মঙ্গলবার ০২ জুন, ২০২০ ১৬:৩৮ পিএম


সরকারি প্রকল্পেই লিয়েনে বেতন মিলবে ৫ গুণ

শরীফুল আলম সুমন

প্রকাশিত: ১২:০৮, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

শিক্ষা খাতের প্রকল্পগুলোর সমন্বয় ও দেখভালের জন্য সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রগ্রাম (এসইডিপি) নামে একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই কর্মসূচিতে ৩০ জন সরকারি কর্মকর্তার লিয়েন (অন্য চাকরির জন্য সরকারি চাকরি থেকে বিনা বেতনে ছুটি) নিয়ে কাজ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। তাঁদের বেতন হবে আড়াই লাখ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত। সেই সঙ্গে প্রত্যেকে পাবেন গাড়ি। কর্মসূচিতে আরো থাকবেন ৫০ জন পরামর্শক। তবে শুধু দুজন কর্মকর্তার ডেপুটেশনে আসার সুযোগ রাখা হয়েছে। কর্মসূচির নামে লোকবলের এই বিশাল বহর আর মোটা অঙ্কের বেতনকে অযথা ব্যয় হিসেবে দেখছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এসইডিপির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) থেকে জানা যায়, কর্মসূচির প্রধান হবেন ‘ন্যাশনাল প্রগ্রাম কো-অর্ডিনেটর’। তিনি হবেন গ্রেড-২ পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। পদাধিকারবলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ওই পদে থাকবেন। তিনি আলাদা কোনো বেতন পাবেন না। বর্তমানে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত বেতন পান।

ডিপিপি অনুযায়ী, এর পরের পদগুলোতে কর্মকর্তারা আসবেন লিয়েনে। দ্বিতীয় প্রধান পদের নাম ‘প্রগ্রাম কো-অর্ডিনেটর’। তিনি হবেন গ্রেড-২ অর্থাৎ অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার। তাঁর বেতন ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রগ্রাম প্রধানের চেয়ে তাঁর বেতন হবে সাড়ে পাঁচ গুণ। এ ছাড়া চারজন ‘অতিরিক্ত প্রগ্রাম কো-অর্ডিনেটর’ হবেন গ্রেড-৩ অর্থাৎ যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার। ওই পদে বেতন হবে চার লাখ ৫০ হাজার টাকা। অথচ একজন যুগ্ম সচিব বর্তমানে বেতন পান প্রায় ৮০ হাজার টাকা। আটজন ‘ডেপুটি প্রগ্রাম কো-অর্ডিনেটর’ থাকবেন গ্রেড-৪ অথবা গ্রেড-৫ পদমর্যাদার। তাঁদের বেতন তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা করে। ১৬ জন ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রগ্রাম কো-অর্ডিনেটর’ থাকবেন গ্রেড-৬ পদমর্যাদার। তাঁদের বেতন হবে আড়াই লাখ টাকা করে। এ ছাড়া আরো ৫০ জন পরামর্শক থাকবেন। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এই পদে আসার সুযোগ রাখা হয়েছে। তাঁদের বেতন ধরা হয়েছে এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত।

ডিপিপিতে লিয়েন নিয়ে যোগ দিতে চাওয়া কর্মকর্তাদের যোগ্যতা হিসেবে শুধু পদমর্যাদা উল্লেখ করা হয়েছে। সে হিসেবে বেসরকারি কোনো কর্মকর্তা বা শিক্ষকের লিয়েনে আসার সুযোগ নেই বললেই চলে। কারণ অনার্স বা ডিগ্রি পর্যায়ের কলেজের অধ্যক্ষরা সর্বোচ্চ চতুর্থ গ্রেড পান। আর এইচএসসি পর্যায়ের কলেজের অধ্যক্ষরা যেতে পারেন সর্বোচ্চ পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত। সব অধ্যক্ষের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। আর বেসরকারি কলেজ থেকে কেউ যোগ দিতে চাইলেও তাঁর পক্ষে পাঁচ বছরের জন্য ছুটি জোগাড় করা সম্ভব নয়। এতে তাঁর চাকরিই চলে যাবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যেসব প্রকল্প দেখভাল করার জন্য এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, সেসব প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক, পরামর্শকসহ পূর্ণ জনবল আছে। তা সত্ত্বেও লিয়েনে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে তাঁদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। আর এই কর্মসূচি চালু হলে অন্য প্রকল্পের সঙ্গে ক্ষমতা ও আর্থিক ব্যয়ের দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। এতে প্রকল্পগুলোতে আরো দুরবস্থার সৃষ্টি হবে।

নাম প্রকাশ না করে সাবেক একজন প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘আমরা সাধারণত দেখি, সরকারি কর্মকর্তারা লিয়েন নিয়ে বিদেশি সংস্থা বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যান। কিন্তু এসইডিপি একটি সরকারি প্রকল্প, যদিও সেখানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন আছে। সেখানে কর্মকর্তাদের লিয়েনে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার যুক্তিই নেই। অন্যান্য প্রকল্প যেভাবে চলছে, সেভাবে ডেপুটেশন দিলে যে সব দপ্তরে অতিরিক্ত কর্মকর্তা আছেন তাঁদের কাজের সুযোগ তৈরি হতো। সরকারেরও বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় হতো না। তবে সবার আগে এই কর্মসূচির প্রয়োজন আছে কি না সেটিই ভেবে দেখা উচিত।’

সাবেক সচিব মোফাজ্জল করিম বলেন, ‘সাধারণত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি সরকারেরই অন্য কোনো প্রকল্পে যায়, তখন ডেপুটেশনে যায়। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা উন্নয়ন সংস্থায় গেলে লিয়েনে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। যেই প্রতিষ্ঠানে লিয়েনে যাবেন, সেখান থেকেই তাঁর বেতন-ভাতা নির্বাহ হবে। তবে তাঁকে একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য যেতে হবে। এখন যদি কোনো সরকারি প্রগ্রামের কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়, যেখানে লিয়েনে শুধু সরকারি কর্মকর্তাদেরই যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেটা আসলে শুভংকরের ফাঁকি।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘শিক্ষা খাতে এত দিন সংখ্যাভিত্তিক অগ্রগতি হয়েছে, গুণগতমানভিত্তিক নয়। তাই শিক্ষায় বড় কোনো প্রগ্রাম হাতে নেওয়া ইতিবাচক দিক। তবে সেখানে জনবল নিয়োগের মাপকাঠি প্রগ্রামের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। শুধু পদমর্যাদার বিচারে জনবল নিয়োগ করা ঠিক নয়। এখন প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারাই যদি পুরো প্রগ্রামের দায়িত্বে থাকেন, তাহলে উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।’

জানা যায়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরসহ একাধিক দপ্তরের অধীনে বর্তমানে ২৪টি প্রকল্পে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও অধিদপ্তরগুলো ওই সব প্রকল্প দেখভাল করছে। কিন্তু এসইডিপি চালু হলে প্রকল্পগুলো তারাই দেখভাল করবে। এতে অধিদপ্তরগুলোর আর প্রকল্পে তেমন কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকবে না। অথচ অধিদপ্তরের পারফরম্যান্স অনেকটাই নির্ভর করে প্রকল্পের ভালো কাজের ওপর।

পাঁচ বছর মেয়াদি এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালে। উদ্বোধন করা হলেও সে সময়ে তা চালু করা সম্ভব হয়নি। এই কর্মসূচির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, ইউনিসেফ, ইউনেসকোসহ মোট ছয়টি সংস্থা এই প্রকল্পে সহায়তা দেবে। এত বড় একটি কর্মসূচি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তোলাই হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. অরুণা বিশ্বাস বলেন, ‘এসইডিপির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। তবে এ ধরনের প্রগ্রাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রথম। এখানে ২৯টি স্কিমসহ নানা কাজ রয়েছে। তাই প্রগ্রামটি সবার সামনে আসতে আরেকটু সময় লাগবে। তবে এটা যেহেতু একটা কর্মসূচি তাই একনেকে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সব আর্থিক ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া হচ্ছে। আর এই প্রগ্রামে যেসব কাজ তাতে শিক্ষা খাতের অভিজ্ঞ লোক প্রয়োজন, যা সরকারি কর্মকর্তা ছাড়া সম্ভব নয়। ডেপুটেশনে কর্মকর্তাদের আনলে নানা ঝামেলায় পড়তে হবে। এ জন্য সব কিছু চিন্তা করেই ডিপিপি তৈরি করা হয়েছে।’

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর