শনিবার ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ১০:১১ এএম


সরকারি নার্সদের ছুটির আদেশে গোঁজামিল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০:১৪, ১৬ জুন ২০১৯   আপডেট: ১০:১৪, ১৬ জুন ২০১৯

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স রতন কুমার নাথকে ‘ভারতে তীর্থ ভ্রমণে’ যাওয়ার জন্য ২ থেকে ১৬ মে পর্যন্ত ১৫ দিনের জন্য গড় বেতনে অর্জিত ছুটি থেকে বহির্বাংলাদেশ ছুটি কাটানোর অনুমতি দিয়েছেন নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তন্দ্রা শিকদার। তিনি এসংক্রান্ত অফিস আদেশে স্বাক্ষর করেছেন ১৩ মে। অর্থাৎ ছুটি ভোগ করার ১১ দিনের মাথায় ওই ছুটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে; যদিও আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘২ মে থেকে ১৬ মে অথবা ছুটি ভোগের তারিখ থেকে ১৫ দিন’।

একইভাবে খুলনার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট শেখ আবু নাসের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স বেলা রানী দাসকে ভারতে তীর্থস্থানে ১৫ মে থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত এক মাসের জন্য ছুটি মঞ্জুর করেছে অধিদপ্তর। মহাপরিচালক তন্দ্রা শিকদার ওই ছুটির অনুমোদন দেন ২২ মে। এ ছাড়া তিনি গত ২২ মে যশোরের মণিরামপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সিনিয়র স্টাফ নার্স নাসিমা খাতুনকে দুই মাস আগেই আগামী ১৯ জুলাই থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত পবিত্র হজ পালনের জন্য ছুটি মঞ্জুর করেছেন। একই তারিখে গাজীপুরের শ্রীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নার্সিং সুপারভাইজর ফরিদা আক্তারকে আগামী ২৫ জুন থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত ৪৫ দিনের জন্য হজ পালনের জন্য ছুটি মঞ্জুর করেছেন। হজ পালনের জন্য এই ছুটি দেওয়া হলেও এ বছর হজের তারিখ পড়েছে ৯ আগস্টের পর। অর্থাৎ তাঁর ছুটির সময়সীমা শেষ হওয়ার পর হজ শুরু হবে। এই ছুটির আদেশে ওমরাহ হজের কথা বলা হয়নি। যাঁদের ওমরাহ হজের জন্য ছুটি দেওয়া হয়েছে তাঁদের চিঠিতে তা উল্লেখ করা আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নার্সিং অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের অফিস আদেশে রীতিমতো গোঁজামিল দেওয়া হয়েছে। ১৩ মে স্বাক্ষর করা আদেশে কিভাবে ২ থেকে ১৬ মের ছুটি মঞ্জুর হয়, তা বোধগম্য নয়। আবার যদি ছুটি ভোগের তারিখ থেকেই আদেশ দেওয়া হয়, তবে সেটা অনির্দিষ্ট যেকোনো সময়ে ছুটি নেওয়া বোঝায়। মহাপরিচালক ও তাঁর সঙ্গে যুক্ত একটি চক্র বিশেষ সুবিধা নিয়ে একের পর এক নার্সকে এ রকম ছুটি কাটানোর সুযোগ করে দেয়। অনেকে তীর্থ ভ্রমণের কথা বলে অন্য কাজে ছুটি কাটান। এ ছাড়া প্রতিবারই সরকারি হজ টিমের আওতায় এক দল নার্স সৌদি আরব যাওয়ার সুযোগ পান। ওই তালিকায় নাম ঢোকানো নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ ওঠে প্রতিবারই। এ ক্ষেত্রে লেনদেনের অভিযোগ বেশ জোরালোভাবেই করেন সাধারণ নার্সরা।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে সরকারি অনেক নার্সের ক্ষেত্রে মহাপরিচালক স্বাক্ষরিত এমন অসংলগ্ন ছুটির আদেশনামা পাওয়া যায়। অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নার্সদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি নার্সদের বদলি-পদায়ন নিয়ে আগে থেকেই বিশেষ চক্রের বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল অধিদপ্তরের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে। এখন অভিযোগ উঠছে বিদেশে পাঠানোর নামে বাণিজ্যের। আর এই বিদেশ পাঠানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসছে ‘ভারতের তীর্থস্থান ভ্রমণ’ ও ‘সৌদি আরবে পবিত্র হজ পালন’ নিয়ে। মাত্র দেড় বছরে প্রায় এক হাজার নার্স পর্যায়ক্রমে এই দুই উদ্দেশ্যে বিদেশ ভ্রমণের আদেশ পেয়েছেন। প্রতিদিনই এমন কয়েকটি ছুটির অনুমোদন দিচ্ছেন তন্দ্রা শিকদার। এর বাইরে আরো বেশ কয়েকজন নার্স বিদেশ ভ্রমণ করেছেন প্রশিক্ষণসহ নানা পেশাগত কাজে। এর পেছনেও অনুমোদন বাণিজ্যের কথা ছড়ায়।

গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে তন্দ্রা শিকদারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কিছুদিন আগে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র।

জানতে চাইলে তন্দ্রা শিকদার বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম না তখন শুনেছি তীর্থ ভ্রমণের ছুটির আবেদন করে নার্সদের অনেক দিন ঘুরতে হতো। দু-তিন মাস আগে আবেদন করেও ছুটি পাওয়া যেত না। তাই আমি প্রক্রিয়াটি অনেকটা সহজ করে দিয়েছি। কারণ তাদের ছুটি কাটানোর অধিকার আছে। কিন্তু ধর্মীয় কাজের কথা বলে কেউ অন্য কাজে যায় কি না, সেটা কখনো মনিটর করা হয়নি।’

ছুটির অনুমোদনের পেছনে আর্থিক লেনদেনের প্রশ্নে মহাপরিচালক বলেন, ‘ছুটির সময়সীমা ও মঞ্জুরের তারিখে এক-আধটা ভুল হতে পারে; কিন্তু আর্থিক লেনদেনের বিষয় আছে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া আমি সার্কুলার দিয়েও জানিয়ে দিয়েছি, কেউ যেন এই দপ্তরে কোনো রকম লেনদেন না করে। তার পরও কেউ দিলে সেটা কাকে কিংবা কেন দেয় বুঝি না।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, কিছুদিন আগে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তন্দ্রা শিকদারসহ আরো তিন-চারজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি চক্রের বিষয়ে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগ আসে মন্ত্রণালয়ে। কিছু গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে নানা তথ্য প্রকাশ পায়। তবে এসবের মধ্যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা হয়ে উঠেছে ‘ভারতের তীর্থস্থান ভ্রমণ’ ও ‘সৌদি আরবে পবিত্র হজ পালনের’ জন্য প্রায় এক হাজার সরকারি নার্সকে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ করে দেওয়া; যার আড়ালে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ আলোচিত হয় মুখে মুখে। এ ছাড়া লিখিত অভিযোগে মহাপরিচালক তন্দ্রা শিকদারের বিরুদ্ধে খেয়াল-খুশিমতো বদলি, হয়রানি, কেনাকাটা ও পরিবহন ব্যবহারে দুর্নীতির অভিযোগও জমা হয়েছে মন্ত্রণালয়ে; যদিও এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তারও জড়িত থাকার আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে সর্বশেষ বেশ কয়েকজন নার্সকে হজ ও প্রশিক্ষণের জন্য কয়েকটি দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর পিএসসহ একাধিক কর্মকর্তার নাম উঠেছে।

তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পিএস ওয়াহেদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদেশে লোক পাঠানো নিয়ে আগে থেকেই নানা ধরনের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা ছিল। এমনকি লেনদেনের অভিযোগও ছিল; যার সবটাই অধিদপ্তর থেকে করা হয়। এখানে আমার নাম কেন জড়ানো হলো, তা বুঝতে পারছি না।’ তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণের নামে স্বামী-স্ত্রী বেড়াতে যাবে, সেটা তো হতে পারে না। আবার একই ব্যক্তি বারবার যাবে অন্যরা সুযোগবঞ্চিত হবে, সেটাও কেন হবে। এসব বিষয়ে এবার একটি নীতিমালা করা হয়েছে। নতুন নীতিমালায় নার্সিং অধিদপ্তরের কারো কারো স্বার্থগত সমস্যা হওয়ায় তারা অসন্তুষ্ট হয়ে থাকতে পারে।’

অধিদপ্তরের বিদেশ ভ্রমণ সংক্রান্ত অনুমোদনের কমপক্ষে দেড় বছরের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, প্রায় প্রতি কর্মদিবসেই কাউকে না কাউকে ‘ভারতের তীর্থস্থান ভ্রমণ’ বা ‘ সৌদি আরবে পবিত্র হজ পালনে’ যাওয়ার অনুমোদন দিয়েছেন মহাপরিচালক তন্দ্রা শিকদার। তিনি এ বিষয়ে বলেন, ‘আমি এখন থেকে এই বিদেশ ভ্রমণের পুরো বিষয়টি মনিটরিংয়ের আওতায় নিয়ে আসব, যদিও আমার এখানে লোকবলের ঘাটতি আছে। অনেক আবেদনের সবগুলোই যাচাই-বাছাই করাও কঠিন ব্যাপার। তবে সব অভিযোগই ঠিক নয়।’

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর