বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২:২৭ এএম


সুরস্রষ্টা আলাউদ্দিন আলী আর নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৬:৩৪, ১০ আগস্ট ২০২০  

`একবার যদি কেউ ভালোবাসত`, `যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়`, `প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ`, `ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়`, `হয় যদি বদনাম হোক আরও`, `আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার`, `সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী হয়ে কারও ঘরনি`, `সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি, ও আমার বাংলাদেশ`, `বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম দেখা পাইলাম না`, `যেটুকু সময় তুমি থাকো কাছে`, `সবাই বলে বয়স বাড়ে, আমি বলি কমে রে`, `কেউ কোনোদিন আমারে তো কথা দিল না`, `পারি না ভুলে যেতে, স্মৃতিরা মালা গেঁথে`, `জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো`, `আমার মনের ভেতর অনেক জ্বালা আগুন হইয়া জ্বলে`, `হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ`সহ আরও অনেক জনপ্রিয় গানের সুরস্রষ্টা বরেণ্য সংগীত ব্যক্তিত্ব আলাউদ্দিন আলী আর নেই। তিনি গতকাল রোববার বিকেল সাড়ে ৫টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। আলাউদ্দিন আলীর ছেলে শওকত আলী রানা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার শারীরিক অবস্থা খারাপের দিকে গেলে গত শনিবার ভোর পৌনে ৫টায় তাকে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থা বিবেচনা করে তাকে লাইফ সাপোর্টে দেওয়া হয়। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রোববার বিকেলে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে।

আলাউদ্দিন আলীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোক বার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, সংগীতজ্ঞ আলাউদ্দিন আলীর মৃত্যু দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি। শোকবার্তায় শেখ হাসিনা দেশের সংগীত জগতে আলাউদ্দিন আলীর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং সংস্টৃ্কতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদও শোক প্রকাশ করেছেন।

আলাউদ্দিন আলীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন সংগীতাঙ্গনের অনেকেই। রুনা লায়লা বলেন, `আরও একজন গুণী শিল্পী চলে গেলেন আমাদের মাঝ থেকে। তিনি তার গানের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।` পারিবারিক সূত্র জানায়, আজ সোমবার বাদ জোহর খিলগাঁও মসজিদে জানাজার পর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তার মরদেহ দাফন করা হবে।

লোকজ ও ধ্রুপদি গানের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা আলাউদ্দিন আলীর সুরের নিজস্ব ধরন বাংলা সংগীতে এক আলাদা ঢং হয়ে উঠেছে প্রায় চার দশক ধরে। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বহু স্বনামধন্য শিল্পী তার সুরে গান করে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছেন।

আলাউদ্দিন আলী দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের প্রদাহ ও রক্তে সংক্রমণের সমস্যায় ভুগছিলেন। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে চিকিৎসার জন্য আলাউদ্দিন আলীকে ব্যাংকক নেওয়া হয়েছিল। সেখানে পরীক্ষার পর জানা যায়, তার ফুসফুসে একটি টিউমার রয়েছে। এরপর তার অন্যান্য শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি ক্যান্সারের চিকিৎসাও চলছিল। এর আগে বেশ কয়েক দফায় তাকে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। বাংলাদেশ ও ব্যাংককে তার চিকিৎসা হয়েছে। সাভারে সেন্টার ফর রিহ্যাবিলিটেশন অব প্যারালাইজড কেন্দ্রেও তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েছেন।

আলাউদ্দিন আলী বাংলা চলচ্চিত্রে অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গান তৈরি করেছেন। তিনি একই সঙ্গে সুরকার, সংগীত পরিচালক, বেহালাবাদক ও গীতিকার। গান লিখে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন। গুণী এই মানুষের জন্ম ১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে। তার বাবা ছিলেন ওস্তাদ জাদব আলী। মায়ের নাম জোহরা খাতুন। মাত্র দেড় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ঢাকার মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে চলে আসেন আলাউদ্দিন আলী। তিন ভাই ও দুই বোনের সঙ্গে সেই কলোনিতেই বড় হন এই গুণী শিল্পী। সংগীতে প্রথম হাতেখড়ি ছোট চাচা সাদেক আলীর কাছে। পরে ১৯৬৮ সালে বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে পা রাখেন। সেখানে তার শুরুটা হয় শহীদ আলতাফ মাহমুদের সহযোগী হিসেবে। পরে প্রখ্যাত সুরকার আনোয়ার পারভেজের সঙ্গে কাজ করেন দীর্ঘদিন।


আলাউদ্দিন আলী ১৯৭৫ সালে সংগীত পরিচালনা করে বেশ প্রশংসিত হন। তিনি গোলাপী এখন ট্রেনে [১৯৭৯], সুন্দরী [১৯৮০], কসাই এবং যোগাযোগ চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৮৮ সালে সেরা সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া ১৯৮৫ সালে তিনি সেরা গীতিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি খ্যাতিমান পরিচালক গৌতম ঘোষ পরিচালিত `পদ্মা নদীর মাঝি` চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন।

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর