শুক্রবার ২২ মার্চ, ২০১৯ ৭:৪৬ এএম

Sonargaon University Dhaka Bangladesh
University of Global Village (UGV)

সৃজনশীলতার প্রশ্নপদ্ধতিতেও চলছে গাইড বই

অলোক আচার্য

প্রকাশিত: ১০:২৯, ৯ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১০:৩০, ৯ জানুয়ারি ২০১৯

নতুন বছরে বিনামূল্যে বই বিতরণ কর্মসূচীর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বই পৌছে গেছে। সেই বই হাতে নিয়ে নিশ্চিতভাবে ওদের মুখে হাসি ফুটেছে। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে যখন ফলাফল ঘোষণা করা হয় তখন যারা উত্তীর্ণ হয় তাদের চোখে শুধুই নতুন বইয়ের স্বপ্ন ভাসে। সরকারিভাবে বছরের শুরুতেই এখন বিনামূল্যে বই দেওয়ায় তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। বই নিয়ে শুরু হয়ে গেছে ক্লাস। নতুন বই পেয়ে ছাত্রছাত্রীরা অবশ্যই উচ্ছসিত। কিন্তু তাদের মনে এখন নতুন বই পড়ার সাথে সাথে নতুন একটা গাইডের খোঁজ রকছে। তাই নতুন বই পাওয়ার পরপর এখন চলছে গাইড বই কেনার কাজ। লাইব্রেরিতে গিয়ে মোটা টাকা খরচ করে ভাল গাইড বই কিনতে এখন অভিভাবকরা হুমড়ি খেয়ে পরছেন। গাইডের প্রচারকারীরা স্কুলে স্কুলে ঘুরে ঘুরে তাদের বই কেনানোর চেষ্টা করছেন। এক শ্রেণির শিক্ষক তাদের পছন্দের গাইড বইয়ের নাম বলে দিচ্ছেন। শুধু গাইড বই না অনুমোদনহীন নিন্মমানের দুএকটি বইও কিনতে হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের। এর পেছনে অবশ্য ডোনেশনের বিষয়টিও রয়েছে। অতি উৎসাহীরা আবার কোন লাইব্রেরি থেকে কিনতে হবে সেটাও বলে দিচ্ছেন। দায়িত্ব বলে একটা জিনিস আছে তো!

অবশ্য আমরা মুখে যাই বলি না কোন গাইড বইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা আমরা একেবারে অস্বিকার করতে পারি কি? অন্তত যখন সৃজনশীল পদ্ধতির সাথে ছাত্র তো আছেই শিক্ষকদের বড় অংশও ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেননি। যখন শিক্ষক বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হবেন তখন তা বোঝার জন্য গাইডের সাহায্য নিতে পারে। সৃজনশীল পদ্ধতি প্রয়োগের পর থেকেই নোট-গাইড বন্ধ করার কথা বা এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা চলে আসছে। তার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন ধরনের উদ্যেগের কথা শোনা গিয়েছিল। কারণ নোট গাইড মূলত মুখস্থ নির্ভরতা বিদ্যা। কিন্তু প্রশ্ন যেহেতু সৃজনশীল এবং সেখানে সরাসরি মুখস্থ করে উত্তর দেবার সুযোগ কম সেখানে আশা করা হচ্ছিল এমনিতেই নোট গাইড বিক্রি বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। উল্টো বলা যায় ঘটেছে উল্টোটা। গাইড বইয়ের ব্যাবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে দেবার বদলে ছাত্র ছাত্রীরা আরও বেশি করে গাইড পড়া আরম্ভ করেছে। কারণ সৃজনশীলতা যদি টাকা দিয়ে বাজারে কিনতে পাওয়া যায় এবং তা থেকে পরীক্ষায় কমন টমন পরে তবে তা কিনে মুখস্থ করলে ক্ষতি কি। আমার যুক্তিতেও ক্ষতি নেই। কারণ যে সিষ্টেমে চলার কথা ছিল তা তো আর চলছে না। প্রয়োজনীতা এমন এক শব্দ যা কোন আইন মানে না। প্রয়োজন হচ্ছে বলেই কিন্তু গাইড বই কিনছে। বাজারে গাইড বিক্রি হচ্ছে। গাইডের বিরুদ্ধে লেখালেখি হচ্ছে। কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও শুনে আসছি। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। কারণ সমাজে সেই জিনিসটাই একেবারে ব্যাবহার করা বন্ধ হয়ে যায় যার কোন প্রয়োজন থাকে না। আর প্রয়োজন থাকলে তা তুলে দেওয়া কষ্টসাধ্য বটে।

সৃজনশীল পদ্ধতির নাম প্রথমে কাঠামোবদ্ধ ছিল। আদতে প্রশ্ন পদ্ধতি কাঠামোর ভেতরই করা হয়। কিন্তু নামটা একটু কঠিন টাইপের হওয়ায় পরে তা সৃজনশীল করা হয়। সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। কিন্তু সম্প্রতি মাউশির একটি পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেল এখন পর্যন্ত ৫৪ ভাগ শিক্ষকই সৃজনশীল পদ্ধতি বোঝেন না। এই হার প্রায় অর্ধেক। এতদিন পরেও যদি এত শিক্ষক সৃজনশীল না বোঝেন তাহলে ছাত্রছাত্রীরা কিভাবে বুঝবে? আর এই পদ্ধতির পুরোপুরি সফলতা আসতে আর কত দেরি হবে? কমেনি গাইড নির্ভরতা। ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক দুজনই গাইড ব্যাবহার করে। প্রশ্ন পত্র তৈরি করতে হুবুহু গাইডের সাহায্য নেয়া হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ একাডেমিক সুপারভিশন প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এবছর তো হুবুহু গাইডের সাথে মিলে যাওয়ায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকরা যাতে নিজেরাই প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন এবং বাইরে থেকে প্রশ্ন এনে পরীক্ষা না নিতে পারেন তার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে। এখন কথা হলো সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল গতানুগতি পদ্ধতিতে চলে আসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে রোধ করার জন্য। যে শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল মুখস্থ নির্ভর এবং গাইড নির্ভর। রীতিমত গাইড বইয়ের বিজ্ঞাপন দেয়া হতো। কিন্তু এখন প্রশ্নপদ্ধতির পরিবর্তন হলেও এবং গাইডের প্রসার বাজার থেকে কমেনি। এবং অনেক শিক্ষক নিজেরাই গাইড বই কিনতে উৎসাহিত করেন। শিক্ষার্থীদের ব্যাগের মধ্যে পাঠ্য বইয়ের সাথে গাইড বইও থাকে।

সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্নগুলো এমনভাবে সাজানো হয় যেন ছাত্রছাত্রীরা মূল বইথেকে পড়ে এসে তার ভিত্তিতে নিজ দক্ষতা কাজে লাগিয়ে উত্তর দিতে পারে। পদ্ধতি শুরু করা হয়েছিল ছাত্রছাত্রীর মেধা কাজে লাগানোর জন্য। কিন্তু সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর কয়েক বছর পরেও দেখা গেল সেই গাইড নির্ভরতা এবং মুখস্থ প্রবণতা কমেনি। বরং তা ভিন্ন নামে ভিন্ন আঙ্গিকে চলছে। শিক্ষকরা সৃজনশীল পদ্ধতি বোঝে না তার বড় একটি কারণ হলো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব। যেখানে ৫৪ ভাগ শিক্ষকই সৃজনশীল বোঝে না সেখানে তাদের শিক্ষায় থাকা ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীল আয়ত্ত করতে সমস্যা হবে তা বলাই বাহুল্য। এতবছর যেসব শিক্ষকরা নিজেরাই সৃজনশীল না বুঝে শিক্ষা দিলেন সেসব ছাত্রছাত্রীরা সৃজনশীলের বুঝলো কে জানে। এর উত্তর আমার কাছে নেই। আবার শুধুমাত্র প্রশিক্ষণের অভাবই শিক্ষকদের সৃজনশীল না বোঝার কারণ এটা আমার মনে হয় না। বোঝার জন্য নিজের সদিচ্ছাও চাই। আর নিজেরা না বুঝলেও তো ছাত্রছাত্রীদের গাইড বই কেনায় উৎসাহ দেওয়া যায় না বা পরীক্ষার প্রশ্ন বাইরে থেকে কিনে আনা যায় না বা গাইড থেকে সরাসরি প্রশ্ন তুলে দেওয়া যায় না।

যেখানে সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে আজ পর্যন্ত তার সফলতা ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে তাহলে গাইড প্রসঙ্গ এত তাড়াতাড়ি বন্ধ হয় কি করে? কারণ সৃজনশীলতার সাথে গাইডের একটা সম্পর্ক রয়েছে। প্রশ্নের ধরন পাল্টালেও আজও আমরা নিজেদের পুরোপরি পাল্টাতে পারেনি। তাইতো পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নও হবুহু গাইড বই দেখেই করা হয়। আর গাইড পরে যদি প্রশ্ন কমন পাওয়া যায় তাহলে গাইড পড়লে সমস্যা কোথায়। তাছাড়া আরও সমস্যা আছে। যেখানে এখনও শিক্ষকদের একটা বিরাট অংশ সৃজনশীল পদ্ধতি আয়ত্ব করতে পারেনি সেখানে তারা যখন প্রশ্ন প্রণয়ণ করবেন তখন কিভাবে করবেন? তারাও দ্রুত প্রশ্ন করতে ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক গাইড থেকে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছেন। আর প্রশ্ন যেখানে প্রয়োজনের সেখানে আইন করে কিভাবে তা তুলে দেওয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে সবার আগে সৃজনশীল পদ্ধতিটাকে শিক্ষকদের মাঝে বোধগম্য করে তুলতে হবে যেন কোন প্রশ্ন তৈরি করতে গাইড বইয়ের সাহায্য নেওয়ার দরকার না হয়। আর তা না হলে গাইড বইয়ের বিরুদ্ধে শুধু লেখালেখিই হবে, কাজের কাজ কিছু হবে না।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর