মঙ্গলবার ০২ জুন, ২০২০ ৩:৫৬ এএম


হাত ধুতে ধুতে পানি ফুরিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের

শামীম জোয়ার্দ্দার

প্রকাশিত: ০৫:৫৪, ১৯ মে ২০২০   আপডেট: ০৭:৪৪, ২০ মে ২০২০

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। আগে থেকেই তীব্র পানি সংকটে ছিল বিশ্ব। তার ওপর আবার করোনাভাইরাস। ঘণ্টায় ঘণ্টায় হাত ধোয়ার জ্বালা। আরও জটিল করে তুলেছে পানি সংকট।

ভূ-গর্ভের একেবারে শেষপৃষ্ঠে যেটুকু ছিল বারবার হাত ধুতেই তা শেষ হয়ে যাচ্ছে। করোনা মহামারীর শুরু থেকেই বিশ্ব ব্যাংক, জাতিসংঘ, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার রিসোর্স ইন্সটিটিউট, ওয়াটার রিসোর্স ইন্সটিটিউট (ক্যালিফোর্নিয়া) প্রায় গলা খেঁকিয়েই কপাল ঘামানো এ সংকটের জানান দিচ্ছে। দুদিন আগে দক্ষিণ এশিয়াতেই তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ দেখাল ভারত।

বিহারের এক কোয়ারেন্টিন সেন্টারে পানির জন্য হাতাহাতির ছবি ভাইরাল হয় গোটা বিশ্বে। পানির অভাবে খাল-বিলের পানি দিয়ে হাত ধুচ্ছে ঘানার উত্তর অঞ্চলের মানুষ। শুধু হাত ধোয়াই নয়, সুপেয় পানির মতোই পান করছে সেই নোংরা-অপেয় পানি।

চলতি শতকের শুরু থেকেই বিশ্বে প্রকট আকার ধারণ করেছে পানি সংকট। বড় বড় মহাদেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ইতোমধ্যে ভূ-গর্ভস্থ মজুদে টান ধরেছে। পানির প্রাপ্তি ও সরবরাহ ক্রমেই কমে আসছে। হাত ধোয়ার জন্য সামান্য পানিও পাচ্ছে না কোটি কোটি মানুষ।

সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো। পানির ঘাটতির কারণে এসব অঞ্চলে করোনার মহামারী আরও বাজে আকার নিচ্ছে।

সবচেয়ে বড় সংকটে রয়েছে আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ আফ্রিকা, ইথিওপিয়া, জিম্বাবুয়ে, সোমালিয়া, কেনিয়া ও সুদানসহ বেশ কয়েকটি দেশ। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, নেপাল প্রভৃতি দেশ। (ফরেন পলিসির প্রতিবেদন)

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, আফ্রিকার সাব-সাহারা মরু শহরগুলোর করোনার ঝুঁকিতে থাকা ৬৩ শতাংশ মানুষেরই এখন পানির মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। মহামারীর প্রচণ্ড তাণ্ডবের মধ্যেও হাত ধোয়ার মতো পানি পাচ্ছে না তারা।

এছাড়া এই অঞ্চলের ৭০-৮০ ভাগ পানির গুণগত মান খুবই বাজে, হাত ধোয়ার উপযোগী নয়। ফলে বাঁচার তাগিদে বাধ্য হয়েই সুপেয় পানি দিয়েই হাত ধুতে হচ্ছে তাদের। ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় পানির সরবরাহ সমস্যা নতুন নয়।

এখানে মাঝে মাঝেই একটানা কয়েক দিন ধরেই ট্যাপে কোনো পানি থাকে না। মহামারীর মধ্যে পানির অভাবে নজিরবিহীন ঝুঁকির মুখে পড়েছে শহরের ৪৮ লাখ অধিবাসী। এক ও অভিন্ন পরিস্থিতি দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, সোমালিয়া, কেনিয়া ও সুদানসহ অন্য দেশগুলোতেও।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে (১৯ মার্চ) বলা হয়েছে, ‘বিশ্বের ৪০ শতাংশ মানুষেরই করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রাথমিক হাতিয়ারই নেই। এই হিসাবে বিশ্বে ৩০০ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছেন না হাত ধোয়ার। নেই সাবান কেনার টাকাও।’

মহামারীর মধ্যে বড় ধরনের পানির সমস্যায় পড়েছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা। দেশটির ইগুয়াজু জলপ্রপাতসহ ২৭৫টি জলপ্রপাতের পানি চলতি বছর স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে এসেছে।

নিকটবর্তী পারানা নদীর পানির স্তরও গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিচে চলে এসেছে। অনেক জায়গায় জাহাজ চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক মাসের মধ্যে বৃষ্টির সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

ফলে ইতোমধ্যে ভয়াবহ খরা দেখা দিয়েছে। নজিরবিহীন পানির ঘাটতিতে পড়েছে দেশটির কয়েক কোটি মানুষ।

করোনার এই ক্রান্তিকালে সবচেয়ে নাজেহাল অবস্থায় পড়েছে ভারতের জনগণ। তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, গুজরাট ও কেরালাসহ বিভিন্ন রাজ্যে অস্বাভাবিক পানি সংকটে কোটি কোটি মানুষ। হাত ধোয়ার পানি নেই তাদের।

এমন পরিস্থিতিতে রাজ্যগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, নেপালসহ আরও কয়েকটি দেশেও একই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে।

ভ্যাকসিন ও কার্যকর চিকিৎসা না থাকায় বিশ্বজুড়ে হাত ধোয়ার প্রবণতাও বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে পানির ব্যবহার।

অনেক সময় সুপেয় পানি দিয়েই চলছে হাত ধোয়া। এর ফলে তৃতীয় বিশ্ব তথা আফ্রিকা ও এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোয় পানির ঘাটতি চরম রূপ নিয়েছে।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর