝেমধ্যে ব্রেক কষে। খুব আকর্ষিকভাবে কেন তাকে ব্রেক কষতে হয় জানি না। আর যাত্রীগণ সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ড্রাইভার এবং হেল্পারদের যাচ্ছে তাই গালাগাল দেওয়ার একটা সংস্কৃতি আমাদের দেশে আছে। খুবই পুরনো সংস্কৃতি। এই বাসের যাত্রীরাও ড্রাইভারকে ধুমছে গালাগাল দিয়ে যাচ্ছে। আর ড্রাইভাররাও প্রতিনিয়ত এইসব গালাগাল শুনে এতই অভ্যস্ত যে এতে তারা মোটেই মাইন্ড করে না। অধিকন্তু এইসব মধুসম্ভাষণ না হলে তারা যেন শরীরে জুইত পায় না। ড্রাইভার তার মতোই গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগল। এই সময় ওই টেট্টন লুঙ্গি সদাশয় লোকটি আমাকে বলল, "আমনের ব্যাগটা আমার আতো দিয়া জুইত কইরা খাড়ন। পইড়া যাইতেছন তো বারবার।"

একটু দ্বিধা হলেও তার হাতে ব্যাগটি দিয়ে "জুইত কইরা খাড়ইলাম"। এবং ঘণ্টা খানেক পরে যথারীতি আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেটে নেমে গেলাম।
প্রান্তিক গেটে নেমে কোনো প্রাক্তন ছাত্র যদি চা-সিগারেট না খায় তা হলে সে ডেইরিফার্ম গেটে নামলেই পারে। কিংবা সে ওই জাতের ভদ্রলোক যে হল, ক্যান্টিন আর ক্লাস ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কিছুই চিনে না কিংবা ওই তিনটি স্থান ছাড়া অন্যত্র আড্ডাকে ফালতু সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই ভাবে না। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি ওই জাতের ছাত্র ছিলাম না। ওই জাতের শিক্ষকও হতে পারিনি।

কয়েকজন অনুজের সঙ্গে চা-সিগারেট পর্ব শেষ করে আমার মনে হলো গত দুই বছরে গবেষণাকর্ম টেট্টন লুঙ্গি লোকটির কাছে রেখেই আমি নেমে পড়েছি। একশ পৃষ্ঠার উপরে লেখা হারিয়ে ফেলে থুক্কু দিয়ে আবার লিখতে বসে যাব, সেই ধৈর্য, সুস্থিরতা ও সক্ষমতা কিছুই আমার নেই। সুতরাং আমার উচ্চ শিক্ষার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখানেই শেষ হলো।
আমার নামেই একজন দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলাম, "মিতা, ঘটনা তো একখান ঘটে গেল। কী করা যায়।"
মান্নান আবহাওয়াবিদদের মতো "সম্ভাবনা আছে", "হতে পারে", "সম্ভাবনা নেই" এরকম অনিশ্চয়তাবাচক কোনো কথা না বল সোজা বলল, "মান্নান ভাই, আপনার রিচার্স পেপারগুলো পাবেন। এই বাসটার শেষ স্টপেজ নবীনগর। আপনি সোজা নবীনগর চলে যান। পেয়ে যাবেন।"
আমি নবীনগর চলে গেলাম। ওই পুরুষ ও মহিলাকে খুঁজতে লাগলাম। গাড়ি থেকে নেমে এই শ্রেণির মানুষের গতিবিধির একটা গড়ন সম্পর্কে আমি চিন্তা করতে লাগল। যারা প্রচুর পান খায় তাদের চা ও সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস থাকে। আমি বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি চায়ের দোকানে ওনাদের খুঁজতে লাগলাম। এমনই একটি টংয়ের দোকানে মহিলাকে আমি পেয়ে গেলাম। আমার মনে হলো, পেয়ে গেলাম! আশ্চর্য। এ যেন একদম পেয়ে যাওয়া একটি ব্যাপার হলো। আমার নিরন্তর দুই বছরের সাধনা নয়।

আমি মহিলাকে বললাম, "চাচি, একটু আগে আপনে ঢাকা থেকে আইছেন না ---।" আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই সে বলল, "বাবা, আমনের ব্যাগটা তো রইস মিয়ার দোকানে। আমনে কোন সময় নাইম্মা গেলেন। দেখলাম না তো। গাড়ির থিকা নাইম্মা অনেকক্ষণ আমনের লইগা খাড়ইয়া আছিলাম।"

রইস মিয়ার লুঙ্গির দোকান খুঁজে পাওয়া গেল। সে তার ছেলেকে দিয়ে ব্যাগটি গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে।
মানুষের নির্বুদ্ধিতা দেখে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। যেখানে তার দোকানটি হলো সবচেয়ে নিরাপদ এবং সহজলভ্য সেখানে কোন বুদ্ধিতে ব্যাগটা সে গ্রামে পাঠিয়ে দিল তা কিছুতেই আমার বোধগম্য হচ্ছে না।

তার নির্দেশনা মতো আমি ধলেশ্বরী নদীতে গিয়ে নৌকায় উঠলাম। প্রায় এক ঘণ্টা লাগল ওই বাড়িতে পৌঁছাতে।
নৌকায় ওঠে আমি খুব প্রশান্তি বোধ করতে লাগলাম। ক্ষীণ স্রোতের স্বচ্ছতোয়া জলের নদী। চিরকালের প্রশান্তি, সুস্থিরতা আর মমত্ববোধ নিয়ে এই জল যেন অনন্তকাল ধরে তৃষ্ণার্ত বঙ্গভূমিকে পরিতৃপ্ত করে আসছে। আর জেলে, কৃষক, ব্যবসায়ী, গৃহবধূ ও দুরন্ত শিশুদের কত বিচিত্র জীবন যে এই জলের সঙ্গে প্রবাহিত হয়ে চলছে তার কি কোনো ইয়ত্তা আছে! অনেক দিন পরে নদীর দুই পাড়ের অফুরন্ত সৌন্দর্যের সঙ্গে আবার আমি চলতে লাগলাম। শৈশবে বাবার সঙ্গে, চাচাদের সঙ্গে, বড় ভাইদের সঙ্গে কতবার আমি নৌকায় চড়েছি। বাজারে গিয়েছি, আম কাঁঠাল ইলিশ মাছ মিষ্টি নিয়ে ভাই-বোনদের শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছি, আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছি। তখন ওই খালের, বিলের, নদী তীরের যত বৃক্ষ যত লতা-পাতা ঝোপঝাড় সবকিছুকেই মনে হতো জীবন্ত। খুব অযত্নে শুকনো খালে খুব করে যে ঘাঘরায় ছয়লাপ হয়ে যেত তার ফুলটা, কাঁটাওয়ালা বিচিটা কী যে মূল্যবান ছিল! আর বাঁশঝার থেকে খুব সতর্কতার সঙ্গে বেরিয়ে আসা বেজিটা যখন আমাদে একদম কাছে দিয়ে দ্রুত কোথায় গিয়ে লুকাত তখন মনে হতো পৃথিবীতে এর চেয়ে আশ্চর্যের আর কিছু হতে পারে না।

এখন আর বাঁটফুল নিয়ে, আসশেওড়া নিয়ে, ঘাঘার বিচি নিয়ে, হাতিশুঁড় নিয়ে খেলি না। কোথায় গেল শাপলা শালুক পদ্ম আর কোথায় বা গেল হিজল, সোনালু, চালতা আর কড়ই ফুল। এই ধলেশ্বরীর জলে শৈশবের সেই প্রাণের কোলাহল শুনতে শুনতে এগুয়ে যেতে যেতে বিস্তীর্ণ দুই পাড়ের অসংখ্য ঝোপঝাড় ও বৃক্ষরাজির গোপন এক আহ্বান যেন আমার অস্তিত্ব জুড়ে বিস্তার লাভ করছিল। নদীর একদম পারে ছাতিম গাছটির মগডালে বসে যে সাদা বকটি দোল খাচ্ছিল কতদিন পরে ওর সঙ্গে দেখা হলো আমার। সেই কবে ডাহুকের পেছনে, বকের পেছনে, কাক আর শকুনের পেছনে দৌড়িয়েছি। ওরা আমাদের একদমই পাত্তা দিত না। খুবই অবহেলা করে একটু উড়াল দিয়ে কয়েক হাত দূরে গিয়ে বসত এবং আবার আমাদের দিকেই হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে আসত। ঘুমের মধ্যে রাত কেটে গেলেও প্রকৃতির এই বিপুল আপনজনদের ছাড়া দিন কিছুতেই কাটত না। অথচ সেই আমি কীভাবে যেন সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। সবই আছে অথচ কিছুই নেই। নেই যে তা ভাববারও সময় নেই। বহুদিন পরে ধলেশ্বরীর স্নিগ্ধ জলের ছোট ছোট ফুল্ল ঢেউ ভেঙে ভেঙে মিষ্টি এক ধ্বনিময়তার মধ্যে আমি ফিরে পেলাম আমার বিপুল প্রাণের শৈশবে।
সংবিৎ ফিরে পেলাম মাঝির চিৎকারে। “কই যাইবেন ভাই? ওই তো পোড়াবাড়ি বাজার। রইস দালালের বাড়ি ওই মসজিদটার পাশে।”

রইস মিয়ার লুঙ্গির দোকানের খোঁজ এর মধ্যেই পেয়েছি। সে কাপড়ের ব্যবসায়ী। এখন তার আরেকটি পরিচয় পাওয়া গেল, সে দালাল। কিন্তু কীসের দালালি করে রইস মিয়া তা আর জানার সুযোগ হলো না। আমাকে নেমে যেতে হলো ধলেশ্বরীরর পারে একটি পুরোনো হিজল গাছের গোড়ায়।

ওই বাড়িতে গিয়ে আমি হতভম্ব। নদীর পাড়ে বিচ্ছিন্ন একটি বস্তি যেন বাড়িটি। দোচালা ছনের একটি ছোট ঘর। তার পাশে একচালা ছনের ছাউনি। চারদিক উদাম। ওর ভেতরে একটি মাটির চুলা। ওই ছাউনির নিচে গর্তের মতো জায়গায় আরাম করে একটি কুকুর ঘুমাচ্ছে আর দুটি ছাগলছানা কুট কুট করে খড়বিছালি চিবোচ্ছে। ঘরের সঙ্গে লাগোয়া কয়েকটি বাঁশের খুঁটি। ওই খুঁটির সামনে একটি মাঝারিগোছের নান্দার (মাটির গামলা) মধ্যে ভাতের মার আর কুটিকুটি কর কাটা কলাগাছের ডগা ভিজিয়ে রাখা হয়েছে। গোরুর এই জলখাবার কবে ভিজিয়ে রাখা হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। শুধু পচা ও বাসি গন্ধে চারদিকটা নষ্ট হয়ে আছে। পাশেই একটি বাঁশের আড়ার মধ্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে তেলচিটকানো দুটি কাঁথা, মরচের দাগ ও তিল পড়া একটি পুরোনো শার্ট। একটি ছেড়া লুঙ্গির অর্ধেক ওই নান্দার মধ্যে পড়ে আছে। একটি মুরগি আট-দশটি ছানা নিয়ে কিতকিত কিতকিত করে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর এখানে ওখানে ঠোকর দিয়ে ছানাদের দিকে খাবার এগুয়ে দিচ্ছে। কয়েক বার আমি ডাকলাম বাড়িতে কেউ আছেন কি না। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। একটু উঁকি দিয়ে দেখেই বুঝতে পারলাম যে ওই ছোট ছনের ঘরটিতে কেউ নেই। আমার সন্দেহ হচ্ছে, এই বাড়ি ওই রইস মিয়ার হতে পারে না কিছুতেই।

জনশূন্য এই বাড়িটিতে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। বিচিত্র গন্ধের যে ককটেল তৈরি হয়েছে, অভ্যস্তদের জন্য তা নিশ্চয়ই নেশাকর। কিন্তু আমার মতো আগন্তুকের জন্য তা অসহ্য। সুতরাং একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। নদীর তীরে পশ্চিমে তাকিয়ে দেখি একটি করঞ্চা গাছ। আমি যতটুকু জানি করঞ্চা নিম্নাঞ্চলের উদ্ভিদ। আমাদের চাঁদপুরে এই ঘনবদ্ধ পাতায় সমৃদ্ধ মনোরম গাছটি খুব দেখা যায়। উত্তরের এই উষ্ণ অঞ্চলে করঞ্চা বিরল গাছ। নদীর তীর ঘেঁষে এই বিরল করঞ্চা গাটির নিচে গিয়ে আমি দাঁড়ালাম এবং ওই বাড়িটির দিকে লক্ষ রাখতে লাগলাম।

অনেকক্ষণ পরে পঁয়ত্রিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সের একজন মহিলা একটি ছাগল ও একটি মেয়ে শিশু টানতে টানতে ওই বাড়িটির দিকে আসছিল। ছাগলটি অকাশ বিদীর্ণ করে বে বে করছিল আর মেয়ে শিশুটি কথা আর কান্না একাকার করে মহিলার হাত থেকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। এরই মধ্যে মেয়েটি তার মুক্ত বাঁ হাত দিয়ে একটি ঢিল ছুঁড়ে মারল নদীতে ভাসমান এক ঝাঁক হাঁসের দিকে। ক্ষীণ স্রোতের প্রতিকূলে মন্থর গতিতে এই আনন্দভ্রমণে আকস্মিক ঢিল এসে পড়ায় ওরা চমকে যায় এবং একসঙ্গে সবাই লাফিয়ে ওঠে পানিতে আলোড়ন তৈরি করে। সেই দৃশ্য দেখে শিশুটি ফিক করে হেসে দেয়। কথা আর কান্নার মধ্যে এমন হাসি যে দেখেনি পৃথিবীতে তার দেখবার অনেক কিছুই বাকি আছে। ওই হাসির মধ্যে আমি পৃথিবীর সব রূপ অনুভব করলাম। আমার মনে হলো, এমন সুন্দর হাসি যে বাড়িতে নিত্য ফোটে সেই বাড়ির চেয়ে সুন্দর বাড়ি আর কোথায়ও নেই।

আমি ওই বাড়িতে গলাম এবং মহিলার কাছে বিস্তারিত বললাম। মহিলা বলল, "হ হ, পোলাডা আইছে। ওই যে, ওই বিল্লালেগো বাইত। অর আতো একটা পেলাস্টিকের ব্যাগ আছে। আইয়া পরব এহনই।"
আমার আর অপেক্ষা সয় না। ক্ষুধায় মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এখন ব্যাগটি পেয়ে গেলেই প্রস্থান করতে পারি। ভালোমন্দ যাই হোক, প্রান্তিকে গিয়ে খাওয়া যাবে।
পাতলা সুতি কাপড়ের হাফ প্যান্ট পরা ছোট মেয়েটি আমার কাছাকাছি ঘুরছে। তার হাঁটু অবধি চুল। প্রগাঢ় কালো চোখ। পৃথিবীর সব কৌতূহল আর মায়া আর আনন্দ যেন ওই চোখ দুটিতে এসে ভর করেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, "তোমার নাম কী সোনা?"

সে নাম না বলে লজ্জার হাসি হেসে আমার থেকে আর একটু দূরে ছাগল ছানা দুটির কাছে চলে গেল।
আমি বললাম, "বাহ্, তুমি তো অনেক মিষ্টি মেয়ে। তোমার চুলগুলো এত সুন্দর। আর তোমার হা---"
আমার কথা শেষ করতে পারলাম না। মেয়েটি বলল, "আমার নাম বুতি।"
ফোকলা দাঁতের মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে সে যখন খেতের দিকে আল বরাবর দৌড় দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখনই ঘর থেকে ঢাক আসে, "বুতি বুতি, তোর ভাইয়েরে ডাককা ল্ইয়া আয়।"
কিন্তু বুতির আর যেতে হয় না। ঘরের পেছন থেকে স্বর ভাঙা গলায় একজন কিশোর মাকে ডেকে বলছিল, "মা মা, বেডায় কই।" আপাদমস্তক বৈশিষ্ট্যহীন ওই কিশোরের হাত থেকে ব্যাগটি নিয়ে বুতির হাতে বিশটি টাকা পুরে দিয়ে আমি প্রস্থান করি।

নয়ার হাট বাজারে রইস মিয়ার বড় লুঙ্গির ব্যবসা। পোশাক-পরিচ্ছদে ও শরীর-স্বাস্থ্যে রইস মিয়ার মধ্যে অবস্থাসম্পন্ন মানুষর পরিচয় আছে। কিন্তু ঘরবাড়ি, স্ত্রী ও পুত্র-কন্যার মধ্যে চরম দারিদ্র্যে দশা। এর পেছনে অন্য কোনো জীবন আছে নিশ্চই। সেই জীবনের পরিচয় আমার জানা নেই। আমার উচ্চশিক্ষার উচ্চাকাঙ্ক্ষা যে রক্ষা পেল এতেই আমি আনন্দদিত।*

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর