শনিবার ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ১১:১০ এএম


সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা সময়ের দাবি

ড. মুনাজ আহমেদ নূর

প্রকাশিত: ০৯:২৩, ২৮ জুন ২০১৯  

প্রতি বছরই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বেশ আগ্রহের সৃষ্টি হয়। এই আগ্রহের মূল কারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তি, অর্থ, শ্রম ও সময়ের অপচয়। এ সমস্যা সমাধানে ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আলোচনা শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের ৭ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উপাচার্যদের সভায় বেশিরভাগ উপাচার্য সমন্বিত বা গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছিলেন। এর পর এ নিয়ে আরও কয়েক দফা আলোচনা হয়। কিন্তু ফলাফল এখন পর্যন্ত শূন্য। কারণ অনেকে মনে করেন, এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের স্বাতন্ত্র্য খর্ব এবং নিজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাতন্ত্র্য এবং নিজস্ব আয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আমরা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ কর্তৃক গঠিত একটি সাব-কমিটির পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেছিলাম। আমরা এটাকে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা বলছি। কিন্তু গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা বলছি না। আমরা এটাকে বলতে চাই দক্ষতা নিরূপণ পরীক্ষার দিকে যাওয়ার প্রথম ধাপ।

যেভাবে এ পথে যাওয়া যেতে পারে, তাহলো- সমন্বিত পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষায় দুটি কমিটি থাকবে। একটি কেন্দ্রীয় কমিটি, আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কমিটি। কেন্দ্রীয় কমিটি বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য শাখায় প্রতিটি বিষয়ের আলাদা নম্বরপত্র দিয়ে দেবে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় কমিটি বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা নিয়ে আলাদাভাবে একজন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে কত নম্বর পেল তার একটি তালিকা দেবে। আর বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি সে তালিকা দেখে নিজেদের স্বতন্ত্র শর্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের কাছে আবেদনপত্র আহ্বান করবে এবং তারা তাদের প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তি করবে।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক, খ, গ, ঘ এবং চ শাখায় এমসিকিউ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নিচ্ছে। এখান থেকে শাখা কমিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় তিনটি শাখায় এমসিকিউ, লিখিত অথবা উভয় পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেবে। একটি শাখায় বিজ্ঞান, আরেকটিতে বাণিজ্য এবং অন্যটিতে মানবিক বিভাগ থাকবে। কেন্দ্রীয় কমিটি বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা নিয়ে আলাদাভাবে একজন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে কত নম্বর পেল তার একটি তালিকা দেবে। এখানে শিক্ষার্থী ঠিক করবে সে কোন কোন বিষয়ে পরীক্ষা দেবে। কারণ একজন শিক্ষার্থী সব বিষয়ে পরীক্ষা নাও দিতে পারে। যেমন বিজ্ঞান বিভাগে পদার্থ, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, গণিত; বাণিজ্য বিভাগে বাংলা, ইংরেজি, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক বিভাগে অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজকল্যাণ, পৌরবিজ্ঞানসহ অনেক বিষয় থাকে। একজন শিক্ষার্থীকে তার পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ের শর্ত অনুযায়ী ঠিক করতে হবে সে কোন কোন বিষয়ে পরীক্ষা দেবে। যেমন বুয়েট যদি তাদের ভর্তি শর্ত এভাবে ঠিক করে- তাদের ওখানে ভর্তি হতে একজন শিক্ষার্থীর সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় পদার্থ, গণিত, রসায়ন এবং ইংরেজিতে ৯০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে; তাহলে যে শিক্ষার্থী বুয়েটে ভর্তি হতে চায় সে পদার্থ, গণিত, রসায়ন এবং ইংরেজি বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে বুয়েটে ভর্তির আবেদনের যোগ্যতা অর্জন করবে। তার অন্য কোনো বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। আবার যদি কোনো শিক্ষার্থী দেশের ৪৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার আবেদনের যোগ্যতা অর্জন করতে চায়, তাহলে তাকে হয়তো অনেক বেশি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হবে। সে তার যোগ্যতার ভিত্তিতে তার পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করবে। কারণ প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের থাকবে আলাদা শর্ত। তবে পরীক্ষা হবে কেন্দ্রীয়ভাবে এবং তিনটি শাখায় তিন দিনে পরীক্ষা হবে। আর কোনো পরীক্ষা হবে না।

কেন আমরা এ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেব? এ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি, অর্থ, শ্রম ও সময়ের অপচয় অনেকটা কমে যাবে। আমাদের দেশে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪৫ এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমান ভর্তি পরীক্ষা ব্যবস্থায় এই ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো একটিতে যদি একজন শিক্ষার্থীকে তার নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে হয়, তাহলে তাকে ৪৫ জায়গায় পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। এই ৪৫ জায়গায় যেতে তাকে শারীরিকভাবে উপস্থিত হতে হচ্ছে। নানাভাবে তাকে পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বাস্তবে এটিও প্রয়োগযোগ্য হচ্ছে না। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, একই দিনে একই সময়ে দুই বা তার অধিক বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা নিচ্ছে। ফলে একজন শিক্ষার্থী বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারছে না। একজন শিক্ষার্থী হয়তো সর্বোচ্চ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে পারছে। যখন ৮ থেকে ১০ লাখ শিক্ষার্থী প্রথম সারির ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে, তখন ওই ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাপ বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সমন্বিত পদ্ধতিতে যদি পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাহলে একজন শিক্ষার্থী একটি পরীক্ষার মাধ্যমে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ নিতে পারবে। সেখান থেকে সে তার যোগ্যতা অনুযায়ী পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে। এ পদ্ধতিতে শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, চাইলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও অংশগ্রহণ করতে পারে। তাহলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তি শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। এ পদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থী হয়তো দুইবার আবেদন ফি দেবে। প্রথমবার কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য; দ্বিতীয়বার সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় বিষয়ভিত্তিক নম্বর পাওয়ার পর সংশ্নিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন ও ভর্তির জন্য। বর্তমানে প্রচলিত ভর্তি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থী যদি ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে, তাহলে ১০ বার ফি দিতে হয়। ১০ জায়গায় যেতে হয়। সেখানেও একটা অর্থ খরচ করতে হয়। আর ভোগান্তি তো আছেই। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভর্তি পরীক্ষার মৌসুমে একজন শিক্ষার্থীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন ও যাতায়াতে খরচ প্রায় ৯৬০০০ টাকা। সমন্বিত পদ্ধতিতে সব মিলিয়ে একজন শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ ৫০০০ টাকা হয়তো খরচ হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য একজন শিক্ষার্থীকে হয়তো প্রতি বিষয়ে ৫০ টাকা দিতে হতে পারে।

এখানে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিতে হলে ৪৫ জায়গায় পরীক্ষা নিতে হবে। সেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার একটি আশঙ্কা থাকে। বিষয়টি একেবারেই অমূলক নয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বারাই যেহেতু সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পরিচালিত হবে এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে এ সমস্যা সমাধান করা খুব কঠিন হবে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া আমাদের শিক্ষামন্ত্রী চলতি বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁস ছাড়াই সম্পন্ন করেছেন। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা থেকে অনেক বড় পরীক্ষা। শিক্ষামন্ত্রীর মতো আন্তরিক হলে আমাদের উপাচার্যরাও প্রশ্নপত্র ফাঁস ছাড়াই সমন্বিত পদ্ধতিতে কোনো ধরনের ত্রুটি ছাড়াই পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারবেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের একেক শর্ত থাকবে। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকবে। যেমনটা SAT-এ হয়ে থাকে। র‌্যাংকিংয়ের ওপরের দিকে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হতে শিক্ষার্থীদের ২৩০০-র ওপরে নম্বর থাকতে হয়। এভাবে র‌্যাংকিংভেদে নিচের দিকে নামতে থাকে। আমাদের এখানেও একইভাবে একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের শর্ত অনুসরণ করে তার যোগ্যতা অনুযায়ী আবেদন করবে। কেন্দ্রীয় ফল প্রকাশের পর ভর্তির জন্য কোনো শিক্ষার্থী হয়তো ১০টিতে, কোনো শিক্ষার্থী ২০টিতে আবার কোনো শিক্ষার্থী ৪৫টি বিশ্ববিদ্যালয়েই আবেদন করতে পারবে। তবে মনে রাখা আবশ্যক, এ পর্যায়ে নতুন করে কোনো ভর্তি পরীক্ষা হবে না। এ পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের উৎস প্রচলিত নিয়মের মতোই থাকবে।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদেরও বেশিরভাগ উপাচার্য চাচ্ছেন, সমন্বিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা হোক। এ ব্যাপারে আরও কোনো বিষয় যুক্ত করার প্রয়োজন হলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তার যুক্তিযুক্ত সমাধান বের করা কঠিন হবে বলে মনে হয় না। শুধু উপাচার্যদের আন্তরিকতা থাকলেই এ পদ্ধতি বাস্তবায়ন সম্ভব। আমাদের উচিত, অন্তত শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে সমন্বিত পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।

অধ্যাপক ও উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ


এডুকেশন বাংলা/এজেড

 

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর