বৃহস্পতিবার ০৪ জুন, ২০২০ ৭:১৮ এএম


সংকটে পড়েছেন দেশের সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশক ও প্রকাশনা

আজিজুল পারভেজ

প্রকাশিত: ১১:১৮, ১৫ মে ২০২০  

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে সংকটে পড়েছেন দেশের সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশক ও প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরা। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি হলে এখাতে সংকট দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগে বই কেনা এবং আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরা।

করোনা প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর বন্ধ হয়ে যায় প্রকাশনা ও প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বই প্রকাশনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত আরো কয়েক রকম ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কম্পোজ ও ডিজাইন প্রতিষ্ঠান, কাগজ বিক্রেতা, লেমিনেটিংয়ের দোকান, বাঁধাইখানা, ছাপাখানা ও বিক্রেতা। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার মানুষ ও তাঁদের পরিবার। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবাই বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

প্রকাশকরা অনুযোগ করে বলেন, বর্তমান সংকটকালে সবাই স্বাভাবিকভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয়, মানুষের জীবন ধারণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ কারণে বই প্রকাশনা ও প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি আড়ালে থেকে যাচ্ছে। কিন্তু এ খাতেও কয়েক লাখ মানুষ সরাসরি জড়িত। তাঁরাও সংকটে। তাঁদের সংকটের বিষয়টিও দেখতে হবে।

সংকট মোকাবেলায় প্রকাশকরা কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রথমত, সরকারি উদ্যোগে সরাসরি বই কেনা। সরকার বিভিন্ন সময় দেশের পাবলিক লাইব্রেরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠাগারের জন্য বই কেনে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার আবার এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য বই কিনলে প্রকাশকদের জন্য বড় ধরনের সহায়ক হবে। দ্বিতীয়ত, আর্থিক প্রণোদনা। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কৃষি, শিল্প খাতে যেভাবে ৪% সুদে ঋণ সহায়তা দিয়েছে, প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদেরও তার আওতায় নিয়ে আসতে পারে। তৃতীয়ত, জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি পাঠাগারগুলোর জন্য প্রতিবছর যে বই কেনা হয় তা এ মুহূর্তে কেনার ব্যবস্থা করা। চতুর্থত, রেয়াতি হারে বইয়ের কাগজ কেনার ব্যবস্থা করা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র প্রতিবছর বেসরকারি পাঠাগারের জন্য প্রায় আড়াই কোটি টাকার বই কেনে। আর পাবলিক লাইব্রেরি বছরে এক কোটি ৭৮ লাখ টাকার বই কেনে। প্রকাশকদের দাবি, এই বই কেনা এখনই শুরু করা গেলে এটি তাঁদের জন্য সহায়ক হতো।

বাংলাদেশে জ্ঞান ও সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশক সমিতির সদস্যভুক্ত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২০৫টি। এর বাইরে আরো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে শখানেক। দেশে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সদস্য প্রকাশক ও বিক্রেতা রয়েছেন প্রায় ১২ হাজার। ঢাকা শহরে বাঁধাইখানা আছে প্রায় ২৫০টির মতো। সব কিছু প্রায় দুই মাস ধরে বন্ধ।

প্রকাশকদের মতে, এমনিতে এ খাত হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলছে। এর মধ্যে চলমান সংকটে পুরো ব্যবসা বন্ধ। কিন্তু অফিস ভাড়া, গুদাম ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন এগুলো বহন করতে হচ্ছে। অনেকে পুঁজি ভেঙে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় প্রকাশনা ব্যবসা অব্যাহত রাখতে যে পুঁজির প্রয়োজন তা তাঁদের নেই। ফলে বিশেষ সহায়তা কিংবা প্রণোদনা না পেলে অনেক প্রতিষ্ঠান অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে না।

প্রকাশনা খাতের এ সংকট যে প্রকট তার প্রকাশ ঘটতে শুরু করেছে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাঁচিয়ে রাখতে সংগ্রাম করছেন প্রাবণ প্রকাশনীর কর্ণধার রবীন আহসান। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি তাঁর বইগাড়ি নিয়ে ছুটছেন রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বই বিক্রিতে ছাড় দিয়েছেন ৫০%। বইগাড়ির মাসিক ভাড়া সংগ্রহে তিনি এটি করছেন বলে জানান। প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্যও বইয়ে ৫০% ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে প্রকাশনা খাতে সরকারের করণীয় নির্ধারণে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।  আগামী প্রকাশনীর মালিক প্রকাশক ওসমান গনি বলেন, ‘ইতালিতে লকডাউন-পরবর্তী সময়ে সবার আগে যে প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে সেটা হলো লাইব্রেরি। প্রকাশনা খাত বর্তমানে যে সংকটে পড়েছে তা থেকে উত্তরণে আমরা সরকারের সহযোগিতা প্রতাশা করি।

বই কিনে নেওয়ার মাধ্যমে একটি বড় ধরনের সহায়তা দিতে পারে সরকার। আর অন্যদের যেভাবে স্বল্প সুদে ঋণ দিচ্ছে সেভাবে আমাদের ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।’ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকাশনা ব্যবসা বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ কিভাবে হবে তা নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। আমাদেরকেও হয়তো অনেক কিছু বদলাতে হবে, নতুন করে ভাবতে হবে।’  প্রকাশক খান মাহবুব বলেন, ‘বইয়ের ব্যবসাটা অন্য ব্যবসার মতো না। বই কেনার বিষয়টি মানুষের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে যে সংকট চলছে তা কবে কাটিয়ে ওঠা যাবে তা অনিশ্চিত। মানুষের আর্থিক সংকট যত দিন কাটবে না তত দিন প্রকাশনা ব্যবসার দুরবস্থা কাটবে না। সুতরাং এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি ভাবতে হবে।’

সব খবর
এই বিভাগের আরো খবর