শনিবার ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২১:০১ পিএম


সংখ্যাগত পরিবর্তনেই কি শিক্ষার উন্নতি?

সাইফ সুজন

প্রকাশিত: ১৩:১০, ২৯ মে ২০১৯   আপডেট: ১৪:১৮, ২৯ মে ২০১৯

গত এক দশকে দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বেড়েছে সর্বস্তরে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের হার। প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ভর্তির হার প্রায় শতভাগে উন্নীত হয়েছে। ঝরে পড়ার হার কমায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে মাধ্যমিকেও। প্রান্তিক পর্যায়ে কলেজ প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ বেড়েছে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায়। পাবলিকের পাশাপাশি শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষারও সুযোগ বাড়িয়েছে। এসবই শিক্ষার সংখ্যাগত পরিবর্তন। যদিও শিক্ষাবিদরা বলছেন, সংখ্যাগত পরিবর্তনই সব নয়। শিক্ষার প্রকৃত উন্নতি নির্ভর করে গুণগত মানের ওপর।

খোদ সরকারি কয়েকটি জরিপেই দেখা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়—সব ক্ষেত্রেই শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানদণ্ডেও বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নমুখী। দুর্বল এ শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতর থেকে অদক্ষতা নিয়েই পাস করে বের হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। ফলে কর্মবাজারে গিয়েও ভালো করতে পারছে না তারা।

শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে এ খাতে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করে সরকার। প্রতি বছর বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণও বাড়ে। মাধ্যমিক পর্যন্ত বিনা মূল্যে বই দেয়া হয় শিক্ষার্থীদের। পাশাপাশি উপবৃত্তি ও স্কুল ফিডিং কার্যক্রমসহ রয়েছে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ। কিন্তু শিক্ষার মানে তেমন উন্নতি না হওয়ায় এসব বিনিয়োগের খুব একটা সুফল মিলছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

কারিগরি জ্ঞানের অভাব ও দক্ষতার ঘাটতির কারণে দেশে ও বিদেশে শিক্ষিত এ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।  তিনি বলেন, দেশে কারিগরি খাতে এখনো বিশালসংখ্যক দক্ষ জনবল দরকার। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষ মানবসম্পদ বের না হওয়ার কারণেই এ খাতে এখনো বিদেশীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তারা প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশ থেকে। আবার আমাদের দেশে অনার্স পাস করেও শিক্ষিতদের বড় একটি অংশ বেকার বসে থাকছে।

প্রাথমিক স্তরকে দেখা হয় শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত হিসেবে। যদিও সরকারের পরিচালিত জরিপেই দেখা গেছে গণিত, ইংরেজিসহ মৌলিক বিষয়ের দুর্বলতা নিয়েই বের হচ্ছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা। গণিতে দক্ষতা যাচাইয়ে দেশের তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ওপর জরিপ চালিয়ে দুই বছর অন্তর প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন বিভাগ। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের জ্ঞান, চিন্তার ক্ষমতা, বোধগম্যতা ও প্রায়োগিক ব্যবহারের দক্ষতা পরিমাপ করা হয়। এ জরিপের ভিত্তিতে প্রকাশিত ‘ন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাসেসমেন্ট ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণীর ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীই গণিতে দুর্বলতা নিয়ে বের হচ্ছে। প্রতিবেদনে কয়েক বছরের জরিপের ফলাফলের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ২০১১ সালে পঞ্চম শ্রেণীতে গণিতে পূর্ণ দক্ষতা অর্জনকারী শিক্ষার্থী ছিল ৩২ শতাংশ। ২০১৫ সালে এ হার কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০ শতাংশে।

মাধ্যমিক শিক্ষার অবস্থাও প্রায় একই। মাধ্যমিক শিক্ষায় বিষয়ভিত্তিক শিখন মান যাচাইয়ে ‘লার্নিং অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি ইনস্টিটিউশনস’ (লাসি) শীর্ষক এক জরিপে মাধ্যমিকের বেহাল দশা উঠে এসেছে। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে শিখন মান কেমন, তা যাচাইয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এ জরিপ চালায়। দেশের ৩২ জেলার ৫২৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত ওই জরিপে দেখা যায়, অষ্টম শ্রেণীর অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থীর বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে দক্ষতা কাঙ্ক্ষিত মানের নয়।

উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পরও মৌলিক অনেক বিষয়ে দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পরীক্ষায় বসতে হয় শিক্ষার্থীদের। দেখা গেছে, উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ ৫ পেয়েও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষায় নিম্নমানের ফল অর্জন করছে শিক্ষার্থীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ১১ শতাংশ পাস নম্বর তুলতে পেরেছে। বাকি ৮৯ শতাংশই ফেল করেছে। ‘গ’ ইউনিটে পাস করেছে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী, ফেল করেছে ৯৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বাণিজ্য অনুষদের অনুত্তীর্ণদের বড় অংশই ইংরেজিতে পাস নম্বর পায়নি। এ অনুষদে ইংরেজিতে ৩০ নম্বরের মধ্যে ১০ পেলে পাস ধরা হয়।

উৎপাদনশীলতায় শিক্ষার বড় ধরনের ভূমিকা থাকলেও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। জ্ঞান কাঠামোর নিম্নমান শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনেও প্রভাব ফেলছে। সরকারের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে সারা দেশে ২৬ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ বেকার ছিল। এ বেকারদের মধ্যে ১০ লাখ ৪৩ হাজারই উচ্চ মাধ্যমিক কিংবা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনেও। ‘বাংলাদেশ: স্কিলস ফর টুমরোস জবস’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলছে, দক্ষতার অন্যতম ভিত্তি হলো শিক্ষার্থীর অক্ষরজ্ঞান ও গাণিতিক হিসাবের সক্ষমতা। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার নিম্নমুখী মানের কারণে তাত্ত্বিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কার্যকরভাবে দক্ষতা উন্নয়নেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে এ দুর্বল ভিত। অল্প কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক বিষয়ে দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ ব্যবস্থার সুযোগ রেখেছে। তবে দক্ষতা বৃদ্ধির এ সুযোগও পায় না প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়া শিক্ষার্থীরা। এমনকি মাধ্যমিক-পরবর্তী শিক্ষা গ্রহণকারীদের মধ্যেও দক্ষতার অভাব থেকে যাচ্ছে। দক্ষতার এ ঘাটতির কারণে চাকরিপ্রার্থীরা চাকরিদাতাকে তুষ্ট করতে পারছেন না।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ বলেন, আমাদের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে পরিকল্পনার মাধ্যমে সেদিকে এগিয়ে যেতে হবে। বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে কখনো ভালো ফল অর্জন সম্ভব নয়। শিক্ষার মান নিশ্চিতে সবার আগে প্রয়োজন ভালো ও যোগ্য শিক্ষক। সেখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। প্রাথমিক থেকে শুরু করে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়—সব পর্যায়েই এ সংকট রয়েছে। আমাদের কোথাও কোথাও অবকাঠামো সংকটও অনেক বেশি। তাই সরকারের উচিত পরিকল্পনামাফিক শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করা। পাশাপাশি সে অর্থ ব্যয়ের প্রক্রিয়ায় মনিটরিং করা।

শিক্ষার্থীদের শিখন মানের অনেকটাই নির্ভর করে শিক্ষকের যোগ্যতার ওপর। যদিও দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের বড় অংশই অপ্রশিক্ষিত। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় পাঠদানে নিয়োজিত আছেন মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৩ জন শিক্ষক। এর মধ্যে ৭১ হাজার ৭০২ জনের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেই। এ হিসাবে মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করছেন।

এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় অবকাঠামো সংকটও বেশ প্রকট। শুধু প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় ১০ হাজার বিদ্যালয়ে জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকির মধ্যেই পাঠদান করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এছাড়া ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই বিজ্ঞানাগার নেই।

সংখ্যাগত দিক থেকে প্রসার দেখা গেলেও শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মানের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। গুণগত মান ও অবকাঠামো দুর্বলতার কারণে আকারে বড় হলেও ভিত দুর্বল থেকে যাচ্ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য বলছে, শিক্ষার মানে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। আর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে শিক্ষার মানের দিক থেকে ১৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৭। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। তালিকায় বৈশ্বিকভাবে ভারতের অবস্থান ২৭। বাকি দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা ৩৮, পাকিস্তান ৬৬ ও নেপালের অবস্থান ৭০তম।

শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে কম বরাদ্দকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে কোন দেশ শিক্ষায় কেমন ব্যয় করছে—ব্যানবেইসের সর্বশেষ শিক্ষা পরিসংখ্যানে এর তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, শিক্ষা খাতে ব্যয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ সবার পেছনে রয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিক্ষা খাতে একটি দেশের মোট জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ বা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ হলো আদর্শ। এ বিষয়ে ডাকার ঘোষণায় অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ বাংলাদেশ। অথচ বর্তমানে দেশে এ খাতে বরাদ্দ জাতীয় আয়ের ২ শতাংশের সামান্য বেশি। অথচ আফ্রিকার অনেক দরিদ্র দেশেও শিক্ষা খাতের উন্নয়নে বরাদ্দ আরো বেশি। তাই জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

সৌজন্যে: বণিক বার্তা

এডুকেশন বাংলা/এজেড

 

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর