শুক্রবার ২৩ অক্টোবর, ২০২০ ১৬:৩৯ পিএম


স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি শিক্ষকদের দুঃখ

এসএম আরিফুল কাদের

প্রকাশিত: ০৩:৫২, ১০ মে ২০২০  

ইসলামী প্রাথমিক শিক্ষার প্রয়োজন পূরণ করতে বাংলাদেশে চালু হয় স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা। বাংলাদেশে তিন ধরনের মাদ্রাসা শিক্ষা রয়েছে। আলিয়া, কওমি ও ফোরকানিয়া। আলিয়া মাদ্রাসার প্রাথমিক স্তরকে ইবতেদায়ি বলা হয়। এ স্তরটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চ শ্রেণির আলিয়া মাদ্রাসার সঙ্গে সংযুক্ত। আবার কিছু আছে স্বায়ত্তশাসিত (স্বতন্ত্র)। হতাশার বিষয় হল, আদর্শ, দক্ষ ও যোগ্য জনশক্তি তৈরির এ প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও চরম অবহেলিত।

প্রাথমিক স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে স্কুলের ছাত্ররা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। ফলে হাইস্কুলগুলোয় শিক্ষার্থীর অভাব হয় না। কিন্তু গ্রামে গ্রামে বা কয়েকটি গ্রাম মিলেও একটি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা না থাকায় শিশু ধর্মীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি দাখিল (মাধ্যমিক) মাদ্রাসাগুলো ছাত্র সংকটে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। এখনও টিকে থাকা ৪ হাজার ৩১২টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক সংখ্যা ২১ হাজার ৫শ’।

এসব মাদ্রাসার মধ্যে এক হাজার ৫১৯টি এমপিওভুক্ত। এমপিওভুক্ত মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষকরা ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত ৫০০ টাকা, পরবর্তী সময়ে এক হাজার, বর্তমানে প্রধান শিক্ষক দুই হাজার ৫০০ এবং সহকারী শিক্ষকরা দুই হাজার তিনশ’ টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন। বাকি প্রায় ৩ হাজার মাদ্রাসার শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত। বেতন-ভাতা না পাওয়ায় অনেক ইবতেদায়ি মাদ্রাসার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে এরই মধ্যে। হাজার হাজার শিক্ষক কোনো বেতন-ভাতা না পেয়েই অবসর গ্রহণ করেছেন। যুগের পর যুগ অতিবাহিত হলেও কেউ যেন ইবতেদায়ি শিক্ষকদের করুণ আর্তনাদ শুনছে না। দৃষ্টি দিচ্ছে না তাদের মানবেতর জীবনযাপনের দিকে।

১৯৯৪ সালে একই পরিপত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠা রেজিস্ট্রার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরা ৫০০ টাকা ভাতা পেতেন। রেজিস্ট্রার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে। ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু একই সময়ে রেজিস্ট্রিকৃত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোর ভাতা ৫০০ টাকাই থেকে যায়। এমনকি ধর্মের লেবাসধারী চারদলীয় জোট সরকারও তাকায়নি চরম অবহেলিত ইবতেদায়ি শিক্ষকদের দিকে। রেজিস্ট্রার্ড স্কুলগুলো সরকারীকরণের ঘোষণার দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে সম্পূর্ণ জাতীয়করণের ঘোষণাও করেছিলেন। সেই থেকে ইবতেদায়ি শিক্ষকরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।

খুশির বিষয় হল, বর্তমান সরকার ৪ হাজার ৩১২টি ইবতেদায়ি মাদ্রাসাকে ব্যানবেইসের আওতায় এনে নীতিমালা প্রণয়ন করে এমপিওর আশা জাগিয়েছে। এ সংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘নীতিমালায় নেই তবু এমপিও পাবেন আরও ৪ হাজার ৩১২টি ইবতেদায়ি মাদ্রাসার সাড়ে ২১ হাজার শিক্ষক’ (দৈনিক যুগান্তর : ১৫ জুন, ২০১৯)। উল্লেখ্য, একই সঙ্গে ২ হাজার ৭৩০টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে (স্কুল, কলেজ ও উচ্চমাধ্যমিক মাদ্রাসা) এমপিও’র ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে তারা ২৮ এপ্রিল ২০২০ এমপিও পায়। কিন্তু আগে থেকেই অবহেলিত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলো এখনও এমপিও’র কোনো খবর বা আশ্বাস পায়নি।

বিশ্বব্যাপী চলছে করোনাভাইরাসের আক্রমণ, যার বাইরে নয় বাংলাদেশও। কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে সরকার সব সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয়ায় ১৮ মার্চ থেকে ধাপে ধাপে ২ মাস বন্ধ চলছে। পাশাপাশি চলছে লকডাউন। যার কারণে অসহায় স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরা খাদ্য ও অর্থ সংকটে আছেন। লজ্জায় হয়তো কারও কাছে হাত বাড়াচ্ছেন না। এসব মাদ্রাসার মধ্যে এমন সব মাদ্রাসা আছে যেগুলো ছাত্রদের বেতনে চলে। দু’মাস ধরে ছাত্রদের বেতনও না পাওয়ায় কেমন অবস্থা হতে পারে অভাবী শিক্ষকদের! যেখানে সরকারি চাকুরেরা পাচ্ছেন নিয়মিত বেতন-ভাতা, এমনকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও পাচ্ছে সরকারি অনুদান। কিন্তু আগের ঘোষণা অনুযায়ী এমপিও তো দূরের কথা, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার অসহায় শিক্ষকদের জন্য জরুরি পরিস্থিতির অনুদান নেই! কীভাবে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে চলবে! সংকটের এ পরিস্থিতিতে তাদের জন্য সামান্য বরাদ্দ ও বেতন-ভাতাদির ব্যবস্থা করা কি খুব কঠিন?

এমপিও বা কোনো ধরনের বেতন-ভাতা না পাওয়ায় যেসব মাদ্রাসার অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে, সেগুলোয় প্রাণ সঞ্চারকরণসহ সব স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা জাতীয়করণ অথবা শিক্ষকদের ন্যূনতম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের মূল অংশ (এমপিও) দিয়ে সেগুলো চালু রাখা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি আকুল আবেদন- বর্তমান উন্নয়নের ছোঁয়ার সময় স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলো কেন বঞ্চিত হবে? আজ আপনাদের দিকেই চাতকপাখির মতো তাকিয়ে আছেন ওইসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবকরা। আপনারা তাদের পরিস্থিতি আন্তরিকভাবে বিবেচনা করুন।

এসএম আরিফুল কাদের : আলেম, প্রাবন্ধিক

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর