বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১:৩২ এএম


সদ্য সরকারিকৃত প্রতিষ্ঠানে বিপাকে শিক্ষক-কর্মচারি,শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৮:৩১, ১৭ জুলাই ২০২০  

তিন সন্তানের জনক সাজিবুর রহমান একজন দিনমজুর ব্যক্তি। তাঁর মেজো ছেলে ২০১৯ সালের প্রথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে জিপিএ ৫ নিয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়। ওইসময় বড় ছেলে বাড়ির পাশের একটি হাইস্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ালেখা করলেও কিছু মানুষের পরামর্শে ভালো পড়াশোনা এবং সরকারি সুযোগ সুবিধা লাভের আশায় মেজো ছেলেকে এ বছরের জানুয়ারিতে  উপজেলার একমাত্র সরকারি হাইস্কুলে ভর্তি করায়। ধারদেনা করে স্কুলে ভর্তি করালেও পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন  স্কুলের বেতন ও ফি দিতে হবে বেসরকারি নিয়মেই। কারণ জানতে চাইলে স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেন, সরকারি নিয়মে বেতন ও ফি নির্ধারণে এখনো তাঁর কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি। নির্দেশনা আসলেই কেবল তা কার্যকর হবে। প্রধান শিক্ষকের কথা শুনে সাজিবুর রহমানের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। বর্তমানে তাঁর বড় ছেলে ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে জিপিএ ৫ নিয়ে উত্তীর্ণ হলেও উপজেলার একমাত্র সরকারি কলেজে ভর্তি করাবেন কি-না তা নিয়েও তিনি সংশয়ে রয়েছেন।        

এ চিত্র বাংলাদেশের প্রায় সকল উপজেলার সদ্য সরকারিকৃত স্কুল ও কলেজগুলোর। সরকারি সাইনবোর্ড টানানো থাকলেও বেসরকারি নিয়মেই চলছে সব। শিক্ষক-কর্মচারিগণের আত্তীকরণ সম্পন্ন না হওয়ার কারণে তাঁরা এখনো সরকারি বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। অনেকটা এরকম যে,  স্কুল ও কলেজ সরকারি কিন্তু শিক্ষক-কর্মচারিগণ বেসরকারি! এদিকে শিক্ষক-কর্মচারিদের আত্তীকরণ সম্পন্ন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সরকারি বেতন ও ফি নির্ধারণ করাও সম্ভব হচ্ছেনা। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। সরকারি সাইনবোর্ড দিয়ে রাখায় অভিভাবকগণ অনেকটা প্রতারিতই হচ্ছেন। বিশেষ করে গরীব ও নিম্ন আয়ের অভিভাবকগণ বিপাকে পড়েছেন বেশি। অপরদিকে প্রায় চার বছর ধরে প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেক বিষয়ের শিক্ষক নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানে পাঠদান চলছে খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে। আত্তীকরণ সম্পন্ন না হওয়ার কারণে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।        

কর্মকর্তারা বলছেন সরকারিকরণের কাজগুলো একটু জটিল ও সময়সাপেক্ষ। বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারিদের আত্তীকরণের কাজ চলছে। এ কাজটি শেষ করে শিক্ষক-কর্মচারিদের বেতন-ভাতা নিয়মিত হয়ে গেলেই শিক্ষার্থীদের সরকারিভাবে বেতন ও ফি নির্ধারণ হয়ে যাবে। নতুনভাবে তখন শিক্ষক নিয়োগ দিতে আর কোনো বাধা থাকবেনা বিধায় শিক্ষক সংকটও কমে আসবে। অভিভাবকরাও পাবেন সরকারিভাবে বেতন ও ফি দেওয়ার সুযোগ।

শিক্ষকদের অভিযোগের তীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দিকে। তারা বলছেন, কর্মকর্তারা প্রায় চার বছর ধরে বিভিন্ন অযুহাতে তাদের ফাইলগুলো আটকে রাখছেন। একই ফাইল বিভিন্ন যায়গায় বারবার দেখে সময়ক্ষেপণ করছেন। আবার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ভুলের কারণে অনেক শিক্ষক-কর্মচারিদের পদ সৃজনের কাজ বন্ধ রেখেছেন। অনেকের চাকরিকাল শেষ হওয়ার কারণে সরকারি কোনো সু্যোগ- সুবিধা ছাড়াই অবসরে গেছেন। অনেকের চাকরি শেষ হওয়ার পথে। বিধিমালার মারপ্যাঁচে পড়ে অনেক শিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কলেজের ক্ষেত্রে `সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারি আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮` এ কার্যকর চাকরিকাল মোট চাকরিকালের অর্ধেক এবং তা শুধু পেনসন ও ছুটির জন্য গণনাযোগ্য হবে বলে উল্লেখ রয়েছে। বিধিমালায় দীর্ঘ দিনের ইতিহাস ভেঙে প্রথমবারের মতো কলেজের শিক্ষকদের পদ ক্যাডার বাদ দিয়ে নন ক্যাডার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আবার অনেক শিক্ষক অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে দীর্ঘদিন চাকরি করে ইনডেক্স নিয়ে আসলেও পূর্বের অভিজ্ঞতা যোগ করা হচ্ছেনা। এরকম অনেক অভিযোগ রয়েছে কলেজ শিক্ষকদের।                     

কুমিল্লার সদ্য সরকারিকৃত শ্রীকাইল সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক আক্তার হোসেন সরকার জানান, তিনি আরেকটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ১২ বছর এমপিওভুক্ত হিসেবে চাকরি করে ওই কলেজের ইনডেক্স নিয়ে বর্তমান কলেজে যোগদান করেন। এখন যদি তাঁর পূর্বের অভিজ্ঞতা বাদ যায় তাহলে কার্যকর চাকরিকাল বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকবেনা। যেখানে এমপিওভুক্ত এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে ইনডেক্স নিয়ে গেলে পূর্ণ অভিজ্ঞতা যোগ হতো সেখানে সরকারিকরণের ক্ষেত্রে যোগ না হওয়াটা অত্যন্ত অমানবিক! তাছাড়া শিক্ষকদের একটি বৃহৎ অংশ এ জটিলতায় ভুগছেন।        
                     
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো যুগোপযোগী ও উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা বিস্তারের লক্ষ্যে এবং নির্বাচনি  ইশতেহার বাস্ততবায়নের অংশ হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটি উপজেলায় একটি করে স্কুল ও একটি করে কলেজ সরকারিকরণের ঘোষণা দেন। ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৬ সাল থেকে সরকারিকরণের কাজ শুরু হলেও ২০২০ সালের শেষ দিকে এসেও এ কাজ শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা সরেজমিনে একবার কাগজপত্র যাচাই বাছাই করেন। একই কাগজপত্র দ্বিতীয়বারের মতো মাউশিতেও যাচাই বাছাই করা হয়। মাউশি থেকে কাগজপত্র যাচাই বাছাই শেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে সেখানে আবার শুরু হয় একই কাগজপত্র তৃতীয়বারের মতো যাচাই বাছাইয়ের কাজ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মাত্র কয়েকটি কলেজের কাজ শেষ করলেও বর্তমানে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে তা বন্ধ রয়েছে। সদ্য ৫ টি কমিটি গঠন করা হলেও কোনো কাজই করতে পারছেন না তাঁরা। স্কুলগুলোর কাজেরও একই অবস্থা। কলেজের মতো স্কুলগুলোর কাজ একসাথে না হওয়ার কারণে জটিলতা একটু বেশি।        

এ ব্যাপারে সরকারি কলেজ স্বাধীনতা শিক্ষক সমিতি (সকস্বাশিস) এর কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক(ভারপ্রাপ্ত) মো. শরীফ উদ্দিন আহমেদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, "২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪ বছরেও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় আমাদের শিক্ষক-কর্মচারিরা হতাশায় ভুগছেন। আর কত সময় লাগবে তাও অনেকটা অনিশ্চিত। একই কাগজপত্র তিনবার যাচাই বাছাইয়ের কারণে সময় ব্যয় হয়েছে প্রায় তিনগুণ। `সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক কর্মচারি আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮` অনুযায়ী ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট থেকে বেতন ভাতা পাওয়ার কথা থাকলেও এরই মধ্যে আমাদের প্রায় ৩ হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারি সরকারি কোনো সুযোগ সুবিধা ছাড়াই অবসরে গেছেন। এখনো প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ অবসরে যাচ্ছেন। অনেকেই আবার চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু সরকারের অনুকূলে Deed Of Gift সম্পন্ন হওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠান থেকেও তাঁরা সকল প্রকার আর্থিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাছাড়া করোনা মহামারির কারণে প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক কর্মচারিরা আর্থিক যে সুযোগ-সুবিধা পেতেন তাও বেশিরভাগ কলেজেই বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে একদিকে শিক্ষক-কর্মচারিরা যেমন হতাশায় রয়েছেন তেমনি অভিভাবকগণও সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে হচ্ছেন বঞ্চিত। গরীব অভিভাবকগণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করে বেসরকারি নিয়মে বেতন ও ফি দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। শিক্ষক নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা থাকায় পড়াশোনা ব্যহত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। এতে করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ মহতী উদ্যোগের সুফল এখনো সাধারণ মানুষ পাচ্ছেনা। সকল সমস্যার মূল কারণ হলো শিক্ষক-কর্মচারিদের আত্তীকরণ সম্পন্ন না হওয়া। তাই আমি মনেকরি দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিক্ষকদের আত্তীকরণের কাজ শেষ করতে পারলেই কেবল সকল সমস্যার সমাধান হবে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মহতী উদ্যোগের শতভাগ সফলতা আসবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করি।"  

`সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারি আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮`  এ কিছু সংশোধনী আনার খবর শুনছি। এরকম হলে সেখানে অবশ্যই শিক্ষক প্রতিনিধি রাখতে হবে। অন্যথায় শিক্ষকদের স্বার্থ পরিপন্থী কোনো ধারা সংযোজন করা হলে বা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো ধারা বিয়োজন করলে শিক্ষক সমাজ তা কখনো মেনে নেবেনা বলে জানান তিনি।               

অভিভাবকরা বলছেন, প্রতিটি উপজেলায় একটি করে স্কুল ও একটি করে কলেজ সরকারিকরণ গ্রামীণ এলাকার জনগণের জন্য  মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহার। কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সরকারিকরণের কাজে হাত দিয়েছিলেন তা এখনো অধরাই থেকে গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে গেলে জটিল বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে সব প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের সরকারি বেতনে পড়াশোনার সুযোগ সৃষ্টি করার দাবি জানান তাঁরা।  

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর