বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ৫:৩১ এএম


সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা: লাভ-ক্ষতির হিসাবনিকাশ

আরাফাত হোসেন ভূঁইয়া

প্রকাশিত: ১০:৪৭, ২৬ জানুয়ারি ২০২০  

দেশের সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। এর মধ্যদিয়েই শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমবে, কমবে অর্থ ও সময়ের অপচয়। কিন্তু এই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়ন করার আগে নিম্নোক্ত কিছু আশঙ্কা দূরীকরণ অত্যাবশ্যক। কারণ সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার সুযোগে নানান ধরনের অনিয়মের ঘটনা ঘটতে পারে।

প্রথমত হতে পারে প্রশ্ন ফাঁস। প্রশ্ন ফাঁস বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি ভয়াবহ সমস্যা। বহুবার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে এমন কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘটনা ঘটেছে। একদিকে যেমন শীর্ষে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের জায়গাটুকু করে নিতে লড়াই, অন্যদিকে সেই শীর্ষে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষে থাকা বিভাগটি পেতে মরিয়া হয়ে ওঠা শিক্ষার্থী। এটি কেবল একজন শিক্ষার্থীকে মাত্রাতিরিক্ত চাপই প্রদান করছে না ; বরং এরই সুযোগে প্রশ্ন ফাঁস, প্রক্সি, দুর্নীতির মতো ভয়াবহ সংস্কৃতি চালু হওয়ার সুযোগও তৈরি হচ্ছে। আর্থিক লোভে পড়ে হয়তো বা দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিরাও জড়িয়ে পড়তে পারেন নানান দুর্নীতিতে। আর যদি এমনটি ঘটে তাহলে প্রশ্ন হাতে পাওয়া ছেলেটি শীর্ষে অবস্থান করে কোন্ বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা করে নিচ্ছে তা আর একবার ভেবে দেখা দরকার। আবার প্রশ্ন ফাঁস কিংবা প্রক্সির মাধ্যমে অযোগ্য ছাত্রের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় বিভাগ আর অন্যদিকে লড়াই করে নিজের সেরাটা দিয়েও স্বপ্ন পূরণ না হওয়া—ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। আরেকটু গভীরে যদি যাই তাহলে একটা প্রশ্ন খুব জাগে মনে—আচ্ছা, মাত্র এক ঘণ্টা বা সুনির্দিষ্ট একটি সময় যখন একজন শিক্ষার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে, ঠিক সেই জায়গায় এসে কি করে আমরা দেশের সকল শিক্ষার্থীর অধিকারের নিশ্চয়তা দিব?

সুনির্দিষ্ট সময়টিতে কী একজন মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষার্থী অসুস্থ থাকতে পারে না? কেউ কি আমাদের এই মহা জ্যামের নগরীর কোনো এক মোড়ে আটকা পড়ে ভাগ্যবিপর্যয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারে না?

যদি একটি শিক্ষার্থীও ভাগ্যের লুকোচুরি খেলায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তার দায় কার? কিংবা দীর্ঘ স্বপ্নের ক্যাম্পাসে জায়গা করে নিতে না পেরে একজন শিক্ষার্থীরও হূদয় যদি স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তারই বা দায় কার?

এদেশের এক একজন তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থী এক একটি সম্ভাবনা, সুতরাং এদের একজনকেও ছোটো করে দেখার সুযোগ নেই। দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রথম লক্ষ্য থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। তুমুল প্রতিযোগিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ করে নিতে না পেরে আফসোসের বেদনায় ভোগা শিক্ষার্থীদের জন্য সমাধান কী হবে? ভর্তি ফরমেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি আয়ের উত্স বলে বিবেচিত হতো। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং গৃহীত সিদ্ধান্তটি কার্যকর করার আগে পুনরায় লাভ-ক্ষতির হিসাব কষতে হবে। বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সময় ও যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগেই প্রশ্ন ফাঁস দুর্নীতি, প্রক্সির মতো অসদুপায় অবলম্বনের সংস্কৃতি শতভাগ নিশ্চিহ্ন করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী কোনো বিশেষ কারণে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরীক্ষা দিতে না পারলে তার অধিকার কি করে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে। উদ্ভূত সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান নিশ্চিত না করে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করলে তা হবে মেধাবী শিক্ষার্থীদের এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়ারই নামান্তর মাত্র।

 লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর