মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর, ২০২০ ৩:০৮ এএম


সাড়ে ৩ মাসেও স্ত্রীর পাসপোর্ট মেলেনি, মারা গেলেন কলেজ শিক্ষক

এডুকেশন বাংলা ডেস্ক :

প্রকাশিত: ১৮:১৯, ১৮ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০২:৩৬, ১৯ জানুয়ারি ২০২০

পাসপোর্টের জরুরি আবেদনের রসিদ। ইনসেটে সহযোগী অধ্যাপক হুমায়ুন কবির হেলালী

পাসপোর্টের জরুরি আবেদনের রসিদ। ইনসেটে সহযোগী অধ্যাপক হুমায়ুন কবির হেলালী

ভারতের হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার কথা ছিল। তাই স্ত্রীকে সঙ্গে নিতে পাসপোর্টের জরুরি আবেদন করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সাড়ে তিন মাসেও তা হাতে না আসায় অস্ত্রোপচারে আর যাওয়া হলো না কক্সবাজারের চকরিয়া ডুলাহাজারা ডিগ্রি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক হুমায়ুন কবির হেলালীর। পাসপোর্টটির প্রহর গুণতে গুণতে মাত্র ৪৬ বছর বয়সেই শনিবার ভোররাতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন তিনি (ইন্না….রাজেউন)।


পাসপোর্টটি পেলে ভারত যাবেন। সে পর্যন্ত স্বাভাবিক থাকতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন অধ্যাপক হুমায়ূন। সেখানে আইসিইউতে শনিবার ভোর সোয়া ৪টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তিনি টিউমার ও কিডনীজনিত রোগে দীর্ঘদিন দেশে ও ভারতে চিকিৎসা নিয়েছেন।

অধ্যাপক হুমায়ূন কক্সবাজার সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের লরাবাগের মরহুম মোজাফ্ফর আহমদের ৪র্থ ছেলে। মৃত্যুকালে স্ত্রী, ৩ ছেলে ও অসংখ্য আত্মীয় স্বজন রেখে গেছেন তিনি। শনিবার মাগরিবের নামাজের আগে লরাবাগ কবরস্থান সংলগ্ন মাঠে জানাজার পর তাকে দাফন করা হয় বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে ।

ভারতে চিকিৎসা ও ভ্রমণ ভিসা পেতে কক্সবাজারে সহযোগিতাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পাওয়া তাজ কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারি জানে আলম তার চালিত `তাজবি-তাসফি` নামক ফেসবুকের ওয়ালে গত ১৩ জানুয়ারি অসুস্থ অধ্যাপক হুমায়ূন ও তার স্ত্রীর পাসপোর্ট আবেদন নিয়ে `অধ্যাপক হুমায়ুন ও একটি পাসপোর্ট এর পোস্টমর্টেম` নামে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে জানে আলম লিখেন, ‘বিকাল তিনটা ০১৮৪০২৯৬৭৬৮ মোবাইল নং থেকে আমার ব্যাক্তিগত নম্বরে কল, যথারীতি রিসিভ করলাম। কণ্ঠ পরিচিত তবে তৎক্ষণাত চিনতে না পারলেও আমার পেশাগত পরামর্শ চাইলে- যতটুকু সম্ভব পরামর্শ দিলাম। মনে মনে হুমায়ূন ভাইয়ের কথা স্বরণ হওয়ায় আর কথা না বাড়িয়ে এখন কোথায় আছেন জানতে চাইলে, উনি বলেন- সদর হাসপাতালে ৫০৫ নং কেবিনে ভর্তি আছেন। আইসিইউ থেকে আজকে কেবিনে স্থানান্তর হয়েছেন।’

বৃহত্তর ঈদগাঁওর জালালাবাদ ইউনিয়নের দক্ষিণ লরাবাগের কৃতি সন্তান অধ্যাপক হুমায়ূন কবির হেলালী। ডুলাহাজারা কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের একজন অধ্যাপক। প্রায় ছয় মাস আগে হঠাৎ শারীরিক অসুস্থতায় ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে জানতে পারেন অগ্নাশয়ে একটি টিউমার হয়েছে। সুঠাম দেহের মানুষটি দিন দিন স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে। কোন উপায় না দেখে উন্নত চিকিৎসার আশায় ভারতের ভেলোরে ডাক্তারের চিকিৎসা করতে যান এবং ডাক্তার অপারেশন করতে হবে বলে পরামর্শ দেন। প্রেসার এবং ডায়বেটিসের অবস্থা খারাপ থাকায় ডাক্তার অপারেশনের ঝুঁকি না নিয়ে তিন মাসের ট্রিটমেন্ট দেন এবং তিন মাস পরে ফিমেল এটেনডেন্টসহ হাসপাতালে পুনরায় এ্যাপয়মেন্ট দেন।

ভেলোরে ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে- স্ত্রীর পাসপোর্ট না থাকায় গত ৩ অক্টোবর ব্যাংকে ৬ হাজার ৯০০ টাকা জমা করে জরুরী ভিত্তিতে পাসপোর্ট এর জন্য আবেদন করেন। পাসপোর্ট ডেলিভারি স্লিপে সম্ভাব্য ১৪ অক্টোবর ডেলিভারি পাওয়ার কথা ছিল । কিন্তু আজ অবদি পাসপোর্ট আর পাওয়া গেল না। অফিসে বারবার যোগাযোগ করলে বলা হয়, হেড অফিসে প্রিন্টিং সেকশনে আছে। ‘কখন পাবো?’ প্রশ্ন করলে কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি। আজ ১০০ দিন হল, পাসপোর্ট আর পাওয়া যায় না। এদিকে আবেদনকারীর প্রাণপ্রিয় স্বামী হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। যথাসময়ে পাসপোর্ট না পাওয়ায় আর ভারতে উন্নত চিকিৎসা করতে যেতে পারেননি।

অধ্যাপক হুমায়ূন কবির হেলালীর পাসপোর্ট পেতে দেরি হচ্ছে দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে একজন ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘কাউকে দোষারোপ করার যোগ্যতা আমার নাই। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া কিছু ব্যাতিক্রম দেখলে নিজের খুবই খারাপ লাগে তাই সবার সঙ্গে শেয়ার করা। পরিশেষে হুমায়ুন ভাইয়ের সুস্থতার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া কামনা করছি। বিঃদ্রঃ পাসপোর্ট যথা সময়ে পাসপোর্ট না পাওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার প্রয়োজন মনে করিনি। কারণ পেশা আমার সাংবাদিকতা নয়। ধন্যবাদ সবাইকে- জানে আলম, তাজ কর্পোরেশন, লালদিঘীর পাড়, কক্সবাজার।’

এ লেখাটি নজরে এলে অসংখ্য মানুষ পাসপোর্ট অধিদপ্তরের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

চাইলে তিনদিনে সরবরাহ দেয়া যায় এমন একটি পাসপোর্ট ১১০দিনেও হাতে পাননি হুমায়ূনের স্ত্রী। এরই মাঝে শনিবার (১৮ জানুয়ারি) ভোররাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অধ্যাপক হুমায়ূন। তার মৃত্যুতে স্ত্রী-সন্তানের আহাজারি হাসপাতালের পরিবেশ ভারি করে তুলে। স্ত্রী বারবার বলছিলেন, যথাসময়ে পাসপোর্টটি পেলে হয়তো মানুষটি সুস্থতার দিকে এগিয়ে আরও কিছুদিন তাদের সঙ্গে বেঁচে থাকতো।

তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনার ঝড় ওঠে ফেসবুকে। তার স্ত্রীর মতো অনেকের অভিমত পাসপোর্টটির কারণে তার যথাযথ চিকিৎসা সম্ভব হয়নি।

ইসলামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান চৌধুরী লিখেন, ‘একটি পাসপোর্টের করুন মৃত্যু । কাল যেটা মিথ্যা ছিল, আজকে তা সত্য হলো। এভাবে টাকার জন্য আর কত মানুষকে হত্যা করবে পাসপোর্ট কমর্কতারা।’

আরেকজন লেখেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে হুমায়ূন ভাইয়ের সহধর্মিণীর আবেগ ভরা স্ট্যাটাস পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের মন গলাতে পারেনি। ঠিক সময়ে পাসপোর্টটা হাতে পেলে হয়তো ঠিক সময়ে চিকিৎসা করা যেত। তাহলে যাদের গাফেলতির কারণে আজ একজন শিক্ষকের করুন মৃত্যে হল তার দায় কে নেবে? আল্লাহ প্রিয় ভাই কে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন আমিন।’

পাসপোর্টটি জরুরি ভিত্তিতে না পাওয়ার বিষয়ে জানতে কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক আবু নাঈম মাসুমের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাই তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

 


এডুকেশন বাংলা / এসআই

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর