বুধবার ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ১৭:৩২ পিএম


সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে ৭১% দরিদ্র মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭:২৪, ২৬ ডিসেম্বর ২০১৮  

দরিদ্রদের আয় বাড়াতে সাহায্য করছে সামাজিক নিরাপত্তামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি। আয়ের উৎস সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখছে এসব কর্মসূচি। এ কর্মসূচিতে প্রতি বছর বরাদ্দের অংক বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে সুবিধাভোগীর সংখ্যাও। তার পরও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এখনো সামাজিক সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) তথ্যমতে, দরিদ্রদের প্রায় ৭১ শতাংশ এখনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাইরে রয়েছে।

তথ্যমতে, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ বা প্রায় চার কোটি। এসব মানুষের মাত্র ২৯ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। বাকি ৭১ শতাংশ বা ২ কোটি ৮০ লাখই রয়েছে এর বাইরে।

বর্তমানে ২১টি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সামাজিক নিরাপত্তামূলক ৯৯টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এসব কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতি বছর বাড়ছে সুবিধাভোগীর সংখ্যাও। চলতি অর্থবছরও সব ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা।

তার পরও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এখনো এ কর্মসূচির বাইরে থাকার কারণ জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, এক দশকের ব্যবধানে দ্বিগুণের বেশি দরিদ্র মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ। কর্মসূচির অপচয় রোধ ছাড়াও অন্যায়ভাবে সুবিধা নেয়ার প্রবণতা বন্ধ করা হয়েছে। কর্মসূচিতে প্রদত্ত অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সমন্বয় আনা হচ্ছে।

নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে শুরু হওয়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়লেও তাদের অনেকে এ সুবিধা সঠিকভাবে পাচ্ছেন না। শক্তিশালী তথ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি না থাকায় একই ব্যক্তি একাধিক কর্মসূচি থেকে সুবিধা পাচ্ছেন। অনেক দরিদ্র ব্যক্তি আবার প্রয়োজনের তুলনায় কম সুবিধা পাচ্ছেন। সুবিধাভোগী নির্বাচনেও রয়েছে ত্রুটি। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবে বিতর্কিত হচ্ছে কর্মসূচি। বিভিন্ন সময়ে গবেষণা ও জরিপেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা ও দুর্বলতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

২০১০ সালে বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাভুক্ত ১৮ শতাংশ পরিবারই ছিল সচ্ছল। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল সব ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতার বাইরে।

সুবিধাভোগী বাছাইয়ের পাশাপাশি সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রেও আরো চৌকস হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ‘হুইচ কাইন্ডস অব সোস্যাল সেফটিনেট ট্রান্সফার ওয়ার্ক বেস্ট ফর দি আল্ট্রা পুওর ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মসূচিগুলোর প্রায় ৫২ শতাংশেই খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়। তবে নগদ অর্থ এর চেয়ে বেশি কার্যকর। পুষ্টিশিক্ষা পাওয়া নারীদের ২৩ শতাংশ নগদ অর্থ পেয়ে খাদ্য দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। এজন্য উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের সুবিধাভোগীদের ৮৯ থেকে ৯১ শতাংশ নারী সহায়তা হিসেবে নগদ অর্থ চান। তাই সুবিধাভোগী বাছাইয়ের পাশাপাশি সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রেও আরো চৌকস হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কিছু কর্মসূচি লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখলেও অনেকগুলোই অব্যবস্থাপনার কারণে সুবিধাভোগীদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারছে না বলে মনে করেন ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক ড. সাজ্জাদ জহির। তিনি বলেন, কর্মসূচিতে বাছাই দুর্বলতার কারণে অভাবী মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা যাচ্ছে না। এছাড়া নানা ধরনের অব্যবস্থাপনাও রয়েছে। দরিদ্র মানুষের চেয়ে অতিদরিদ্র মানুষকে এসব কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি বেশি জরুরি। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি যে পরিস্থিতি বিবেচনায় শুরু করা হয়েছিল, তা এখনো বিদ্যমান আছে কিনা মূল্যায়ন করতে হবে। মানুষকে অর্থ নাকি খাদ্য সহায়তা দিয়ে বেশি উপকার করা যাবে, ভাবতে হবে তা নিয়েও। প্রথাগত কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসে সর্বোচ্চ সুবিধা দিতে পারে এমন উদ্ভাবনী এবং চাহিদা ও লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি নিতে হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দুস্থ, দরিদ্র ও পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বয়স্ক ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, বিধবা-স্বামী নিগৃহীতা-দুস্থ মহিলা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি, প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি হিসেবে বিভিন্ন সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, টিআর, জিআর, দুস্থ মায়েদের জন্য খাদ্য সহায়তা (ভিজিডি) ও চর জীবিকায়নেও এ কর্মসূচির অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের আওতায় সুবিধাভোগীর পাশাপাশি বরাদ্দের পরিমাণও বাড়ছে।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে এ-যাবত্কালের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৬৪ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। অর্থবছরটিতে বাজেটে মোট বরাদ্দের যা ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৫৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকা।

সামাজিক সুরক্ষামূলক এ কার্যক্রম সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে ২০১৫ সালে নেয়া হয়েছে ১০ বছর মেয়াদি জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র (এনএসএসএস)। এরই মধ্যে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনাও সম্ভব হয়েছে।

এ কৌশলপত্র সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে লক্ষ্যের আগেই দেশ দারিদ্র্যমুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন কৌশলপত্র প্রণয়নে নেতৃত্ব প্রদানকারী ড. শামসুল আলম। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ১৯৯৬ সালেই সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। বর্তমান মেয়াদে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র গ্রহণ করেছে। এটাই প্রমাণ করে, দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি কিংবা ত্রুটি নেই। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিছু প্রাসঙ্গিকতা আসতে পারে। সেজন্য সরকার থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের সরাসরি ভাতা প্রদান ব্যবস্থা (জি২পি পেমেন্ট সিস্টেম) জোরদার করা হচ্ছে। এ ধরনের ব্যবস্থা কেবল আর্থিক অন্তর্ভুক্তিই নিশ্চিত করবে না, রোধ করবে অপচয় ও দ্বৈততা। আয়বৈষম্য কমিয়ে আনতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোয় গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে জীবনচক্রভিত্তিক মূল কর্মসূচির আওতায় দুস্থ, দরিদ্র ও পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বয়স্ক ভাতা, সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন, প্রতিবন্ধী ভাতা ও প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি, শিশু সুবিধা, শিশুদের বিদ্যালয় বৃত্তি এবং বিধবা-স্বামী নিগৃহীতা-দুস্থ মহিলা ভাতা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া বিশেষ কর্মসূচি, যৌথ ঝুঁকি প্রশমন কর্মসূচি এবং ক্ষুদ্র কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার এনএসএসএস বাস্তবায়ন করছে। কৌশলপত্র সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে লক্ষ্যের আগেই দেশ দারিদ্র্যমুক্ত হবে বলে আশা করছি। সূত্র: বণিক বার্তা

এডুকেশন বাংলা/একে

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর