বুধবার ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ৫:১৫ এএম


সুশিক্ষিত করতে হলে সন্তানকে সময় দিন

আসিফুর রহমান সাগর

প্রকাশিত: ১১:৩০, ৫ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১১:৩৩, ৫ অক্টোবর ২০১৯

শিশুদের নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই অভিভাবকদের। তার ভবিষ্যত্ চিন্তায় প্রাণপাত করেন মা-বাবা। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভাবতে গিয়ে শিশুর বর্তমানকে কী আমরা বাক্সবন্দি করে ফেলছি না! স্কুল, পরীক্ষা, কোচিংয়ে সবকিছুর চাপে শিশুদের তো দম ফেলার সুযোগ নেই। লেখাপড়ার বাইরে শিশুর শারীরিক সুস্থতা, বৃদ্ধি—এসবের দিকেই আমাদের নজর। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ একে অপরের পরিপূরক হলেও আমরা সব সময় শিশুর শারীরিক বিকাশকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছি। শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি আমরা কি শিশুর মানসিক বিকাশের কথা খুব বেশি ভাবছি! আমাদের ব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনে সেই ভাববার সময়টাই-বা কোথায়?


ইউনিসেফের এক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে অধিকাংশ অভিভাবকের শিশুর সঠিক যত্ম ও প্রতিপালন সম্পর্কে জ্ঞান এখনো বেশ সীমিত। মা-বাবা কাজে থাকার সময় ছোটো শিশুরা যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। শিশুর শিক্ষাগত সাফল্যের জন্য অভিভাবকরা খুব বেশি যত্নশীল হলেও অধিকাংশই জানেন না যে, উদ্দীপনা ও নিরাপত্তার অভাব শিশুর শ্রেণিকক্ষের কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে শিশুর প্রাথমিক বিকাশের চ্যালেঞ্জ সহিংস আচরণ, জ্ঞানের সীমিত সুযোগ এবং মৌলিক সেবাগুলোর ঘাটতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতি চারটি শিশুর মধ্যে তিনটি শিশু মানসিক নির্যাতনের এবং প্রতি তিনটি শিশুর মধ্যে দুটি শারীরিক শাস্তি ভোগ করেছে। বস্তি, প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চল এবং সুবিধাবঞ্চিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর শিশু, যাদের মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত, তারাই বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের নৈতিকতার বিকাশ হয় তিন ধাপে। জন্ম থেকে প্রথম কয়েক বছর একজন শিশু অনুশাসন মেনে চলে শাস্তির ভয়ে। এরপর ‘টিন’ এজে এসে সে নিজের স্বীকৃতি চাইতে থাকে। তার লেখাপড়া, খেলা বা যে কোনো কাজের স্বীকৃতি চায়। সে যে সমাজের রীতিনীতি মানছে, এটাকে যখন মানুষ লক্ষ করে, প্রশংসা করে, সেটা তার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। আর নৈতিকতা বিকাশের তৃতীয় ধাপের শুরু হয় ১৬-১৭ বছর বয়স থেকে। তখন সবাই নিজের অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিকতা বিচার করে নিজের নৈতিকতার ধারণা তৈরি করে। যদি সে আগের দুই ধাপে ভালো ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠে থাকে, তাহলে তার নৈতিকতার ধারণা ইতিবাচক রূপ নেবে। তার ধারণার জগত্ ইতিবাচকভাবে অগ্রসর হতে থাকবে। আর যদি সে বিশ্বাস করে—এই সমাজ, এই প্রচলিত নিয়মকানুন ভুলভাবে গড়ে উঠেছে, তখন সে তার বদল চাইবে। এই পরিবর্তনের পন্থা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হবে যা সে তার এতদিনের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতার যুক্তি দিয়ে বিচার করবে। যদি তার বিকাশ সুস্থ, স্বাভাবিক হয় তাহলে তার যুক্তিবাদী মানবিক মন তৈরি হবে। যদি তা না হয় তবে তার যুক্তি হবে বিধ্বংসী, উগ্র। তখন সে উগ্রতা বা নিষ্ঠুরতাকে ঠিক বলে মনে করতে থাকবে। তাই অভিভাবকদের ছেলেমেয়েদের মনোজগতের বিকাশের সময়টাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।

দেখা যাচ্ছে, স্কুল, কোচিং আর স্কুলের বন্ধুদের বাইরে আমাদের শিশুরা খুব বেশি কথাও বলে না। ঘরে থাকার বেশিরভাগ সময় মোবাইল গেমসে ডুবে আছে। এভাবে ধীরে ধীরে আমাদের ছেলেমেয়েরা অসামাজিক হয়ে পড়ছে। এজন্য মূল দায়টা কিন্তু মা-বাবার। মা-বাবার সুস্থ সম্পর্ক না থাকা, শিশুদের সামনে ঝগড়া করা, পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে বাড়ির স্বাভাবিক সম্পর্ক নষ্ট করা, ছেলেমেয়েদের নিজেরা সময় না দেওয়া। এমন পরিবেশে শিশুর বৃদ্ধি ঘটতে থাকলে তার চরিত্র বিকশিত হবে না। তাই শিশুকে মা-বাবাকেই সবচেয়ে বেশি সময় দিতে হবে। খেলার সুযোগ না থাকলে প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিনে আত্মীয়-বন্ধুদের বাসায় বেড়াতে যাওয়া। এটা করলেও বাচ্চারা সামাজিকতা শিখবে। সেখানে অন্য বাচ্চাদের সম্পর্কে মিশে যেমন তাদের সহ্য ক্ষমতা বাড়বে তেমনি মা-বাবাদের অন্য বন্ধুদের সঙ্গে ব্যবহার পরিমিতিবোধ ভদ্র আচরণ দেখেও তারা শিখবে।

অভিভাবকরা বলছেন, তাদেরও উদ্বিগ্ন হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত নিরাপত্তা; দ্বিতীয়ত সন্তান যাদের সঙ্গে খেলছে বা মিশছে, তারা কেমন। গুলশান হামলায় জড়িত জঙ্গিরা দেশের নামি ও অভিজাত শ্রেণির স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। সেই উদাহরণ সামনে এসে দাঁড়িয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ ও আতঙ্কের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে যার ফলাফল গৃহবন্দি।

কিন্তু এটা কোনো সমাধান হতে পারে না। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ছেলেমেয়েদের প্রতি এই অতি সতর্কতা তাদের একলা করে দিচ্ছে। এটাই বরং তার বিপথে যাওয়ার বড়ো কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। ছেলেমেয়েরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালো রেজাল্টের চাপে যেমন মনের বিকাশ ঘটাতে পারে না তেমনি পরিবারের ভেতরেও তাদের স্বাভাবিক বিকাশের পরিবেশ দিতে হবে। কেননা, হীনম্মন্যতা নিয়ে ও আত্মবিশ্বাসের অভাব নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুরাই পরে মাদকাসক্ত হয়ে ওঠে বা বিশেষ কোনো মতবাদের প্রতি ঝুঁকে আশ্রয় খোঁজে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুকে প্রতি মুহূর্তে দিতে হবে মধুর অভিজ্ঞতা, সুন্দর সাজানো সময়। শিশুকে প্রচুর খেলাধুলার সুযোগ দিতে হবে। খেলার মাধ্যমে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাড়ে। শিশুদের আচার-আচরণ ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে বড়োদের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। বড়োরা যদি শিশুদের প্রতি দয়া, সুবিবেচনা ও ভালোবাসা দেখায় তবে শিশুরাও এসব দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে। এতে তার মানসিকতা ইতিবাচক দিকে প্রবাহিত হতে থাকবে। তবে এর বিপরীত আচরণের ক্ষেত্রে শিশুরা ক্রোধ, অন্যের কথা না মানা, সহিংস আচরণ রপ্ত করতে থাকবে। শিশুর আবেগ অনুভূতি বা আচরণ অনেক সময় বড়োদের কাছে অযৌক্তিক বা বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে, কিন্তু শিশুর জন্য এটা স্বাভাবিক ও বাস্তব। তাই এ ব্যাপারে পিতামাতা ও বড়োদের যথেষ্ট সহানুভূতিশীল হতে হবে। শিশু নতুন কিছু শিখলে, তা যতই সামান্য হোক, তার সামনে সম্মতি, উত্সাহ ও আনন্দ প্রকাশ করা উচিত। সুস্বাস্থ্য, সুশিক্ষা, নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও ভালোবাসার দাবি পূরণ করে প্রতিটি শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিকশিত করে তোলা সম্ভব।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, পরীক্ষা ও জীবিকাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা ছেলেমেয়েদের মানসিক বিকাশের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা শিক্ষা ব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষা করতে পারিনি। শিক্ষা ব্যবস্থা ও সুস্থ নীতিবোধসমৃদ্ধ পারিবারিক পরিবেশ কোনোটাই আমরা দিতে পারিনি। ১৮ বছর বয়সের মধ্যে ছেলেমেয়েদের চারটি পাবলিক পরীক্ষা দিতে হয়। এই পরীক্ষা ও পড়ার চাপে আমরা তাদের আনন্দের সব জানালা বন্ধ করে দিয়েছি। খেলার জানালা বন্ধ করেছি, সংস্কৃতির জানালা বন্ধ করেছি। শুধু বাসায় বসে ইন্টারনেটের ‘উইন্ডো’ খোলা রেখেছি। শুধু পরীক্ষা দিয়ে আর ভার্চুয়াল জগতে ঘুরে শিশুদের মানসিক বিকাশ সম্ভব হয় না। আরেকটি দিক হলো, সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ। যখন শিশুটি দেখবে তার বাবা অসত্ভাবে রোজগার করছে, তার মা পরিবারে নিগৃহীত হচ্ছে, তখন সেই শিশুটির সুস্থ নৈতিকতা তৈরি হবে না। একজন শিক্ষক এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটছেন, কোচিং সেন্টার খুলে স্কুলের শিক্ষক ব্যবসা করছেন; তাহলে সেই শিক্ষকের কাছ থেকে কোন্ নৈতিকতা ছেলেমেয়েরা শিখবে! মূল্যবোধের, আস্থার জায়গা তাহলে আর থাকল কোথায়! তাই শিক্ষক ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে যেমন মানবিক হতে হবে তেমনি মা-বাবাকেও তাদের সন্তানদের জন্য সত্, সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

এ প্রসঙ্গে কথাসাহিত্যিক ও মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা ‘সেন্স অফ সিকিউরিটি’ নিয়ে যাতে বড়ো হতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ঘরে ঘরে অসুস্থ পরিবেশ, মা-বাবা ঝগড়া, লেখাপড়ার অতিরিক্ত চাপ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ না পাওয়ার কারণে আমাদের ছেলেমেয়েদের মনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হয়। মানসিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে।

বাচ্চাদের ওপরে অভিভাবকদের ওভার প্রটেক্টিভ আচরণ তার মানসিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করবে। তাদের আত্মবিশ্বাস নিজস্ব চিন্তা করবার ক্ষমতা তৈরি হবে না। মানসিকভাবে দুর্বল এই শিশুরা বড়ো হয়ে কোনো কাজ খারাপ জেনেও তা থেকে দূরে থাকার, তাকে ‘না’ বলবার শক্তি অর্জন করে না। তারা মাদকাসক্তি, খারাপ সঙ্গের প্রতি ধাবিত হবে। ধর্মীয় উগ্রপন্থার মতবাদের প্রতি এই তরুণ ছেলেমেয়ের আকর্ষণও এই মানসিকতা থেকেই ঘটেছে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার চাইতে পরিবারে শিশুটিকে আত্মবিশ্বাস যোগাতে হবে।

বৈষয়য়িক লেখাপড়ার প্রতি অধিক চাপ তৈরি না করে তাকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবার পথ তৈরি করতে হবে। সবচেয়ে বড়ো কথা, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মাঝে সুস্থ সম্পর্ক নিশ্চিত করতে হবে। এই সুস্থ পরিবেশ শিশুর মাঝে আত্মবিশ্বাস ও নির্ভরতা তৈরি করে।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

 

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর