সোমবার ০১ জুন, ২০২০ ১৩:২১ পিএম


সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশনে পাঠদান

মো. রহমত উল্লাহ্

প্রকাশিত: ০৮:০৩, ২০ মে ২০২০  

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের অপ্রতিরোধ্য আক্রমণে যখন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে আছে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তখন শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার অসামান্য ক্ষতির সামান্য পুষিয়ে দিতে একটি উত্তম উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বিষয়ভিত্তিক ভালো শিক্ষকদের দিয়ে ক্লাস রেকর্ড করে তা সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচার করার যুগোপযোগী এ উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছে সর্ব মহলে। শিক্ষার্থীরাও রুটিন অনুসারে আগ্রহ সহকারে দেখে আসছে সেই ক্লাস।

সরকারিভাবে জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত এই ক্লাসগুলো যেহেতু আমাদের পাঠদানের জাতীয় মান নির্দেশ ও প্রচার করে দেশ-বিদেশে, সেহেতু এই ক্লাসগুলোর মান অবশ্যই হওয়া উচিত সর্বোত্তম। ক্লাসরুমের বাইরে প্রচারিত এসব ক্লাসের মাধ্যমে সর্ব সাধারণ সহজেই বুঝতে পারেন আমাদের শিক্ষকদের কোয়ালিটি লেভেল। তাই পুরো শিক্ষক সমাজের সম্মানও কমবেশি নির্ভর করে এ কয়েক জন শিক্ষকের মানের ওপর। কেননা, এটি কোনো শিক্ষকের ব্যক্তিগত কাজ নয়; বরং সব শিক্ষকের প্রতিনিধিত্বমূলক কাজ। এদের একজনও যদি সামান্যতম ভুল বা খারাপ পড়ান তো তা জেনে যায় সবাই। এখানে লুকোচুরির বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। যে কোনো কারণে হোক দুর্বল শিক্ষক দিয়ে জাতীয় টেলিভিশনে ক্লাস করানো মানে হবে ঐ শিক্ষকের, শিক্ষক সমাজের, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ও সরকারের দুর্বলতার প্রমাণ দেওয়া। এমন হলে সঙ্গত কারণেই বিবেকবান মানুষের মনে জেগে উঠবে এই প্রশ্ন যে, আমাদের বাছাই করা শিক্ষকের মান যদি এমন হয় তো অবশিষ্টদের মান কেমন?

এই কর্মসূচির আওতায় সম্প্রতি টেলিভিশনে প্রচারিত প্রাথমিকের গণিত ক্লাসে সাধারণ যোগ ভুল করার এবং মাধ্যমিকের বিজ্ঞান ক্লাসে নিউটনের বিখ্যাত দ্বিতীয় সূত্র ভুল পড়ানোর সমালোচনা চলমান। শিক্ষকগণ যেহেতু মানুষ সেহেতু তারা ভুল করতেই পারেন। এই ভুল ছাড়াও তাদের এবং অন্যদের পুরো ক্লাসের মান সর্বোত্তম কি না, এর চেয়ে অধিক যোগ্য শিক্ষকের অভাব কি না, তাদেরকে বাছাই করার কৌশলটি উত্তম কি না, এসব প্রশ্নও কিন্তু সামনে চলে এসেছে এখন। অপর দিকে রেকর্ডিংকৃত ক্লাস প্রচারের আগে ভুলভ্রান্তি সংশোধন ও মান যাচাই করার জন্য একটি এডিটিং প্যানেল থাকার কথা। ত্রুটিযুক্ত একটি ক্লাস জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াটাও স্বাভাবিক নয় কি? ক্লাসের মান প্রশ্নবিদ্ধ হলে এইসব ক্লাসের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকগণ। ফলে অকার্যকর হয়ে পড়বে সরকারি অর্থ ব্যয়ে পরিচালিত এই গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম।

আমাদের শিক্ষা, পরিবার ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই সর্বাধিক যোগ্য শিক্ষক বাছাই করে নিশ্চিত করতে হবে সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশনের সর্বোত্তম পাঠদান। খেয়াল রাখতে হবে শুধু শিক্ষার্থী নয়, সারাদেশের শিক্ষকগণও অনুসরণ করছেন এসব ক্লাস। এই ক্লাসের উপস্থাপনা হতে হবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও আনন্দঘন। খেয়াল রাখতে হবে এটি হাতেগোনা বাছাইকরা শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নয়। এখানে দুর্বল শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ পায় না। শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করার সুযোগ পায় না। এই পদ্ধতিতে ক্লাস করে আমাদের শিক্ষার্থীরা অভ্যস্ত নয়। শ্রেণিকক্ষের মতো এখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। তাই শিক্ষকের আকর্ষণীয় উপস্থাপন-কৌশল দিয়ে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের এই ক্লাসে ধরে রাখতে না পারলে নিশ্চিত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে এ উদ্যোগ। অপচয় হবে সরকারি অর্থ, অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী।

লেখক :অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, তাজমহল রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর