বৃহস্পতিবার ২০ জুন, ২০১৯ ২১:৪১ পিএম


স্কুলে ওয়াশ ব্যবস্থাপনা বাড়িয়েছে মেয়েদের উপস্থিতি

হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশিত: ১০:৪৬, ২৮ মে ২০১৯   আপডেট: ১০:৪৭, ২৮ মে ২০১৯

 

সাদিয়া আক্তার, নবম শ্রেণির ছাত্রী। অন্যসব কিশোরীর মতোই শরীরে বয়ঃসন্ধির পরিবর্তনটা তার কাছে সুখকর নয়! মাসিক হলেই বন্ধ হয়ে যেত স্কুল যাওয়া। আর স্কুলে শুরু হলে দ্রুত চলে আসতে হতো বাসায়। এ নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করত তার মধ্যে। কিন্তু এখন মাসিক নিয়ে সাদিয়ার কোনো দুশ্চিন্তা নেই। কারণ স্কুলে এ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে মাসিক ব্যবস্থাপনার সুন্দর পরিবেশ হয়েছে। স্কুল থেকেই বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে প্যাড। তাই বিশেষ এই দিনগুলোতে আর স্কুল যাওয়া বন্ধ রাখতে হচ্ছে না।

সাদিয়ার সঙ্গে কথা হয় সাভারের আশুলিয়ার হাজী আম্বিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এই স্কুলের ছয় শতাধিক শিক্ষার্থী সাদিয়ার মতোই স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও নিরাপদ পানি পাচ্ছে। স্কুল কর্তৃপক্ষকে এ কাজে সহযোগিতা করেছে বেসরকারি সংস্থা সাজেদা ফাউন্ডেশন।

এইচএসবিসি এবং উন্নয়ন সংস্থা ওয়াটারএইড বাংলাদেশের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় এ স্কুলে আধুনিক ও নারীবান্ধব একটি ওয়াশ কমপ্লেক্স নির্মাণ হয়েছে। সেখানে ছাত্রছাত্রীদের জন্য রয়েছে পৃথক টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। দুটি টয়লেটই প্রতিবন্ধীবান্ধব। মেয়েদের টয়লেটের এক দেয়ালে লাগানো হয়েছে কাচের র‌্যাক, যেখানে রাখা স্যানিটারি প্যাড ও হাত ধোয়ার সরঞ্জাম।

স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি এ আর আলাউদ্দিন বলেন, `আগে মাসের বিশেষ দিনগুলোয় মেয়েরা স্কুলে আসত না। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে তেমন সচেতনও ছিল না। গেল বছর আধুনিক ওয়াশ কমপ্লেক্সটি নির্মাণের পর মেয়েদের মাসিক ব্যবস্থাপনার সমস্যা দূর হয়েছে। পাশাপাশি তারা নিরাপদ পানি পাচ্ছে।` আর এই সুবিধার কারণে স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও ভর্তির সংখ্যা বৈড়েছে বলে মনে করেন তিনি।

সম্প্রতি এই স্কুলে গিয়ে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা টাইলস লাগানো, পরিচ্ছন্ন টয়লেট ব্যবহার করছে। পান করছে ফিল্টার মেশিনের বিশুদ্ধ পানি। হাত-মুখ ধোয়ার বেসিনটি এমনভাবে তৈরি যেন শারীরিক প্রতিবন্ধীরাও তা ব্যবহার করতে পারে।

সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ফাতেমা বলে, `আগে প্রস্রাব-পায়খানার চাপ এলে আটকে রাখতাম। বাসায় গিয়ে টয়লেট ব্যবহার করতাম। এখন স্কুলেই ভালো টয়লেট রয়েছে। সবসময় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকছি।`

শিক্ষক সাথী জাহান জানান, স্কুলের তিনশ`র বেশি ছাত্রী আগে মাসিক নিয়ে মোটেও সচেতন ছিল না। কিন্তু এখন মাসিক তাদের কাছে দুশ্চিন্তার বিষয় নয়। কারণ তারা স্কুলেই মাসিক ব্যবস্থাপনার সরঞ্জাম পাচ্ছে। কাউকে বাসায় চলে যেতে হচ্ছে না।

আম্বিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে টয়লেট কমপ্লেক্সটি নির্মাণ হয়েছে ইমপ্রুভিং অ্যাকসেস টু ওয়াশ ইন স্কুল প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সাজেদা ফাউন্ডেশনের অ্যাডভোকেসি অফিসার বুবলি খাতুন জানান, ওয়াশ কমপ্লেক্সটি নির্মাণে যা ব্যয় হয়েছে তার ৮০ শতাংশ এসেছে প্রকল্প থেকে। আর বাকি ২০ শতাংশ ব্যয় স্কুল কর্তৃপক্ষ বহন করেছে। তা ছাড়া এটি সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠানটি নিজ উদ্যোগে ৩০ হাজার টাকার একটি তহবিল গড়ে তুলেছে।

তিনি বলেন, `প্রকল্পের অধীনে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে টয়লেট ব্যবহারে সচেতন করা হয়েছে। মাসিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ছাত্রী ও শিক্ষকদের খোলামেলা বোঝানো হয়েছে।` বুবলি খাতুন জানান, পোশাক শ্রমিকদের সন্তানরা যাতে স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপনের সুযোগ পায়, মূলত সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। প্রকল্পের আওতায় সাভার উপজেলার আশুলিয়া, ধামসোনা ও ইয়ারপুরের ১৮টি স্কুলে কিশোরীবান্ধব এমন ওয়াশ ব্লক নির্মাণ করা হয়েছে। পোশাক শ্রমিকদের সন্তানরা পড়াশোনা করে এমন স্কুলগুলোই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে প্রকল্পে। প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা পাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি জানান, এর বাইরে ওয়াটারএইডের সহায়তায় অন্য একটি প্রকল্পের অধীনে ৫৬টি স্কুলে স্বাস্থ্য সচেতনমূলক কর্মশালার আয়োজন করে সাজেদা ফাউন্ডেশন। ৬০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও মাসিক বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন।

প্রকল্পে পোশাক শ্রমিকদের সন্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের হেড অব প্রোগ্রামস আফতাব ওপেল বলেন, `দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে তৈরি পোশাক খাত। এ খাতের ৯০ শতাংশ শ্রমিক নারী। সারাদিন কারখানায় থাকায় নিজেদের সন্তানদের খোঁজখবর রাখা তাদের জন্য কঠিন। এই সন্তানরা যখন স্কুলে থাকে তখন যদি স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপন করে এবং এ বিষয়ে সচেতন হয় তাহলে নিশ্চিতভাবেই তার প্রভাব পরিবারেও পড়বে। তাই সীমিত আকারে হলেও কয়েকটি স্কুলে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।`

এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী ফ্রাঁন্সওয়া দ্য ম্যারিকো বলেন, `এইচএসবিসিতে আমরা এমন এক পরিবেশে কাজ করতে চাই, যা গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করে এবং যার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব কম পড়ে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ওয়াটারএইডের সহায়তায় পোশাক শ্রমিক ও তাদের স্কুলগামী বাচ্চাদের জন্যে `ওয়াশ` সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে এইচএসবিসি।`


এডুকেশন বাংলা/ এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর