রবিবার ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ১০:৩২ এএম


‘সনদ বাণিজ্য’ করে এক শিক্ষক শত কোটি টাকার মালিক

তানজিমুল হক

প্রকাশিত: ০৯:১১, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

এক দশকে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন রাজশাহীর প্রত্যন্ত গ্রামের এক স্কুলশিক্ষক। চারঘাট উপজেলার নন্দনগাছির স্কুলশিক্ষক এএইচএম কামরুজ্জামান মুকুল রাজশাহী মহানগরীতে গড়ে তুলেছেন বিপুল পরিমাণ সম্পদ।

অভিযোগ, ‘সনদ বাণিজ্য’ করে তিনি নামে-বেনামে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাঁচটি বাড়ি ও একটি বিশাল মার্কেট নির্মাণ করেছেন। এছাড়া গ্রামের বাড়িতে শত বিঘার পেয়ারা বাগানসহ বহু সম্পদের মালিক হয়েছেন। তিনি চড়েন দামি গাড়িতে। প্রতি মাসে বাড়ি ও মার্কেট থেকে তিনি ২০ লাখ টাকা ভাড়া পান।

স্বল্প আয়ের একজন স্কুলশিক্ষক কিভাবে অল্প সময়ের মধ্যে এত সম্পদের মালিক হলেন- তা নিয়ে মহানগরীর মানুষের মুখে মুখে ফিরছে নানান প্রশ্ন। নন্দনগাছির জোতকার্তি বিএন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুকুলের বিপুল সম্পদ অর্জনের ঘটনায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা ভঙ্গ করে একসঙ্গে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরে অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) অনুমতি না নিয়ে দুটি পাঁচতলা বাড়ি নির্মাণ করায় তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছে এলাকাবাসী।

কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগপত্রে তার বিরুদ্ধে আট ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে তাকে একজন ‘শিক্ষা ব্যবসায়ী’ ও ‘সনদ বাণিজ্যকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও মুকুল তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে- মাত্র এক দশক আগে নন্দনগাছি থেকে রাজশাহী মহানগরীতে আসা-যাওয়া শুরু করেন মুকুল। নন্দনগাছির জোতকার্তি বিএন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হলেও তিনি রাজশাহী মহানগরীর সিটি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ পদে রয়েছেন।

এছাড়া সিটি পলিটেকনিক অ্যান্ড টেক্সটাইল ইন্সটিটিউটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। অভিযোগ, এ দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ‘সনদ বাণিজ্য’ করছেন। এছাড়া নগরীর রাজপাড়া থানা এলাকায় আদর্শ মহিলা টেকনিক্যাল ও বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে তার আরেকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ তার স্ত্রী মারুফা খানম। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা তেমন আসে না; নিয়মিত ও ঠিকমতো ক্লাসও হয় না। প্রয়োজনীয় শিক্ষক-কর্মচারীও নেই। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ‘সনদ বাণিজ্য’ করে মুকুল অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

অভিযোগ, মহানগরীতে নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মুকুল চারঘাটের স্কুলে ঠিকমতো যান না। তবে তিনি হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে তিনি প্রতি মাসে বেতনও তোলেন।

জানা গেছে, মাসে একবার স্কুলে গিয়ে হাজিরা খাতায় তিনি পুরো মাসের স্বাক্ষর করেন। প্রভাবশালী হওয়ায় তিনি ক্লাস না নিলেও তার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত কেউ করেন না।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরীর গৌরহাঙ্গা পুকুরের পশ্চিম পাশে মুকুলের পাশাপাশি তিনটি বাড়ি রয়েছে। প্রথম বাড়িটি পাঁচতলা। দেড় বছর আগে এক নারীর কাছ থেকে ৬০ লাখ টাকায় তিনি বাড়িটি কেনেন।

এরপর আরডিএ’র অনুমোদন না নিয়ে তিনি সেখানে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। এ কারণে আরডিএ চেয়ারম্যানের কাছে এলাকাবাসী লিখিত অভিযোগ করেছে।

১০ ইউনিটের বাড়িটি ছাত্রাবাস হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছে। এখান থেকে মুকুল প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা ভাড়া পান। তিন কাঠার ওপর নির্মিত দ্বিতীয় বাড়িটি প্রথম বাড়ির পাশে। ৬০ লাখ টাকায় তিনি সেটি কেনেন। তবে প্ল্যান পাস না করে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে তিনি পাঁচতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। ১০ ইউনিটের বাড়িটিও ছাত্রাবাস হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছে। এখান থেকে মুকুল প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা ভাড়া পান।

নিয়ম লঙ্ঘন করে বাড়ি দুটি নির্মাণ করা সম্পর্কে আরডিএর বিল্ডিং ইন্সপেক্টর আরিফুল ইসলাম বলেন, এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে মুকুলকে নোটিশ দেয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। অনিয়ম পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মুকুলের তৃতীয় বাড়িটিও একই মহল্লায়। সোয়া দুই কাঠার ওপর নির্মিত দোতলা বাড়িটি সম্প্রতি তিনি ৭০ লাখ টাকায় কেনেন। পঞ্চম তলা পর্যন্ত নির্মাণ করতে তার পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এটিও ছাত্রাবাস হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছে। এখান থেকে তিনি প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকা ভাড়া পান। অবশ্য বাড়ি তিনটি মুকুলের স্ত্রী মারুফা খানমের নামে কেনা হয়েছে।

মহানগরীর পদ্মা আবাসিকের হজর মোড় এলাকায় তার চতুর্থ বাড়ি রয়েছে। এখানে তিনি তিনতলাবিশিষ্ট বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেন। এতে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তিনতলার ছয়টি ইউনিট থেকে প্রতি মাসে তিনি এক লাখ ২০ হাজার টাকা ভাড়া পান।

তার পঞ্চম বাড়িটিও একই এলাকায়। কোটি টাকা দিয়ে পাঁচ কাঠা জায়গা কিনে তিনি সেখানে দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এতে তার এ পর্যন্ত প্রায় ৯০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে আরডিএ’র প্ল্যান না পাস করায় এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মাণ করায় এরই মধ্যে বাড়িটির সামনে বেশকিছু অংশ ভেঙে দিয়েছে আরডিএ।

মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান চত্বরে মুকুলের চারতলার বিশাল মার্কেট রয়েছে। রেলের জমি লিজ নিয়ে এবং ব্যক্তিমালিকানার তিন কাঠা জায়গার ওপর মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে মার্কেটটির বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। ২০টি দোকান থেকে প্রতি মাসে তিনি প্রায় ১০ লাখ টাকা ভাড়া পান। তবে মার্কেটটি তিনি শ্যালক বেলাল খান ও লাল খানের নামে করেছেন।

চলাচলের জন্য এলিয়ন মডেলের দামি গাড়ি মুকুল ব্যবহার করেন। নন্দনগাছিতে রয়েছে তার একশ’ বিঘার পেয়ারা বাগান। এছাড়া ৫০ বিঘার ওপর আবাদি জমি ও পুকুর রয়েছে। এ দেড়শ’ বিঘা জমির মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এসব মিলিয়ে মাত্র এক দশকের মধ্যে স্কুলশিক্ষক মুকুল প্রায় শত কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।

এ ব্যাপারে কামরুজ্জামান মুকুল বলেন, গৌরহাঙ্গার বাড়িগুলো তার স্ত্রী মারুফা খাতুন তার বাবার টাকায় কিনেছেন। আর পদ্মা আবাসিকের দুটি বাড়ি নির্মাণে তার বাবা এবং আমেরিকা প্রবাসী এক ভাই বিনিয়োগ করেছেন। এছাড়া মার্কেটটি তার দুই শ্যালকের। গ্রামের বাড়িতে তার কোনো পেয়ারা বাগান, জমি ও পুকুর নেই। একটি মহল তার নামে সুপরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করছে। ষড়যন্ত্রের শিকার বলে তিনি দাবি করেন।

সৌজন্যে: যুগান্তর
এডুকেশন বাংলা/এজেড

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর