মঙ্গলবার ২০ আগস্ট, ২০১৯ ০:০৯ এএম


সবার জন্য পেনশন শুধুই কি স্বপ্ন?

আবু কাওসার

প্রকাশিত: ১০:১০, ৪ মে ২০১৯  

সবার জন্য পেনশন এখনও শুধুই স্বপ্ন। এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। দেশে সরকারি-বেসরকারি কর্মজীবী সবাই পেনশন পাবেন- এমন একটি সুখবর চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘোষণা করা হয়েছিল। `সর্বজনীন পেনশন` ব্যবস্থার আওতায় সব কর্মজীবী মানুষকে এ সুবিধা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয় বাজেট বক্তৃতায়।

এখন শুধু সরকারি চাকরিজীবীরাই মাসিক পেনশন সুবিধা পান। নতুন ব্যবস্থায় এর বাইরে বেসরকারি খাতে নিয়োজিত চাকরিজীবীদের পেনশনের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা বলা হয়। সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে `সাম্য` প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। বাজেটে এ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে এর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি এখনও। সংশ্নিষ্টরা বলেন, সবার জন্য পেনশন নিশ্চিত করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনেক সময় লাগবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতির জন্য একটি `রূপরেখা` তৈরি করতে হবে। কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করা হবে, তার কৌশল তুলে ধরা হবে এতে। রূপরেখাটি সরকারের নীতিগত অনুমোদন নিতে হবে। তারপরই শুরু হবে কাজ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, সার্বজনীন পেনশন প্রবর্তনের জন্য কাঠামোগত সংস্কার দরকার, যা সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ যেসব দেশে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, সেখানে কমপক্ষে ছয় থেকে সাত বছর সময় লেগেছে। কাজটি কঠিন হলেও অসম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

জানা যায়, বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা অবসরের পর পেনশন সুবিধা ভোগ করছেন, যা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র শতকরা পাঁচ ভাগ। অন্যদিকে মোট শ্রমশক্তির ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতে নিয়োজিত। এর মধ্যে ১০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। অর্থাৎ এসব খাতে নিয়োগপত্র, ছুটি ও ক্ষেত্রবিশেষে প্রভিডেন্ড ফান্ড আছে। বাকি সব অনানুষ্ঠানিক খাত, যাদের কোনো নিয়োগপত্র নেই। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, দেশে গড় আয়ু ও প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ার কারণে সামাজিকভাবে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবেলা করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সে জন্য বিদ্যমান সরকারি পেনশন কার্যক্রমের বাইরে বেসরকারি পর্যায়ে কর্মরত সব কর্মজীবীকে পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।

সূত্র জানায়, সার্বজনীন পেনশনের খসড়া রূপরেখা তৈরির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আজিজুল আলমের নেতৃত্বে গত মাসে সাত সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে। যোগাযোগ করা হলে কমিটির প্রধান আজিজুল আলম বলেন, `সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে সুপারিশ তুলে ধরা হবে। ওইসব সুপারিশ গ্রহণ করার পর সরকারের নীতিগত অনুমোদন লাগবে। এরপর বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। `

সার্বজনীন পেনশন পদ্ধতি ২০০৪ সালে সীমিত আকারে চালু করেছিল ভারত সরকার। কলকাতা এবং আসাম ছাড়া বাকি সব রাজ্যে এ ব্যবস্থা বর্তমানে চালু রয়েছে। নেপাল, ভুটান ও শ্রীলংকা এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। অতিরিক্ত সচিব আজিজুল আলম বলেন, প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে। তিনি আরও বলেন, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সব কর্মজীবী মানুষকে পেনশনের আওতায় আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বর্তমান সরকার। সেই অঙ্গীকার পূরণে এটি অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।

সার্বজনীন পেনশনের উদ্যোগকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ ব্যবস্থা কার্যকর করা কঠিন হবে বলে মনে করেন তারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড.এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন. সার্বজনীন পেনশন পদ্ধতির উদ্যোগ ভালো। তবে বেসরকারি খাতে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। কারণ বেসরকারি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে সরকারকে। বেসরকারি কর্তৃপক্ষ রাজি না হলে সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ড. জায়েদ বখত বলেন, সরকারি খাতে কোনো সমস্যা হবে না। বাধা আসতে পারে বেসরকারি খাত থেকে। কারণ আমাদের দেশে বেসরকারি খাতে বেশিরভাগই ছোট ছোট কোম্পানি। অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রস্তাবিত পেনশন সুবিধার আওতায় আনা চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে সীমিত আকারে চালু করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

প্রস্তাবিত রূপরেখা : অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বেসরকারি খাতে সার্বজনীন পেনশন হবে `অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে`। এতে চাকুরে এবং নিয়োগ কর্তৃপক্ষ উভয়েরই অবদান বা অংশগ্রহণ থাকবে। এর জন্য গঠন করা হবে আলাদা তহবিল। সরকার কর্তৃক অনুমোদিত এক বা একাধিক কোম্পানির মাধ্যমে এসব তহবিল পরিচালনা করা হবে। একজন কর্মজীবী তার মাসিক বেতন বা আয় থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দেবে। একই সঙ্গে নিয়োগদাতা কর্তৃপক্ষও সমপরিমাণ টাকা জমা করবে। অনেকটা প্রভিডেন্ড ফান্ডের মতো। এভাবে চাকরিজীবী এবং নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের যৌথ অংশগ্রহণে তহবিলে টাকা জমা হতে থাকবে। তহবিলের জমাকৃত টাকা সরকার কর্তৃক স্বীকৃত লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা হবে। সূত্র জানায়, তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করার পর তা হতে প্রাপ্ত লভ্যাংশ `সুবিধাভোগী`দের অবসরকালীন মাসিক পেনশন দেওয়া হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, তহবিল কীভাবে পরিচালিত হবে, চাকরিজীবী তার বেতনের কত অংশ তহবিলে জমা দেবে, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কত টাকা দেবে, বিনিয়োগের অর্জিত আয়ের কত অংশ সুবিধাভোগীদের দেওয়া হবে- এসব বিষয় আইনি কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার পর কাজ শুরু করা হবে।

এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর