রবিবার ১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ১৬:০৭ পিএম


সন্ধ্যাকালীন কোর্স সবচেয়ে বেশি ঢাবির ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে

আরফিন শরিয়ত

প্রকাশিত: ০৮:০৩, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৬:৫৭, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ৯টি বিভাগে প্রতি বছর ভর্তি হয় প্রায় ১ হাজার ২৫০ জন নিয়মিত শিক্ষার্থী। অথচ একই বিভাগগুলোতে সন্ধ্যাকালীন কোর্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে হয় ২ হাজার ১০০। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের মধ্যে রয়েছে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম, মার্কেটিং, ফিন্যান্স, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট ও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ও অর্গানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড লিডারশিপ বিষয়।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের নয়টি বিভাগের সন্ধ্যাকালীন কোর্স ও চারটি প্রফেশনাল কোর্সে প্রতি বছর প্রতিটি সেশনে ৭২০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। বছরে সামার, উইন্টার ও স্প্রিং—এই তিনটি সেশনে মোট ভর্তি হন ২ হাজার ১৬০ জন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভর্তি ও টিউশন ফি বাবদ নেওয়া হয় ২ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রতি বছর এই ৯টি বিভাগের সন্ধ্যাকালীন কোর্স থেকে আয় হচ্ছে ৫০ কোটি টাকা, যার ৩০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু এর মাত্র কিছু অংশ জমা হয় ফান্ডে। এছাড়াও এই টাকার আলাদা হিসাব রাখে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এমন পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২তম সমাবর্তনে বলেন, ‘এসব কোর্সের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি সার্বিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখন দিনে পাবলিক, রাতে বেসরকারি চরিত্র ধারণ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ এখন মেলায় পরিণত হয়েছে ; যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।’

সরেজমিনে দেখা যায়, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ক্লাস শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্যাডো, মল চত্বর, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ প্রাঙ্গণ, মাস্টারদা সূর্যসেন হল, পি জে হার্টগ হল এলাকা লোকারণ্য হয়ে পড়ে। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ভবনগুলোতে সন্ধ্যাকালীন শিক্ষার্থীদের আনাগোনা বাড়ে। রাত পর্যন্ত চলে ক্লাস। সাধারণত কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যাংকে চাকরিজীবীরা অফিস শেষে সন্ধ্যাকালীন মাস্টার্সে ভর্তি হন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ:শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাসের চেয়ে সন্ধ্যাকালীন কোর্সে বেশি মনোযোগী। নিয়মিতদের ক্লাস ঠিকমতো না নিলেও সরব উপস্থিতি থাকে সন্ধ্যার ক্লাসে। বিভাগের বেশির ভাগ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক সন্ধ্যার কোর্সে পড়ান। আর সহকারী, সহযোগী ও প্রভাষক দিয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়া হয়। পরীক্ষা গ্রহণ ও উত্তরপত্র মূল্যায়নে যথাযথ দায়িত্ব পালনে কোর্স শিক্ষকরা অবহেলা করেন বলে জানান তারা। বিপরীতে সন্ধ্যাকালীন কোর্সগুলো অনেকটা বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এসব কোর্সে শিক্ষার্থীরা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভর্তি হন। তাই শিক্ষকদের মনোযোগ সেদিকেই বেশি। অনেক সময় শিক্ষকরা নিয়মিত কোর্সের ক্লাসে না গেলেও সন্ধ্যাকালীন কোর্সের ক্লাস নিতে তারা যথাসময়ে উপস্থিত হন। ছুটির দিনেও বিশ্রামের চেয়ে সন্ধ্যাকালীন কোর্সের ক্লাসেই তারা বেশি ব্যস্ত থাকেন।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, এটা অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ। শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাসে পড়ানোর পর যদি তাদের সময় থাকে তবে তারা সন্ধ্যাকালীন কোর্সে পড়ানোর সুযোগ নিতে পারেন। নিজের কোর্সের খাতা না দেখে অন্যদিকে মন দিলে তার নিজের কোনো যোগ্যতা থাকে না শিক্ষকতার দায়িত্ব নেওয়ার। এটা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ব্যবসার জন্য এসব করা ঠিক না। এ ধরনের কিছু হলে বুঝতে হবে তারা ব্যবসার জন্য নেমেছে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, অর্থনীতির ক্রমাগত সম্প্রসারণে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ব্যবসা বিষয়ে ডিগ্রি। বাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা কাজে লাগিয়ে নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট বিক্রির রমরমা বাণিজ্য বাড়ছে। নামমাত্র ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়মিত শিক্ষার্থীর দ্বিগুণ শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। এতে প্রশ্ন উঠছে শিক্ষার মান নিয়ে।

নিয়মিত কোর্সের এ বাণিজ্যিক রূপ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) নাসরীন আহমেদ বলেন, ‘ইভিনিং কোর্স নিয়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসা করছে। এটা চিন্তা-ভাবনা করে কাঠামোর মধ্যে আনা উচিত।’

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর