সোমবার ১৩ জুলাই, ২০২০ ১৩:৫০ পিএম


স্টেপ প্রকল্পের দুর্নীতি তদন্তে উচ্চতর কমিটি গঠন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০:০৫, ৩ জুন ২০২০  

কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে নেওয়া স্কিলস অ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট (স্টেপ)-এর কাজে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. বিল্লাল হোসেনকে এ কমিটির প্রধান করা হয়েছে। একই বিভাগের যুগ্মসচিব মো. মনজুর হাসান ভূঁইয়া ও উপসচিব মিজানুর রহমান ভূঁইয়া সদস্য হিসেবে আছেন।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের উপসচিব মীর জাহিদ হাসান স্বাক্ষরিত এই আদেশে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে।

সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে নেওয়া স্টেপ প্রকল্পে সীমাহীন লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। এতে নানা ফন্দি-ফিকিরে প্রকল্পের বিপুল অর্থ লুটের অভিযোগ ওঠে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে, প্রায় ১৮শ’ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কয়েক কর্মকর্তার একটি চক্র নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেনাকাটার নামে অর্থ লোপাট করেছেন। অপকর্ম সহজ করতে পরিবারের সদস্যদের দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় নামসর্বস্ব কোম্পানি। পাশাপাশি প্রকল্পভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহজে যোগাযোগের লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষা খাতের প্রভাবশালী একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারকে ওই কোম্পানিতে পরিচালক হিসেবে নেওয়া হয়। অথচ ওই প্রতিষ্ঠানটিও এ প্রকল্পের একটি অংশ বাস্তবায়নকারী। তারা প্রকল্প থেকে কাজের নামে ৯ কোটি টাকা পান। এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে প্রকল্পের অসৎ কর্মকর্তারা কাজের আড়ালে লুটপাটে মেতে ওঠেন।

সূত্র জানায়, ওইসব অসৎ কর্মকর্তা পার্বত্য অঞ্চলে কয়েক একর জমি কেনেন। জমি কেনার অর্থের উৎস নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। এ বিষয়ে প্রকল্পের অন্য কর্মকর্তারাই আবার উচ্চতর তদন্ত দাবি করেন। তারা জানান, বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের তফসিলভুক্ত।

উল্লেখ্য, দেশের কারিগরি শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার, বিশ্বব্যাংক ও কানাডার যৌথ অর্থায়নে নেওয়া এ প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল এক হাজার ৭৮২ কোটি টাকা। প্রকল্পের একটি অংশ ছিল সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইন্সটিউটে এককালীন মঞ্জুরি প্রদান। প্রথমে একেকটি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ৯ কোটি টাকা করে মঞ্জুরি দেওয়া হয়।

এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও প্রথমে কিছু প্রতিষ্ঠানকে নয় কোটি টাকা করে দেয়া হয়। কিন্তু পরের ধাপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বরাদ্দ কমিয়ে তিন কোটি টাকা করে দেওয়া হয়। এ টাকায় বিভাগভিত্তিক ল্যাবরেটরি স্থাপন, শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ একাধিক কাজ করার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে বেশিরভাগ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট স্টেপ প্রকল্পের একটি চক্রের যোগসাজশে নামমাত্র ল্যাবরেটরি স্থাপন করে টাকা ছাড় করে নেয়।

আরও অভিযোগ, যেসব প্রতিষ্ঠান এ চক্রের মাধ্যমে কাজ করেনি তাদের বিল আটকে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া যারা সমঝোতায় কেনাকাটা করতে চায়নি, তাদের বরাদ্দ ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আবার রফা না হওয়ায় প্রথমে কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়নি। রফা হওয়ার পর আগে অযোগ্য হলেও পরে একই কাগজপত্রে কাজ দেওয়া হয়। বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোর ক্ষেত্রেও আছে নানা অভিযোগ।

অভিযোগ উঠেছে- প্রকল্পের চক্রভুক্ত কর্মকর্তারা অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সরবরাহকারীর কাছ থেকে ল্যাবরেটরির মালামাল কিনতে বলে দিতেন। কথামতো কাজ না করলে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সব নিয়ম-কানুন মেনে মালামাল কিনলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিল আটকে দেওয়া হতো।

আবার কোনো প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেটভুক্ত সরবরাহকারীর থেকে পণ্য নিতে রাজি হলে সেই প্রতিষ্ঠানের দরপত্রের ডকুমেন্টস তৈরি করে দিত সম্ভাব্য দরদাতা প্রতিষ্ঠান। ফলে এমন ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্রেও সাধারণ দরদাতা কাজ পেত না। কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিবের কাছে এমন বেশকিছু অভিযোগ পড়েছে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আরো বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ তারা পেয়েছেন। তবে এখন শুধু পত্রিকায় প্রকাশিত অভিযোগের সূত্র ধরে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ বলেন, গত ডিসেম্বরে এ প্রকল্প শেষ হয়ে যায়। প্রকল্প সমাপনী প্রতিবেদন শেষ না করেই প্রকল্প পরিচালক (পিডি) দু’বার অন্যত্র বদলি হলেও তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বদলির আদেশের পর ছাড়পত্র দেওয়া হয়। তবে যদি প্রকল্পের কোনো কাজে কেউ অনিয়ম-দুর্নীতি করে থাকেন, তবে তার পার পাওয়ার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্টরা যেখানেই থাকুন না কেন, আইনত প্রকল্পের কাজের ব্যাপারে তিনি বা তারা দায়বদ্ধ। দোষী চিহ্নিত হলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আসতে হবে।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর